সাক্ষাৎকার

ডাচ্-বাংলা ব্যাংক সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে সচেতন

আবুল কাশেম মো. শিরিন ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। সম্প্রতি শেয়ার বিজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি প্রযুক্তিনির্ভর এ ব্যাংকের নানা দিক তুলে ধরেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তানিয়া আফরোজ

শেয়ার বিজ: ব্যাংক খাতে প্রযুক্তির অভিজ্ঞতা থেকে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার পদে আসা সাধারণত দেখতে পাওয়া যায় না। আপনি এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। এটি কীভাবে সম্ভব হলো?

আবুল কাশেম মো. শিরিন: আমাদের ব্যাংক সবসময় প্রযুক্তিনির্ভরতাকে গুরুত্ব দিয়েছে। সে কারণেই আজ আমি ব্যবস্থাপনা পরিচালক। ব্যাংক খাতে আমিই একমাত্র প্রযুক্তি থেকে প্রধান নির্বাহীর পদে এসেছি। অর্থাৎ এই ব্যাংকের ভিশনটা দেখতে হবে। পরিচালনা পর্ষদ প্রযুক্তিতে যথেষ্ট বিনিয়োগ করেছে। প্রযুক্তির নেতৃত্বই তারা চাচ্ছে। প্রযুক্তির মাধ্যমেই আমরা এ পর্যায়ে এসেছি। এটিই এ ব্যাংকের বিশেষত্ব।

শেয়ার বিজ: ব্যাংক খাত প্রযুক্তিয়ানের প্রথম দিকে আপনি ক্যারিয়ার শুরু করেন। শুরুর সময়টা কেমন ছিল?

আবুল কাশেম মো. শিরিন: আমাদের দেশে ব্যাংক খাত প্রথম কম্পিউটারাইজ্ড হতে শুরু করে নব্বইয়ের দশকে। তখন শাখাভিত্তিক সফ্টওয়্যারের মাধ্যমে ডিসেন্ট্রালাইজড ব্রাঞ্চ ব্যাংকিং শুরু হয়। দেশের ব্যাংকগুলোর মধ্যে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক ২০০৩ সালে সেন্ট্রালাইজড অনলাইন ব্যাংকিং শুরু করে। একই সঙ্গে ইস্টার্ন ও ঢাকা ব্যাংকেও প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়। বিশ্বের সব প্রযুক্তিই এখন আমাদের দেশে রয়েছে। বরং কিছু জায়গায় আমরা অভিনব। যেমন মোবাইল ব্যাংকিং ও বায়োমেট্রিক এজেন্ট ব্যাংকিং বেশিরভাগ দেশেই নেই। তবে আমাদের দেশের সমস্যা হচ্ছে সব প্রযুক্তির ব্যবহার শতভাগ ব্যাংক করেনি। এটা না হলে সব গ্রাহক সব ধরনের সুবিধা পাবে না।

শেয়ার বিজ: ২০১৮ সালে ব্যাংকের পারফরম্যান্স কী?

আবুল কাশেম মো. শিরিন: সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু মুনাফা। তবে মুনাফা অর্জনে আমরা খুব এগ্রেসিভ নই। গত বছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আমরা বেশি মুনাফা অর্জন করেছি। ২০১৮ সালে আমাদের পরিচালন মুনাফা আগের বছরের তুলনায় ২২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৯২২ কোটি টাকা হয়েছে। ঋণ ও বিনিয়োগে প্রবৃদ্ধি ছিল ১২ শতাংশ এবং আমানত সংগ্রহে ১২ শতাংশ। আমরা নেক্সাস-পে গতবছর শুরু করেছি, যেখানে মাত্র ছয় মাসে আমরা ১৮ লাখ গ্রাহক পেয়েছি। এটা একটা ভালো অর্জন। গত বছর ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের মাধ্যমে ৯৩৬ মিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। এই খাতে আমরা চতুর্থ অবস্থানে চলে এসেছি এবং এখানে প্রবৃদ্ধি প্রায় ৩২ শতাংশ। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে বর্তমানে ১২ লাখ অ্যাকাউন্ট, যেখানে আগের বছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি ৫৭ শতাংশ। আমানত সংগ্রহের জন্য চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও আমাদের আমানতের প্রবৃদ্ধি ভালো হয়েছে। সেখানে আমাদের উল্লেখযোগ্য হারে অ্যাকাউন্ট বাড়ছে।

শেয়ার বিজ: টিয়ার-৪ ডেটা সেন্টার বাংলাদেশে প্রথম এনেছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক। এটি কী?

আবুল কাশেম মো. শিরিন: আমাদের ডেটা সেন্টার ছিল দুটো ডেটা সেন্টার (ডিসি) এবং ডিসাস্টার রিকভারি সাইট (ডিআরএস)। সাধারণত সব ব্যাংকের তা-ই থাকে। আমরা দেখলাম ডিআরএস পূর্ণাঙ্গভাবে চলতে পারে না। এটি শুধু ব্যাকআপ হিসেবে রাখা হয়। পূর্ণাঙ্গভাবে চলার জন্য যে একমাত্র ডিসি’টি রয়েছে, তা যদি কোনো কারণে নষ্ট হয়, তাহলে পুরো ব্যাংকের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে পুরো অনলাইন সিস্টেম বন্ধ রেখে তা সারাতে হয়। এ সমস্যা দূর করার জন্য অন্য একটি ডিসি’র দরকার। নিরাপত্তার জন্য ডিসি’র ব্যাকআপ রাখা দরকার। এটা চিন্তা করেই ২০০ কোটি টাকার এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এই তথ্যকেন্দ্র এমনভাবে করলাম যেন টিয়ার-৪ হয়। এর সুবিধা হলো টিয়ার-৪ ডেটা সেন্টার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। এতে সব ধরনের নিরাপত্তার বেষ্টনী তৈরি করতে হয়। বিভিন্ন ধরনের আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রাখতে হয়। আমরা তথ্যকেন্দ্রের নিরাপত্তার ব্যাপারে নিশ্চিত থাকতে পারি, যদি এটি আন্তর্জাতিক সংস্থা কর্তৃক টিয়ার-৪ সনদপ্রাপ্ত হয়।

শেয়ার বিজ: সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাংকগুলো যথেষ্ট সচেতন নয় বলে মনে করা হয়। ডাচ্-বাংলা ব্যাংক এ ক্ষেত্রে কতটা এগিয়ে?

আবুল কাশেম মো. শিরিন: ডাচ্-বাংলা ব্যাংক সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে সচেতন। চার বছর হলো আমরা আইটি নিরাপত্তা বিভাগ আলাদা করেছি। দক্ষ লোকদের এ বিভাগের দায়িত্ব দিয়েছি। নিরাপত্তা অনুমোদন ছাড়া আমাদের আইটি বিভাগ যন্ত্রাংশ পরিবর্তন বা অন্য কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। দেশে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকেই কেবল আলাদা আইটি নিরাপত্তা বিভাগ রয়েছে।

শেয়ার বিজ: ‘নেক্সাস-পে’ সেবাটি সম্প্রতি আপনারা প্রচলন করেছেন। সেবা প্রদানে এটি এখনও ত্রুটিপূর্ণ বলে অভিযোগ রয়েছে। এটি কেন হচ্ছে?

আবুল কাশেম মো. শিরিন: বই ছাপানো হলে এটা প্রুফ রিড করার সুযোগ থাকে, কিন্তু প্রযুক্তিতে মাঠপর্যায়ে না গিয়ে সংশোধনের কোনো সুযোগ থাকে না। ‘নেক্সাস-পে’ ছয় মাস হলো চালু হয়েছে। নতুন কোনো প্রযুক্তি চালু হলে ট্রায়াল অ্যান্ড এরোরের মাধ্যমে কিছু সময় যায় একে সংশোধন করতে। বড় কোনো কম্পিউটার প্রোগ্রামই একবারে সঠিক হয় না। কিছু না কিছু ভুল থাকেই, যা সংশোধন করতে বেশ সময় লাগে। মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম চালালে বিভিন্ন সংশোধনের মাধ্যমে এটা ঠিক হয় পাঁচ থেকে ছয় মাসে। তাই প্রথম দিকে এটির মধ্যে কিছু বিচ্যুতি দেখা গেছে। তবে এ ছয় মাসে নেক্সাস-পে স্থিতিশীল হয়েছে। এরই মধ্যে ১৮ লাখ গ্রাহক এ সেবাটি ব্যবহার করছে।

শেয়ার বিজ: আট বছর ধরে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা ‘রকেট’ চালু আছে। কিন্তু এটি মুনাফার মুখ তেমন একটা দেখতে পায়নি। কেন?

আবুল কাশেম মো. শিরিন: এতদিন আমরা ক্ষতির মধ্যে ছিলাম। সম্প্রতি মুনাফায় এসেছি। দীর্ঘদিন ক্ষতির মধ্যে থাকার কারণ ছিল অসম প্রতিযোগিতা। প্রথমে ১৮টা ব্যাংক ছিল, এখন মাত্র দুটি ভালোভাবে টিকে আছে। অন্যেরা নামে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। গ্রাহকের কেওয়াইসি নিয়ে হিসাব খোলার বাধ্যবাধকতা মেনে চলে ব্যাংকগুলো। একটি প্রতিষ্ঠান প্রথম থেকেই এগ্রেসিভ ব্যবসা করছে। প্রথম দিকে নতুন প্রযুক্তিতে যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগেই তারা অনেক প্রসার ঘটিয়ে ফেলে। তবে পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণের মধ্যে।

শেয়ার বিজ: আমরা দেখতে পাই ব্যাংক খাতের সিএসআর প্রোগ্রামগুলো খুব একটা গঠনমূলক নয়। ডাচ্-বাংলা ব্যাংক প্রযুক্তির উন্নয়নের পাশাপাশি করপোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটিতেও এগিয়ে। এ ব্যাংক কতটা গঠনমূলক সিএসআর কার্যক্রম পরিচালনা করে?

আবুল কাশেম মো. শিরিন: ডাচ্-বাংলা ব্যাংক শুরু থেকেই গঠনমূলক প্রক্রিয়ায় সিএসআর প্রোগ্রাম অনুসরণ করে আসছে। আমরা ধারাবাহিকভাবে প্রোগ্রামগুলো পরিচালনা করি। ঠোঁটকাটা ও ছানিপড়া রোগীদের চিকিৎসায় বাংলাদেশের অনেক হাসপাতালের সঙ্গে আমাদের চুক্তি করা আছে। প্রতি বছর আমরা প্রায় পাঁচ হাজার ছাত্রকে স্কলারশিপ দিয়ে থাকি। আমরা গণিত ও ফিজিক্স অলিম্পিয়াড স্পন্সর করছি।

শেয়ার বিজ: রিসাইকেল এটিএম চালু হয়েছে বাংলাদেশে। এ ব্যাপারে আপনারা কতদূর ভাবছেন?

আবুল কাশেম মো. শিরিন: এতে যে সুবিধা তা হচ্ছে, একজন গ্রাহক যে টাকাটা জমা দিচ্ছে, আরেকজন গ্রাহক সেই টাকাটা ওঠাচ্ছে। রিসাইকেল এটিএম এখন পর্যন্ত ঢাকা শহরের মধ্যে অল্প সংখ্যক রয়েছে। আমরা এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে চলেছি। এটিএমের সেট আপ আছে। এর মধ্যেই রিসাইক্লিং ডিপোজিট মেশিন স্থাপন করা হলে গ্রাহক টাকা জমা দিলে সঙ্গে সঙ্গে অ্যাকাউন্টে ক্রেডিট হয়ে যাবে। আমরা আশা করছি অনলাইন ডিপোজিট মেশিন অথবা রিসাইকেল এটিএম চলতি বছরের মধ্যেই স্থাপন করব।

শেয়ার বিজ: বাংলাদেশ ব্যাংকের একটা নতুন উদ্যোগ ‘বুথ ব্যাংকিং’। আপনারা এ নিয়ে কতদূর ভেবেছেন?
আবুল কাশেম মো. শিরিন: চিন্তা-ভাবনা করছি। এখনও শুরু করিনি।

শেয়ার বিজ: ব্যাংক খাতের সংস্কারে কী করা উচিত বলে মনে করেন?
আবুল কাশেম মো. শিরিন: সরকার সম্প্রতি কিছু উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। শ্রেণিকৃত ঋণ কমিয়ে আনা, সিআইবি শক্তিশালী করা, মোবাইল ব্যাংকিং সেবা দেশের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া, এজেন্ট ব্যাংকিং সম্প্রসারণ করা, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রণ আরও কার্যকর করা প্রভৃতি। খুবই ভালো উদ্যোগ। আমরা এগুলোর বাস্তবায়ন চাই। আমি বলব এগুলো খুব সময়োপযোগী ও সাহসী উদ্যোগ।

শেয়ার বিজ: ব্যাংক খাতে নেতৃত্ব সংকট আছে বলে মনে করেন কি?

আবুল কাশেম মো. শিরিন: আমি মনে করি প্রত্যেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তারই দক্ষতা আছে। না হলে তো তারা ব্যবস্থাপনা পরিচালক হতে পারতেন না। সবাই মুনাফা অর্জনে এগিয়ে আছে। কেউ খারাপ করেনি। তবে দক্ষতাকে কীভাবে কাজে লাগাচ্ছেন, সেটাই প্রশ্ন। আমার মনে হয় ঋণখেলাপির সংস্কৃতি থেকে সবাই যদি বেরিয়ে আসতে পারি, যদি আপস না করি, তাহলেই ব্যাংক খাতে নেতৃত্বের গুণগত মান প্রমাণিত হবে।

সর্বশেষ..