ডিজিটাইজেশনে টেলিকম অপারেটরদের ভবিষ্যৎ

আংকিত সুরেকা: গত কয়েক দশকে বিশ্বব্যাপী যে অভাবনীয় প্রযুক্তিগত উন্নয়ন সাধিত হয়েছে, তার পেছনে টেলিকম অপারেটরদের বিরাট ভূমিকা রয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির যোগাযোগব্যবস্থা সাধারণ মানুষের হাতের মুঠোয় পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে টেলিকম অপারেটররা। বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তের মানুষের কাছে নিঃসন্দেহে আজ যোগাযোগের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম টেলিকম সার্ভিস। জিএসএমএ’র তথ্যমতে, বিশ্বে বর্তমানে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা পাঁচ বিলিয়ন বা ৫০০ কোটির বেশি।
তবে ভবিষ্যতে টেলিকম অপারেটরদের ভূমিকা ও কার্যপ্রণালির ভিত্তি কী হবে, তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা শুরু হয়েছে বিশেষজ্ঞ মহলে। এ আলোচনার মূলে রয়েছে টেলিকম অপারেটরদের ওপর প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সম্ভাব্য প্রভাব। বর্তমান বিশ্বে ডিজিটাইজেশনের ফলে যেহেতু তথ্যপ্রযুক্তির আমূল পরিবর্তন হচ্ছে, সেহেতু তা মোবাইল অপারেটরদের কার্যক্রমকে প্রভাবিত করবেÑএটাই স্বাভাবিক। তাই এ পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে মোবাইল ফোন অপারেটরদের ভবিষ্যৎ অবস্থান নির্ণয় জরুরি।
বর্তমানে মোবাইল ফোন অপারেটরদের ভূমিকা নির্ধারণ কেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছে, তা বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা যাক। শুরু থেকে মোবাইল ফোন অপারেটরদের মূল ভূমিকা ছিল ‘ভয়েস কলিং’ সেবা প্রদান। দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্বজুড়ে ‘ভয়েস কলিং’ই ছিল যোগাযোগের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। কিন্তু বর্তমানে এ পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটছে। ইন্টারনেটের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় ভয়েস কলিংয়ের পাশাপাশি যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে বিভিন্ন ধরনের ইন্টারনেটভিত্তিক ম্যাসেজিং সেবা। ইন্টারনেটের সুবিধা থাকলে এখন কলিং ও টেক্সট ম্যাসেজিংয়ের পাশাপাশি ভিডিও কলিংয়ের মাধ্যমেও সহজে যোগাযোগ করতে পারছেন ব্যবহারকারীরা। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, যোগাযোগব্যবস্থার এই প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে মোবাইল ফোন অপারেটররা কীভাবে মানিয়ে নেবে?
প্রশ্নটি পর্যালোচনার পূর্বে একটি অত্যন্ত মৌলিক বিষয় স্মরণে রাখা প্রয়োজন। বিষয়টি হলো প্রযুক্তির ক্রমবিকাশের অনিবার্যতা। প্রযুক্তি যেহেতু পরিবর্তনশীল, সেহেতু অতীতের কোনো প্রযুক্তি বর্তমানে সমানভাবে কার্যকর থাকবে কিনা বা গৃহীত হবে কিনা, তা নিশ্চিতভাবে বলা প্রায় অসম্ভব। তাই প্রযুক্তিবিষয়ক সব ধরনের প্রতিষ্ঠানকে গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখতে হলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হতে হবে। এই মৌলিক ধারণাটির পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় মোবাইল ফোন অপারেটরদের ইন্টারনেটভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে ‘ভয়েস কলিং’-এর প্রতিযোগী হিসেবে বিবেচনা না করে প্রযুক্তির ক্রমবিকাশের একটি পর্যায় হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। ভয়েস কলিংয়ের পাশাপাশি তাই ইন্টারনেট ব্যবহারকে গুরুত্বারোপ করে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করা জরুরি। এক্ষেত্রে বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, ইন্টারনেটের ব্যবহার শুধু যোগাযোগব্যবস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিনিয়ত ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্র বিস্তৃত হচ্ছে; ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে।
কেনাকাটা, পরিবহন, অর্থ লেনদেন, বিনোদন ও চিকিৎসাসহ জীবনযাত্রার প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রকেই ইন্টারনেট প্রভাবিত করছে ব্যাপকভাবে। আর যেহেতু মোবাইল ফোন অপারেটররা বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট সেবার অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী, তাই এক্ষেত্রে তাদের পক্ষে অগ্রণী ভূমিকা পালন করা সম্ভব। বাংলাদেশে টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির তথ্যমতে, বাংলাদেশের মোট আট কোটি ৮৬ লাখ ৮৭ হাজার ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর মধ্যে আট কোটি ২৯ লাখ ১২ হাজারই মোবাইল ফোন ইন্টারনেট ব্যবহারকারী।
উন্নত মানের ইন্টারনেট সংযোগ প্রদানের পাশাপাশি ডিজিটাল যুগের গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল সেবা প্রদানের ওপরই নির্ভর করছে মোবাইল ফোন অপারেটরদের ভবিষ্যৎ। মোবাইল ফোন অপারেটররা ডিজিটাল সেবা উদ্ভাবন ও বিপণনে যতটা নতুনত্ব আনতে পারবে, ততটাই তারা নতুনভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারবে গ্রাহকের কাছে। বিষয়টি আপাত দৃষ্টিতে চ্যালেঞ্জিং মনে হলেও মোবাইল ফোন অপারেটরদের জন্য তা অসম্ভব নয়। কারণ, অপারেটরদের রয়েছে গ্রাহকসেবা প্রদানের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। নির্দিষ্ট কিছু সেবার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে গ্রাহকের জন্য বাড়তি কিছু করার অনুপ্রেরণা থেকে অত্যাধুনিক সব ডিজিটাল সেবা নিয়ে আসাই হওয়া উচিত মোবাইল ফোন অপারেটরদের মূল লক্ষ্য। সেক্ষেত্রে তারা হয়তো চিরাচরিত ‘মোবাইল ফোন অপারেটর’ থেকে রূপান্তরিত হয়ে পরিণত হবে ভিন্ন আঙ্গিকের ডিজিটাল সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানে। প্রযুক্তির ক্রমবিকাশের স্বার্থে ও গ্রাহকসেবায় নতুন মাত্রা আনতে এই নতুন পরিচয় গ্রহণ অবশ্যই সমীচীন।
আমাদের দেশেও এই চিন্তাধারা ও তার বাস্তবায়নে বিশ্বাসী। দেশে বাংলাফ্লিক্স, ই-শপ, হেলথলিংক ও বইঘরের মতো ডিজিটাল সেবাগুলো এ লক্ষ্য নিয়েই চালু করা হয়েছে। এছাড়া ডিজিটাইজেশনের সুফল দেশের প্রত্যেক প্রান্তে পৌঁছে দিতে দেশি-বিদেশী বিভিন্ন ডিজিটাল সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। দ্রুতগতির ইন্টারনেটের মাধ্যমে অত্যাধুনিক সব ডিজিটাল সেবা প্রদান করে ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্যে কাজ করা হচ্ছে।
গ্রাহকসেবায় প্রতিনিয়ত নতুন মাত্রা যোগ করতে না পারলে তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ এ বিশ্বে যে কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষেই গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখা কঠিন। আগামীতে মোবাইল ফোন অপারেটরদের বিষয়টি বিবেচনা করেই কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। তবে মোবাইল ফোন অপারেটরদের কার্যক্রমের পরিসর এতই বিস্তৃত যে, শুধু তাদের প্রচেষ্টাই আকাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জনের জন্য যথেষ্ট নয়। সার্বিকভাবে ডিজিটাল উদ্ভাবন-বান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা গেলে মোবাইল ফোন অপারেটরদের বিকাশের পথ সুনিশ্চিত হবে। আর এ ক্ষেত্রে সরকার উপযুক্ত নীতিমালা প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়নের মাধ্যমে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

করপোরেট কমিউনিকেশনস সিনিয়র ম্যানেজার
বাংলালিংক ডিজিটাল কমিউনিকেশন লিমিটেড