ট্রাফিক ভালোই সামলেছে শিশু শিক্ষার্থীরা

খালিদ ফেরদৌস: বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ৪৭ বছরের ইতিহাসে ট্রাফিক পুলিশ ও যোগাযোগ প্রশাসন যে কাজটি করতে পারেনি, তা দু’তিন দিনে করে দেখিয়েছে স্কুল-কলেজপড়ুয়া তাজা-সবুজ প্রাণগুলো। আমরা রাস্তাঘাটে দেখেছি লেন মেনে লাইন দিয়ে বাস-ট্রাক, ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল, রিকশাসহ সব ধরনের যান চলতে। অ্যাম্বুলেন্স বা জরুরি কাজে নিয়োজিত যানের জন্য তারা ব্যবস্থা করেছে ইমারজেন্সি লেন। যার দরুন নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারছে এসব যানবাহন। কোমলমতি ছাত্রছাত্রীরা ট্রাফিক পুলিশের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে গাড়ি ও ড্রাইভারের লাইসেন্স চেক করছে। এক শিক্ষার্থী নিজের বাবার গাড়ির লাইসেন্স চেক করে বাংলাদেশের ইতিহাসে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার মানে ও গুণে কিছুটা ঘাটতি পরিলক্ষিত হওয়ায় অনেকে ভাবতেন চলমান প্রজন্ম দিয়ে তেমন কিছু হবে না। কিন্তু তাদের ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের দৃঢ়তা ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখে সত্যিই আশান্বিত হতে হয়। তারা খুব দক্ষতার সঙ্গে ট্রাফিক ব্যবস্থা পরিচালনা করেছে। কোনো ন্যায় দাবি আদায়ে কীভাবে আন্দোলন করতে হয়, তা তারা সবাইকে দেখিয়ে দিয়েছে।
‘সোশ্যাল মিডিয়া’ বিশেষ করে ফেসবুকের কল্যাণে তাদের অনেক ভিডিও, ছবি ও প্ল্যাকার্ডে লেখা সেøাগান ভাইরাল হয়েছে: যেমন ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, ‘যদি তুমি ভয় পাও, তবে তুমি শেষ’, ‘যদি তুমি রুখে দাঁড়াও, তবে তুমি বাংলাদেশ’, ‘মামা লাইসেন্স আছে তো’। ভাইরাল হচ্ছে বৃষ্টিতে ভিজে রিকশার লাইন ঠিক করে দেওয়ার ছবি, অসুস্থ রিকশাচালককে নিজেরাই রিকশা চালিয়ে হাসপাতালে নেওয়ার ভিডিও, রাস্তার ভাঙা কাচ পরিষ্কার করা, রোগী ও ডাক্তারকে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া।
যে স্লোগানটি সবচেয়ে বেশি ভাইরাল ও ভাবিয়ে তুলেছে, তা হলো ‘ভুলে গেছেন কী কয়েক মাস পর নির্বাচন? আমরা যদি ব্যালট বাক্স আর নির্বাচন কেন্দ্র পাহারার দায়িত্ব নিই, ভোট পাবেন তো?’ কিছু কিছু স্লোগানের ভাষা অশ্লীল কিন্তু যৌক্তিক দাবির কথা চিন্তা করে অনেকে এটাকে সচেতনভাবে এড়িয়ে যাচ্ছেন। তাছাড়া আমাদের শিল্প-সাহিত্যে প্রথিতযশা কবি-সাহিত্যিকদের লেখায় পরিস্থিতি ও ঘটনার ব্যাপকতা বোঝাতে অশ্লীল ভাষার ব্যবহার লক্ষ করা গেছে। যেমন দেশের খাদ্যাভাবের প্রকৃত চিত্র ফুটিয়ে তুলতে রফিক আজাদ তার কবিতায় লিখেছেন ‘ভাত দে হারামজাদা, নইলে মানচিত্র খাব’।”
এরপরও আন্দোলন কৌশল ও প্ল্যাকার্ডের ভাষা পড়ে ছোট ছেলেমেয়েদের আর ছোট ভাবার কারণ নেই। তারা আজ মন ও মননে বড় হয়ে গেছে। তারাও দেশ-জাতি নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে। যা দেশের জন্য শুভকর বলে নিঃসঙ্কোচে মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই।
যাহোক, তাদের এসব কর্মকাণ্ড পুলিশ প্রশাসনকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, তাদের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় ত্রুটিবিচ্যুতি, অনিয়ম ও দুর্নীতি ছিল। তারপরও এ জন্য শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে স্বয়ং পুলিশ সদস্যরাও বাহবা দিয়েছেন। ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলনের সঙ্গে অভিভাবকরাও সহযোগিতাপরায়ণ মনোভাব দেখিয়েছেন। যেখানে তাদের নামে এমন অভিযোগ ছিলÑঢাকা মহানগরের অভিভাবকরা ভিতু ও তাদের ছেলেমেয়েদের ন্যায্য দাবি আদায়ে সোচ্চার হতে বাধা দেয়। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে অনেক তারকা তাদের শুটিং ফেলে বৃষ্টিতে কাকভেজা ভিজেছেন। পুলিশের কেন্দ্রীয় প্রশাসন তাদের সঙ্গে সদয় আচরণ করতে নির্দেশ দিয়েছে। দু’একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া সরকার ও দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান আন্দোলনরত ছেলেমেয়েদের সঙ্গে নমনীয়তা দেখিয়েছে।
কিন্তু একটি কথা ভুলে গেলে চলবে না। এ আন্দোলন শুরুতে সাদা-কালো রঙে রঙিন থাকলেও আস্তে আস্তে তা নানা রঙে রঙিন হয়েছে। এ আন্দোলনে লেগেছে রাজনীতি, দলীয় স্বার্থ, গোষ্ঠীস্বার্থের রং। যা একটা ইতিহাস সৃষ্টিকারী সৃজনশীল আন্দোলনকে বিতর্কিত করেছে। ইতোমধ্যে অভিযোগ পাওয়া গেছে, মিরপুর-১০-এ পুলিশ ও ছাত্রলীগ মিলে আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীদের ওপর হামলা করেছে। কোনো কোনো জায়গায় গণগ্রেফতারের খবরও পাওয়া গেছে। যা সবাইকে দারুণভাবে মর্মাহত করেছে। অপরদিকে তারা আন্দোলন শান্তিপূর্ণভাবে চালিয়ে গেলেও এটা দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা ও স্বাভাবিক পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ। কারণ যখন সচিব-আমলা, পুলিশ, সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে নিয়োজিত বাহিনী ছেলেমেয়েদের কাছে তাদের লাইসেন্সকেন্দ্রিক অনিয়মের জন্য ধরাশায়ী হচ্ছে, তখন তারা অপমানের পাশাপাশি অসহায়ত্ববোধ করেছে। এতে করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মনোবল ভেঙে যাচ্ছে, নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে আমাদের জাতীয় মনোবলও যা আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অশনিসংকেত ছাড়া কী বলা যায়। আরও একটি ভয়ংকর তথ্য হলো, হাইকোর্টের একজন বিচারকের গাড়ি ও চালকের লাইসেন্স নবায়ন করা নেই। অথচ হাইকোর্ট আমাদের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির শেষ আশ্রয়স্থল। এখানকার বিচারপতিরা আইন মানার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে সবার কাছে উদাহরণ হবেন এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাদেরও আইন মানতে অনীহা! এ অচলায়তন ভাংতে সরকারসহ সর্বস্তরের জনগণকে দায়িত্বশীল হওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
এক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা সবচেয়ে অগ্রগণ্য। ইতোমধ্যেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় নিহত শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী দিয়া খানম মীম ও আবদুল করিম রাজীবের পরিবারকে ২০ লাখ টাকা করে সঞ্চয়পত্র সহায়তা প্রদান করেছেন। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর বরাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ৯ দফা দাবি মেনে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। দাবি পূরণের সঙ্গে সঙ্গে যদি প্রধানমন্ত্রী নৌপরিবহনমন্ত্রীকে পরিবহন সংগঠন থেকে পদত্যাগের ব্যবস্থা করেন, তবে পরিবহন সংগঠনের দৌরাত্ম্য কমার পাশাপাশি চালকদের বেপরোয়া গাড়িচালনা বন্ধ ও পরিবহন শ্রমিকরা যাত্রীবান্ধব হয়ে উঠবেন। কিন্তু কোথায়ও যেন রয়েছে আস্থা ও বিশ্বাসের সংকট। তাই সরকারের উচিত তাদের আস্থা ও বিশ্বাস তৈরি করার মতো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে দ্রুত সমস্যার সমাধান করা। আমরা ইতোমধ্যেই লক্ষ করেছি, গাড়ি ও পরিবহন শ্রমিকরা নিরাপত্তার সুতো তুলে অঘোষিত পরিবহন ধর্মঘট করেছেন। এই অযাচিত কর্মকাণ্ড যাত্রীসাধারণকে ব্যাপক ভোগান্তির মধ্যে ফেলে দিয়েছিল। এ সুযোগে স্বার্থান্বেষী মহল তাদের স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করবে, যা কারও জন্য ভালো কিছু বয়ে আনবে না।
বলা বাহুল্য, কোটা সংস্কার আন্দোলনের সর্বশেষ ফল বিষয়ে জনমনে একটা অসন্তুষ্টি আছে। তাই সরকারের পক্ষ থেকে ছেলেমেয়েদের যৌক্তিক দাবি মেনে নেওয়ার কথা বলে বাস্তবায়নে শৈথিল্য প্রদর্শন করা উচিত হবে না। অর্থাৎ তাদের মিষ্টি খাওয়ানোর নাম করে এক টাকার চকোলেট খাওয়ালে হবে না। এটি করা হলে আসল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে এবং পুনরায় এমন সমস্যা ফিরে ফিরে আসতে পারে অঅর এতে জনমনে ক্ষোভ ও হতাশার জš§ দেবে। যা দিন দিন জনদুর্ভোগ বাড়িয়ে দেবে। এর একটা স্থায়ী সমাধান একান্ত কাম্য। এটা করা হলে জনগণের মাঝে স্বস্তি ফিরে আসবে এবং দেশও সার্বিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে ধাপে ধাপে এগিয়ে যাবে।

এমফিল গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]