টেকসই উন্নয়ন ও নীল অর্থনীতি

নিতাই চন্দ্র রায়: ২০১২ সালের ২০ জুন, মেক্সিকোর রিওডি জেনিরো শহরে টেকসই উন্নয়ন শীর্ষক একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ওই সম্মেলনে দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থানের অন্যতম পন্থা হিসেবে নীল অর্থনীতিকে (ব্লু ইকোনমি) বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা হয়। নীল অর্থনীতির প্রবক্তাদের মতে, সাগর ও মহাসাগর এই পৃথিবীর ৭২ শতাংশ দখল করে আছে। জীবমণ্ডলের ৯৫ শতাংশের উৎস হচ্ছে সাগর। বিশ্বের ৮০ শতাংশ ব্যবসা-বাণিজ্য চলে সাগর পথে। মৎস্য সম্পদ ছাড়া সাগরের নীল অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত রয়েছে তেল, গ্যাস, পুষ্টিকর শৈবাল, জাহাজ নির্মাণ, জাহাজভাঙা শিল্প, সমুদ্র পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, পর্যটন, মূল্যবান ধাতু ও লবণ আহরণসহ আরও অনেক  সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র।

বিশ্বের উপকূলীয় দেশগুলোর জন্য সমুদ্র হচ্ছে অপার সম্ভাবনার ক্ষেত্র। জাতীয় প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি টেকসই উন্নয়নের জন্য সমুদ্র সম্পদের সঠিক ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই। বিশ্ব অর্থনীতির একটি বড় অংশই সমুদ্রনির্ভর। নীল অর্থনীতির বৈশ্বিক আয়ের পরিমাণ  ২৪ ট্রিলিয়ন ডলারের মতো। বাংলাদেশ এই অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।  আমাদের পক্ষে এখনও নীল অর্থনীতির ব্যবহারের জন্য পূর্ণ দক্ষতা অর্জন করা সম্ভব হয়নি। কারণ সমুদ্রের তলদেশের প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ সম্পদ ব্যবহার করতে হলে যে পরিমাণ দক্ষ জনশক্তির দরকার, বর্তমানে দেশে সেই পরিমাণ জনশক্তি নেই। আবার ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সমুদ্র বিজ্ঞান বিভাগ থাকলেও প্রয়োজনীয় বাজেটের অভাবে প্রতিষ্ঠান দুটিও সঠিকভাবে কাজ করতে পারছে না। তবে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পার সঙ্গে সমুদ্র সম্পদের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের প্রবৃদ্ধি ২০২০ সালের মধ্যে আট শতাংশে উন্নীত করতে হলে তার পাঁচ শতাংশ নীল অর্থনীতি থেকে আহরণ করতে হবে।

১৯৯৪ সালে অধ্যাপক গুন্টার পাউলি ভবিষ্যতে অর্থনীতির রূপরেখা প্রণয়নের জন্য একটি টেকসই ও পরিবেশবান্ধব মডেল হিসেবে নীল অর্থনীতির ধারণা দেন। পৃথিবীর তিন ভাগ জল। এ  বাস্তবতাকে সামনে রেখে পৃথিবীর দেশগুলো তাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চাহিদা মেটাতে তীর্থের কাকের মতো চেয়ে আছে সমুদ্র-সম্পদের দিকে। যেভাবে জনসংখ্যা বাড়ছে এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালে পৃথিবীর জনসংখ্যা হবে ৯০০ কোটি। এই বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা, যোগাযোগ, পণ্য পরিবহন এবং জ্বালানি সম্পদের সরবরাহ নিশ্চিত করতে মানুষকে অবশ্যই সমুদ্রের ওপর  ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে হবে। বিশ্ব অর্থনীতিতে নীল অর্থনীতি বহুবিধ অবদান রেখে চলেছে। বছরে তিন থেকে পাঁচ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের কর্মকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে এই বিশাল সমুদ্রকে ঘিরে। বিশ্বের ৪৩০ কোটি  মানুষের ১৫ শতাংশ প্রোটিনের চাহিদা মেটাচ্ছে সামুদ্রিক মাছ, উদ্ভিদ ও অন্যান্য জীবজন্তু। জাপান খাদ্য হিসেবে সামুদ্রিক শৈবাল ব্যবহারের মাধ্যমে খাদ্য সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম হয়েছে। পৃথিবীর প্রায় ৩০ শতাংশ গ্যাস ও জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হচ্ছে সমুদ্রের তলদেশ থেকে। সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জ্ঞান বৃদ্ধির মাধ্যমে সমুদ্রভিত্তিক ওষুধশিল্প গড়ে তোলা এখন সময়ের ব্যাপার।

সাম্প্রতিক সময়ে পৃথিবীতে যতগুলো আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে, তার সবগুলোতেই নীল অর্থনীতি ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। এছাড়া অর্থনৈতিক সহায়তা ও উন্নয়ন সংস্থা, জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি, বিশ্বব্যাংক, বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার উন্নয়ন কৌশলের মূলে রয়েছে নীল অর্থনীতি। এখন বিভিন্ন ছোট-বড় দেশও নীল অর্থনীতিনির্ভর উন্নয়ন কর্মসূচি প্রণয়ন করছে। ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় অর্থনীতির সিংহভাগ আসে সমুদ্র থেকে। ইতোমধ্যে দেশটি এমন কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করছে যে, তা পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হলে সমুদ্র থেকে আহরিত সম্পদের মূল্যমান জাতীয় বাজেটের প্রায় ১০ গুণ হবে। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া সমুদ্র সম্পদ থেকে বর্তমানে প্রায় ৪৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করছে এবং ২০২৫ সাল পর্যন্ত এই আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১০০ বিলিয়ন ডলার। আর মালদ্বীপের প্রায় সমুদয় অর্থনীতিই সমুদ্রনির্ভর।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, ইউরোপীয় উপকূলীয় দেশগুলো নীল অর্থনীতি থেকে প্রতি বছর ৫০ হাজার কোটি ডলার আয় করতে পারে। সমুদ্র সম্পদের যথাযথ আবিষ্কার এবং পরিপূর্ণ ব্যবহারের মাধ্যমে গোটা অর্থনীতির চেহারা পাল্টে দেওয়া বাংলাদেশের পক্ষেও সম্ভব। বর্তমানে বঙ্গোপসাগরে রয়েছে ৪৭৫ প্রজাতির মূল্যবান মাছ। বঙ্গোপসাগরে প্রতি বছর গড়ে আট মিলিয়ন টন মাছ ধরা পড়ে। এর মধ্যে শূন্য দশমিক ৭০ মিলিয়ন টন মাছ বাংলাদেশের মৎসজীবীরা আহরণ করে, যার সঙ্গে প্রায় ৩০ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত। বিক্ষিপ্ত কিছু জরিপ থেকে জানা যায়, বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ছাড়াও এ সমুদ্রসীমায় রয়েছে নানা ধরনের প্রবাল, মূল্যবান শৈবাল, ৩৫ প্রজাতির চিংড়ি, তিন প্রজাতির লবস্টার, ২০ প্রজাতির কাঁকড়া এবং ৩০০ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক।

ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমার বিষয়টি আন্তর্জাতিক আদালতে নিষ্পত্তি হওয়ার পর  বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নে নীল অর্থনীতি এক সোনালি সম্ভাবনার দ্বার উšে§াচন করেছে। এর ফলে বঙ্গোপসাগরে এক লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের বেশি রাষ্ট্রধীন সমুদ্র, ২০০ নটিক্যাল মাইল একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানের তলদেশে সব ধরনের প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ সম্পদের ওপর বাংলাদেশের সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাই এ মুহূর্তে দরকার আমাদের সমুদ্র সম্পদের সঠিক জরিপ এবং সেখানে কী কী সম্পদ কী পরিমাণে আছে, তা নিরূপণ করা। তারপর এ সম্পদ কীভাবে কাজে লাগানো যাবে, সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া।

বাংলাদেশে রয়েছে ১২০ কিলোমিটারের পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার। এ সমুদ্রসৈকতকে ঘিরে পর্যটনশিল্প গড়ে তুলতে পারলে গোটা দেশের চেহারাটাই পাল্টে যাবে। আন্তর্জাতিক পর্যটকদের জন্য কক্সবাজার ও প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনকে আকর্ষণীয় করে তুলতে পারলে এ অঞ্চলে পর্যটকদের ঢল নামবে। ইতোমধ্যে বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রের ব্লকগুলোতে খনিজসম্পদ অনুসন্ধানের কাজ শুরু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সম্ভব হতে পারে। সমুদ্র উপকূল এলাকার বায়ু প্রবাহ এবং সমুদ্র স্রোতকে কাজে লাগিয়ে বায়ুকল ও পানি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে উপকূলীয় এলাকায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব। এ ছাড়া আমাদের সমুদ্র এলাকায় জিরকন, ইরেনাইট, ম্যাগনেটাইড, কায়নাইট ও মেনানাইটের মতো অফুরন্ত মূল্যবান খনিজ সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে। ‘সেভ আওয়ার সি’ নামের একটি সমুদ্র গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্যমতে, শুধু সামদ্রিক মাছ ও শৈবাল রফতানি করে বাংলাদেশ বছরে এক বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ আয় করতে পারে। এছাড়া মাছ থেকে খাবার, মাছের তেল দিয়ে বিভিন্ন প্রকার ওষুধ তৈরি করা সম্ভব। এতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব।

২০০৮ সালে বেসরকারি মালিকানায় সমুদ্রগামী বাংলাদেশি জাহাজের সংখ্যা ছিল ২৬টি। কিন্তু সমুদ্র পরিবহনের চাহিদা বেড়ে যাওয়া এখন তা ৭০-এ উন্নীত হয়েছে। পণ্য আমদানি-রফতানিতে বাংলাদেশি জাহাজ যুক্ত হওয়ায় দেশে গড়ে উঠেছে শিপিং এজেন্সি, ফেইট ফরোয়ার্ডিং এবং ব্যাংক বিমা খাত। এ খাতে নতুন ধরনের কর্মসংস্থানও বৃদ্ধি পাচ্ছে। জাহাজ নির্মাণ ও জাহাজভাঙা শিল্পে ১৩তম শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। এক হিসাবে দেখা যায়, বাংলাদেশ এ শিল্পে বিশ্বে প্রায় ২৪ দশমিক আট শতাংশ অবদান রাখতে সক্ষম। চট্টগ্রাম ও মংলাবন্দরে প্রতি বছর ছয় লাখ নোঙর ফেলে। নীল অর্থনীতির সুবাদে এ সুযোগ অনেকগুণ বাড়ানো সম্ভব।

বিপুল সম্ভাবনাময় এ সমুদ্রসম্পদ আমাদের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ ও দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে পারে। দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান, খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় আমাদের দিতে পারে নতুন পথের সন্ধান ও দিকনির্দেশনা। যদি আমরা দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলি সঠিক গবেষণার মাধ্যমে, সমুদ্রের এই বিশাল সম্পদকে সংরক্ষণ ও আহরণ করে তার সঠিক ব্যবহার করতে পারি। সে লক্ষ্যে সরকার সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। এরই অংশ হিসেবে প্রজনন মৌসুমের ৬৫ দিন সমুদ্রে মাছ ধরা সরকারিভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া সমুদ্রসম্পদ আহরণের জন্য দেশের নৌযান বৃদ্ধি, সমুদ্রযান ক্রয়সহ দক্ষ জনবল তৈরির লক্ষ্যে মেরিন একাডেমি স্থাপনের কাজ অব্যাহত আছে।

সমুদ্র উপকূলীয় প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে এ ব্যাপারে সহযোগিতা গড়ে তোলা ও বলিষ্ঠ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সমুদ্র অর্থনীতি বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি করতে প্রস্তাব দিয়েছে চীন। সমুদ্র অর্থনীতি সহায়তা খাতে নবায়নযোগ্য শক্তি, মেরিন বায়োটেকনোলজি, ইকো ট্যুরিজম, সমুদ্রদূষণ, বনায়নসহ সমুদ্রসম্পদ আহরণে ও গবেষণার ব্যাপরে চীনের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করতে আগ্রহী বাংলাদেশ। ইতোমধ্যে সমুদ্রসম্পদ নিয়ে সহযোগিতার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে মেরিটাইম টাক্সফোর্সের এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সহযোগিতার যেসব ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয় সেগুলো হলোÑদুই দেশের সামর্থ্য বৃদ্ধি ও প্রশিক্ষণ, পারস্পরিক তথ্য আদান-প্রদান, মেরিন বায়োটেকনোলজি, গ্রিন ট্যুরিজম, সেবা খাত, মেরিন অ্যাকুয়াকালচার, গভীর সমুদ্রে মাছ চাষ, সামুদ্রিক বিপর্যয় ও সেচ  ইত্যাদি বিষয়ে যৌথ গবেষণা। দুই দেশের সমুদ্রসীমার বিপুল পরিমাণ মৎস্যসম্পদ, তেল, গ্যাস সম্পদ ও অন্যান্য মূল্যবান খনিজ সম্পদ আছে। এ সম্পদ আহরণে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতা, অভিন্ন কৌশল নির্ধারণে একমত হয়েছে দুটি দেশ। এই সহযোগিতার মধ্য দিয়ে পরিবেশবান্ধব উপায়ে নীল অর্থনীতির সুফল ভোগ করে বাংলাদেশ ও প্রতিবেশী দেশগুলো তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার টেকসই উন্নতি ঘটাক এবং জনগণের জীবনযাত্রার মান হোক আরও উন্নত, আরও সমৃদ্ধÑএ প্রত্যাশাই সবার কাম্য।

 

সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি)

নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলস্ লিমিটেড

[email protected]