ডলারের মূল্যবৃদ্ধিজনিত সংকট সামাল দিন

গত আড়াই বছরে ডলারের বিপরীতে ছয় শতাংশ দর হারিয়েছে টাকা। আমদানি ব্যয়ের তুলনায় বাড়েনি বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস রফতানি আয় ও রেমিট্যান্সপ্রবাহ। বাজারে ডলার ছেড়ে এর দর ঠিক রাখার চেষ্টা অবশ্য করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তারপরও স্থির থাকছে না সেটি। বিশ্লেষকদের ধারণা, ডলারের দাম বৃদ্ধিতে আমদানি ব্যয় বাড়বে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলেও শঙ্কা তাদের। গতকাল শেয়ার বিজে প্রকাশিত ‘টাকার বিপরীতে ডলারের দাম আরও বৃদ্ধির শঙ্কা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এতে উদ্বিগ্ন। খবরটি উদ্বেগের বৈকি। আশার কথা, কেন্দ্রীয় বাংক এক্ষেত্রে উদাসীন নয়। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যবস্থা নিচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।
ডলারের দাম বৃদ্ধির মূল কারণ রফতানি ও রেমিট্যান্স বৃদ্ধির হার আমদানির তুলনায় অনেক কম। বিদেশি ঋণ পরিশোধও বেড়েছে। দেশে কিছু মেগা প্রজেক্ট চলমান। পদ্মা সেতু, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মতো কয়েকটি বড় প্রকল্প রয়েছে। এজন্যও আমদানি বেড়েছে। এতে সরবরাহের তুলনায় বেশি চাহিদা তৈরি হওয়ায় ডলারের ঘাটতি দেখা দিয়েছে বলে ধারণা। এ সমস্যা নিরসনে মুদ্রাবাজারের নিয়ন্ত্রক হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা বেশি। এগিয়ে আসতে হবে বিএবি, এবিবি, বাফেদাসহ সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোকেও। অংশীজনদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় ডলারের দাম বৃদ্ধিজনিত পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে বলেই প্রত্যাশা। বৈদেশিক বিনিয়োগ, রেমিট্যান্স ও রফতানি বৃদ্ধি এবং আমদানি যৌক্তিক রাখা গেলে তা অর্জন করা যাবে বৈকি। বৈদেশিক বাণিজ্যের আড়ালে প্রতিবছর বিপুল অঙ্কের অর্থ পাচার হয়। আমাদের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের (বিএফআইইউ) সক্ষমতা বাড়াতে হবে এক্ষেত্রে। বিদেশের ব্যাংকগুলোতে থাকা বাংলাদেশিদের অর্থের তথ্য পাইনি আমরা। অথচ ভারত সরকারকে এ-জাতীয় তথ্য দিতে রাজি হয়েছে অনেক ব্যাংক। জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রশাসনে একধরনের শৈথিল্য থাকে দেশে। এ সুযোগে মুদ্রাপাচারের সঙ্গে সঙ্গে বাজারে অর্থ সরবরাহ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়াতেও মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে। প্রভাবিত হতে পারে ডলারের দাম। তবে ইতোমধ্যে এর দাম বৃদ্ধির কারণটি ভিন্ন বলেই মনে হচ্ছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইনটিগ্রিটির (জিএফআই) তথ্য হলো, আমদানি-রফতানির সময়ে পণ্যের প্রকৃত মূল্য গোপন করার মাধ্যমেই অর্থের বড় অংশ পাচার হয়েছে। বাংলাদেশ বিষয়ে এটি বিশেষভাবে বলা হয়েছে। আমরা মনে করি, বিনিয়োগের উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলেও অর্থ পাচার কমানো যেত। সে লক্ষ্যেও কার্যক্রম জোরদার করে তুলতে হবে।
বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেঁধে দেওয়া দামের চেয়ে বেশি দামে ডলার বিক্রি করছে বলে অভিযোগ। যে যার মতো দাম নিচ্ছে বলেও খবর আছে। সরকারি, বেসরকারি ও বিদেশিÑতিন ধরনের ব্যাংকের তিন রকম রেট। মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানগুলোর আরেক রেট। এটাও ডলারের বাজারে অস্থিরতার কারণ। এগুলোর মধ্যে সমন্বয় থাকলে সমস্যাটা সহনীয় পর্যায়ে থাকত বলেই মনে হয়। বাজারভিত্তিক ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলারের দর বেঁধে দিতে পারে না, এটাও ঠিক। তবে তদারকির দায়িত্ব কোনোভাবেই এড়াতে পারে না।
মুদ্রা বিনিময় হারের অনাকাক্সিক্ষত ওঠানামার ফলে ব্যবসায়ীরা ঝুঁকিতে পড়েন। ভোক্তারাও এর বাইরে নন। এক্ষেত্রে ঝুঁকি বণ্টন পদ্ধতি (হেজিং) চালুর বিষয় বিবেচনা করতে পারে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো।
আর মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে যে লক্ষ্যমাত্রা
স্থির করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, সেগুলো অর্জনে ডলারের মূল্যবৃদ্ধি যাতে প্রতিবন্ধক না হতে পারে, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটিকে।