ডাকসু নির্বাচন কবে?

তৌহিদুর রহমান: ডাকসু নির্বাচন নিয়ে কত কথা, কত আলোচনা। আজ হয় তো কাল হয় না। এ উপাচার্য বলেন নির্বাচন দেবেন তো আরেকজন বলেন পরিস্থিতি অনুকূলে নেই। কিন্তু তাতে কী? সাধারণ শিক্ষার্থী আর সাবেক নেতা থেকে শুরু করে সুশীল সমাজের প্রায় সবাই গলা ফাটাচ্ছেন ডাকসু চাই, ডাকসু চাই বলে। আজ এ দাবি জোরালো হচ্ছে তো কাল আবার স্তিমিত হয়ে যাচ্ছে। এভাবেই কেটে গেছে দীর্ঘ ২৮ বছর।

গত কয়েকদিন ধরে আবারও ডাকসু নির্বাচনের গরম খবর পত্রিকার পাতা আর টেলিভিশনের পর্দায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ অবশেষে ডাকসু নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানিয়েছে। কবে হবে সে নির্বাচন? আগামী বছরের মার্চ নাগাদ, ঠিক এক বছর পর! ডাকসুর মতো একটি নির্বাচনের আয়োজন করতে কি আসলেই এক বছর সময় লাগে। অথচ বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনও দুই-তিন মাসের প্রস্তুতিতে সম্পন্ন করা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সান্ধ্যকালীন মাস্টার্সের ছাত্র ওয়ালিদ আশরাফ ডাকসু নির্বাচনের দাবিতে গত বছরের ২৫ নভেম্বর থেকে অনশন শুরু করেছিলেন। এরপরই আবারও জোরালো হয় ডাকসু নির্বাচনের দাবি। যদিও এর কিছুদিন আগে থেকেই ডাকসু নির্বাচনের দাবিতে সরব ছিল বেশ কিছু বাম ছাত্র সংগঠন ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এর ঠিক ১৫ দিন পর ডাকসু নির্বাচন করার আশ্বাস দিয়ে ওয়ালিদের অনশন ভাঙান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান।

তারপর পার হয়ে গেছে তিন মাস। বরাবরের মতোই এ সময় ডাকসু নির্বাচনের দাবিটাও অনেকটা স্তিমিত। এরই মধ্যে আবারও গণমাধ্যমের খবর ডাকসু নির্বাচন নিয়ে। বলা হচ্ছে, ডাকসু নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান বলেছেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। হলগুলোতে ছাত্রদের নতুন করে তথ্য হালনাগাদ করতে বলা হয়েছে।

আবারও সেই আশাবাদী হওয়ার পালা। এবারের আশ্বাসও সেই তথাকথিত লোক দেখানো হবে কি না তা সময়ই বলে দেবে। অতীতের সব উপাচার্যের মতোই বর্তমান উপাচার্যের কথায়ও খুব বেশি ভরসা পাই না। তবে বরাবরের মতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী হিসেবে এবারও আশাবাদী হতে চাই। কারণ ডাকসু নির্বাচনটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক হোক কিংবা বর্তমান, সব শিক্ষার্থীরই প্রাণের দাবি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিতভাবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় শিক্ষক সমিতির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ২৫ জন রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট প্রতিনিধি নির্বাচনের প্রক্রিয়াও সম্পন্ন হয়েছে সম্প্রতি। নিয়মিত অনুষ্ঠিত হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী সমিতির নির্বাচনও। কিন্তু যাদের জন্য এ বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী; সেই ৪০ হাজার শিক্ষার্থীর গণতান্ত্রিক অধিকারের নির্বাচন কোথায়? শিক্ষার্থীদের হয়ে কথা বলা ডাকসুর নির্বাচনই নেই ২৮ বছর!

বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চশিক্ষার জন্য। সেখানে শিক্ষার্থীরাই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ হবে এটাই স্বাভাবিক। এখানে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গণতান্ত্রিক অধিকার যেমন আছে, সাধারণ শিক্ষার্থীদেরও সে অধিকার থাকতে হবে এবং অবশ্যই সেটা সবার আগে। এটাই বাস্তবতা। কিন্তু শিক্ষার্থীদের সেই অধিকারই আজ যেন অনেকটাই ভূলুণ্ঠিত। সাধারণ শিক্ষার্থীদের জীবন যেন হল, ক্লাস আর পরীক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে! আর মাঝে মধ্যে তাদের সামনে ডাকসু নির্বাচন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে। এটা যে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এক ধরনের প্রহসন, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এর মাধ্যমে কোনো পক্ষ রাজনৈতিক ফায়দা লুটছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলার অবকাশ রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এখন কতটা অসহায়, তা সাম্প্রতিক একটি কর্মকাণ্ড চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের এস এম হলের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র এহসান রফিককে সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে রাতভর মারধর ও মানসিক নির্যাতন করে কয়েকজন। এতে এহসানের চোখ নষ্ট হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। তার অপরাধ? অপরাধ হচ্ছে, নিজের ক্যালকুলেটর ফেরত চাওয়া। মারল কারা?Ñক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এর একদিন পরে খবরটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে টনক নড়ে সবার। অথচ তার আগেই ওই ছাত্রের ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গেছে। যদিও পরে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের পদধারী নেতাসহ সাতজনকে বহিষ্কার করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এ নির্যাতনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কর্র্র্তৃপক্ষকে সাধুবাদ জানাই।

বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন ডাকসু নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত ছাত্রনেতা থাকলে বিষয়টি এতদূর গড়াত না। তারা অবশ্যই বিষয়টি শোনার সঙ্গে সঙ্গেই একটা ব্যবস্থা নিতে পারতেন। শুধু এই একটি ঘটনাই নয়। প্রতিনিয়ত বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল ও ক্যাম্পাসে নানা ধরনের নির্যাতন ও বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, হলের গেস্ট রুমগুলো রাতের আঁধারে পরিণত হচ্ছে টর্চার সেলে। এসব গেস্ট রুমগুলোতে কী ধরনের নির্যাতন হয় তার ভুক্তভোগী আমি নিজেই। সেখানে দেখেছি শিক্ষার্থীদের কীভাবে শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রতিনিয়ত নির্যাতন করা হয়। খাবারের মান নামতে নামতে তলানিতে পৌঁছেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সরব শিক্ষাবিদরা। সান্ধ্যকালীন কোর্সের নামে ক্যাম্পাসে শিক্ষা নিয়ে কী চলছে, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে; যা নিয়ে শিক্ষার্থীরাও চরম ক্ষুব্ধ। আবাসন, ক্লাসরুম লাইব্রেরির সিট সংকটসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত বিশ্ববিদ্যালয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এমনই নানা ধরনের বিরূপ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন দীর্ঘদিন ধরে। কিন্তু প্রতিবাদ করার ভাষাই যেন তারা হারিয়ে ফেলেছেন। তাদের পক্ষেও যেন এখন কথা বলার কেউ নেই। কেউ কোনো কথা বলতে গেলেই বিরাগভাজন হচ্ছেন অনেকের। এভাবেই চলছে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে ও ডাকসু নির্বাচনের দাবিতে কিছু বাম ছাত্র সংগঠন দীর্ঘদিন ধরেই সরব। তবে যখনই এ ধরনের দাবিগুলো উঠেছে, তখনই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নানা অজুহাতে এড়িয়ে গেছে। বিশেষ করে সদ্য বিদায় নেওয়া টানা দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করা প্রতাপশালী উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। তার কাছে যখনই সাধারণ শিক্ষার্থীরা ডাকসু নির্বাচনের দাবি নিয়ে গেছেন, তখনই তিনি নানা অজুহাত দেখিয়েছেন। আর সাংবাদিকরা যখনই তাকে প্রশ্ন করেছেন তখন তিনি বলেছেন, ক্যাম্পাসে ডাকসু নির্বাচন দেওয়ার মতো পরিবেশ নেই। ডাকসু নির্বাচন দিতে আসলে কী ধরনের পরিবেশ প্রয়োজন?

আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানের আলোকে বলতে পারি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গত দুই-তিন দশকের মধ্যে যে ক’জন উপাচার্য দায়িত্ব পালন করেছেন তার মধ্যে সম্ভবত তিনিই সবচেয়ে মসৃণ পথ পাড়ি দিয়েছেন। ক্ষমতাসীন দলের সর্বোচ্চ সমর্থন পেয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ছাত্র সংগঠন কিংবা সাধারণ ছাত্রদের কাছ থেকেও প্রশাসন চালাতে বেগ পাওয়ার মতো তেমন কোনো পরিস্থিতির শিকার হননি। অনেকটা ঝামেলামুক্তভাবেই দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ডাকসু নির্বাচনের জন্য এর থেকে ভালো আর কী ধরনের পরিবেশ দরকার পড়ে?

অতীতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন ডাকসুর নেতারা। শিক্ষার্থীরা কোনো বিপদে পড়লে কিংবা দেশ কোনো সংকটে পড়লে ডাকসুর নির্বাচিত নেতারা সবার আগে এগিয়ে এসে প্রতিবাদ করতেন, সমস্যার সমাধানে উদ্যোগ নিতেন। অথচ সেই ডাকসুই এখন ধুঁকছে। জরাজীর্ণ ডাকসু ভবনটি এখন যেন কালের সাক্ষী হয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে। ছাত্রছাত্রীদের কাছে এর পরিচয় এখন ক্যাফেটেরিয়া বা এক টাকা মূল্যের চায়ের জন্য!

ডাকসু নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তার কথা বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য মো. আবদুল হামিদ সর্বশেষ সমাবর্তনে বলেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামানও এ নির্বাচনের পক্ষে। ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, ছাত্র ইউনিয়নসহ সব সংগঠনই এ নির্বাচন চান। তাহলে এ নির্বাচন নিয়ে তো আর কোনো বাধা থাকার কথা নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি ডাকসু নির্বাচন। আর তাদের দাবির সঙ্গে একাত্ম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীরাও। এছাড়া ডাকসুর সাবেক নেতা, শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে সবাই ডাকসু নির্বাচনের কথা বলছেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অনুধাবন করতে হবে। ডাকসু নির্বাচন দিলে শিক্ষার্থীরা যতটা খুশি হবে অন্য কিছু দিয়ে সম্ভবত এতটা খুশি তাদের কেউ করতে পারবে না।

বর্তমান উপাচার্য আবারও ডাকসু নির্বাচন নিয়ে উদ্যোগের কথা বলেছেন। তার এ কথায় আবারও কিছু সংশয়ের সঙ্গেই আশাবাদী হতে চাই। তবে এবারের নির্বাচনের প্রতিশ্রুতিও যেন প্রহসনে পরিণত না হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক শিক্ষার্থী হিসেবে সেই আহ্বান রইল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের প্রতি। আর অতীতের মতো আবারও বলতে চাই, গত ২৮ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা যা পারেননি বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান তা করে দেখিয়ে দিতে পারেন। এতে সম্ভবত বিশ্ববিদ্যালয় তথা বাংলাদেশের ইতিহাসে তার নামটি স্বর্ণাক্ষরেই খোদিত থাকবে।

 

গণমাধ্যমকর্মী

 

touhiddu.rahman1Ñgmail.com