মত-বিশ্লেষণ

ডিজিটাল মার্কেট নিয়ন্ত্রণের সংকট

বিক্রম সিনহা: ডিজিটাল মার্কেট একটি নতুন ধারণা। এখানে আধুনিক প্রতিযোগিতা কৌশলের কারিগরি সক্ষমতা এখনও পর্যাপ্ত হয়ে ওঠেনি।
মার্ক জুকারবার্গ ফেসবুক বন্ধ করে দিতে পারবেন না কিন্তু সরকার পারবে। সাম্প্রতিক এক ফোনালাপে এ কথা বলেন সবচেয়ে জনপ্রিয় এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহপ্রতিষ্ঠাতা ক্রিস হাগস। জাকারবার্গ নিজেই এই বিশাল জোয়ারেরই এক অংশ। এখন বড় বড় প্রযুক্তির লম্বা হানিমুন পালে উথাল-পাথাল হাওয়া লেগেছে। কয়েক বছর ধরে প্রযুক্তির বড় বড় দানবরা বাজারে আধিপত্য চর্চা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখনও এই খাতটির ওপর পুরোপুরি আস্থা আনতে পিছিয়ে রয়েছে। এমনকি তাদের বিরোধী পক্ষ ইউএস ফেডারেল ট্রেড কমিশন অ্যান্ড জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট এ বিষয়ে আরও বেশি উদাসীনতার মধ্যে রয়েছে। তাছাড়া এরা প্রযুক্তি জায়ান্টদের মধ্যে তদন্ত প্রতিযোগিতা কাজটি ভাগাভাগি করে নিয়েছে। ডিজিটাল মার্কেট নিয়ন্ত্রণ করতে ক্যালিব্রেটিং প্রতিযোগিতাও একটি কুশলী ব্যবসায় পরিণত হতে চলেছে। কিন্তু এখানে কিছু সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ভারতের জন্য অবারিত সুযোগ হাতছানি দিচ্ছে। কেননা তুলনামূলকভাবে ভারতের বেশিরভাগ জায়গায় এখনও রয়েছে অনুন্নত এলাকা।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচারক রবার্ট বার্ক ১৯৭৮ সালে দি অ্যান্টিট্রাস্ট প্যারাডক্স নামে একটি বই লেখেন। এখানে প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রণ প্রণালিকে তিনি নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছেন। তিনি অর্থনৈতিক সক্ষমতা নিয়েও যুক্তি আরোপ করেন। তিনি বলেন, নিয়ন্ত্রকদের উচিত প্রতিযোগিতাকে টিকিয়ে রাখা এবং ভোক্তাদের নিরাপত্তা দেওয়া। কিন্তু তিনি প্রতিযোগীদের নিরাপত্তা দেওয়ার কথাটি বলেননি। এখানে মূলত কোম্পানিগুলোকে অতিরিক্ত মুনাফা কুড়িয়ে নেওয়ার পথ রুদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু ভোক্তারা যাতে কম টাকায় পণ্য কিনতে পারে সেদিকে জোর দেওয়া হয়েছে। এটা একটি অন্তর্জ্ঞানমূলক ধারণা। এই ধারণাটিতে ছিল বাজার নিয়ন্ত্রণে দুর্বল ব্যবসায় অর্থনৈতিক তীব্রতা আনয়নের বাড়তি আকর্ষণ। বার্ক অবশ্য বহুমুখী বিচারব্যবস্থার দিকে গুরুত্বারোপ করেন। কিন্তু তিনি কেবল যুক্তরাষ্ট্রকে আমলে নেননি। ইউরোপীয় ইউনিয়নেরও এখানে একটি অপরিহার্যতা রয়েছে। বাজার একীভূতকরণের ধারণাও তিনি দিয়েছেন একদিক দিয়ে। কিন্তু ভোক্তা কল্যাণের মানদণ্ডটি দেশটির আইনে স্থির করা হয়েছে। তাদের আইনের মূল কথা হলো, প্রতিযোগিতা নীতির অনিবার্য উদ্দেশ্য হলো ভোক্তা কল্যাণকে বাড়িয়ে তোলা।
কিন্তু বাজার ব্যবস্থায় তা দেখা যায় না। ডিজিটাল মার্কেটে ভোক্তা কল্যাণের মানদণ্ডটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখানে দেখা যায়, গুগল সার্চ ইঞ্জিন কিংবা ফেসবুকের মতো ডিজিটাল পণ্য একেবারেই শূন্য মূল্যে বাজারজাত করা হচ্ছে। এই দুটি সাইট ব্যবহারকারীদের মুনাফা তাই বিশাল ও সুস্পষ্ট। আর মূল্যহীনতার কারণে এখানে কত সংখ্যক ব্যবহারকারী রয়েছে, তা গণনা করাই কষ্টকর। এটা অবশ্য প্রচলিত প্রতিযোগিতার ধারণাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তবে দামের বিষয়টিকে আমলে নিয়ে আইনের অধ্যাপক ড্যানিয়েল সলোভ ‘আর্কিটেকচারাল হার্মস’ বলে মন্তব্য করেছিলেন তা অবজ্ঞা করা হয়েছে। দীর্ঘ মেয়াদে তদারকহীন ভোক্তা কল্যাণে তারা অতিরঞ্জিত উপাত্ত পেশ করতে থাকে এবং মুক্ত পণ্য থেকে লাভ বের করে আনার দিকে নজর দিতে থাকে। ছোট কিন্তু ক্রমবর্ধমান বিচার ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এসব খরচকে স্বীকৃতি দিতে শুরু করেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ভারতের প্রতিযোগিতা কমিশন উল্লেখ করেছে ব্যক্তিগত উপাত্তের ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীদের একটি অপরিদর্শিত দাম পরিশোধ করতে হচ্ছে। আর এ ঘটনাটি ঘটছে যখন তারা কোনো অনলাইন প্ল্যাটফর্মে অবস্থান গ্রহণ করছে।
এখানে আরও কিছু ‘আর্কিটেকচারাল হার্মস’ রয়েছে। গত দশক ধরে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পাঁচটি প্রযুক্তি কোম্পানি বিশ্বব্যাপী ৪০০টিরও বেশি অধিগ্রহণ সম্পন্ন করেছে। এদের কেউই সংকটে আটকে যায়নি বরং কেউ কেউ তাদের সঙ্গে সংযুক্ত যাত্রাসঙ্গীও পেয়ে গেছে। এর ফলে যে প্রাগ্রসরতা সৃষ্টি হয়েছে, তা এক মাত্রায় অস্বাস্থ্যকর। প্রতিশ্রুত সূচনা আটকে যেতে পারে, তখন হিতে বিপরীত হওয়ার বিকল্প থাকবে না। বিপরীতক্রমে, এরা শহরের মধ্যেই পরিচালিত হয়। উদাহরণ হিসেবে আমাজানের নাম আসে যারা কুইদসির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। এই যৌথ কারবারের মধ্য দিয়েই মূলত যৌথ উদ্যোগের যাত্রা শুরু হয়। এখানে সত্যিকার প্রতিযোগিতা এমনভাবে দানা বাঁধল যে, একই এলাকার বেশিরভাগ অঞ্চলেই তারা আধিপত্য করতে থাকল। কিন্তু কারোরই কোনো একচেটিয়া আধিপত্য থাকল না। আবার এটাকে যৌথ আধিপত্যও বলা যায় না। এটাকে কার্যক্ষেত্রের সৃজনশীলতা বা উৎপাদনশীলতাও বলা যায় আবার এর মাধ্যমে নগর বিস্তারণও সম্ভব হয়। এই প্রতিযোগিতা ভোক্তাবান্ধব। কেননা, ভোক্তারা এখানে নিজের পছন্দমতো পণ্য ক্রয়ের সুযোগ পায়, অর্থাৎ যাচাই-বাছাই করে নিতে পারে। কেবল দামের ক্ষেত্রেই নয়, ভোক্তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয়টিও এখানে বিবেচ্য হয়ে পড়ে।
কিন্তু এ বাজারের নিয়ন্ত্রকরা এসব ইস্যুর সঙ্গে নিয়মিত লড়াই করে চলেছে। এমনকি তারা নতুন কিছু আবিষ্কারও করতে পেরেছে। এক্ষেত্রে জার্মানির বুন্ডেসকার্টেল্যামটের কথা চলে আসে। তারা ফেসবুকের ওপর শর্ত চাপিয়ে দিয়েছিল। ব্যবহারকারীরা ফেসবুক অ্যাকাউন্টে তথ্য দিতে কিছু নীতিমালা মেনে চলতে বাধ্য হতো। তার মূলত ফেসবুক কর্তৃপক্ষের কাছে একটি সম্মতিতে আসার দাবি জানিয়েছিল। প্রস্তাবনায় বলা হয়েছিল, কোনো ব্যবহারকারী যদি তার ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা না পায় বা কারো তথ্য যদি হারিয়ে যায় তবে তার দায়-দায়িত্ব এর ঊর্ধ্বতনরাই বহন করতে বাধ্য থাকবে। তখন এটাকে সোশ্যাল নেটওয়ার্কের মতো বিকল্প মাধ্যমের ত্রুটি বলেই গণ্য হবে। আর অন্য বিষয়গুলো কাছে থেকে তদন্ত করে দেখার খুব কমই প্রয়োজন পড়ে। আমাজানের মতো বিভিন্ন ই-কমার্স সাইটগুলো এখন বিক্রেতাদের প্ল্যাটফর্ম। এখানে বিভিন্ন বিক্রেতা তাদের পণ্যের তথ্য দিয়ে ব্যবসায় অংশ নেয়। দেখা যায়, বাইরের বিক্রেতারা আমাজানের নিজস্ব পণ্যের সঙ্গেই প্রতিযোগিতা করে থাকে।
বড় বড় বিক্রেতা আর ছোট ছোট বিক্রেতাদের এমন একক প্ল্যাটফর্ম মানেই হলো একে অন্যকে সহজেই টপকে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়া। অবশ্য প্রযুক্তি যে এখানে খুব বেশি প্রভাব বিস্তার করেছে তা বলা যাবে না। এ কথাটি হুগেজের বক্তব্যে পাওয়া যায়। তবে ডিজিটাল মার্কেটের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এবারের উবারের কথায় যদি আসি তবে দেখা যায়, বিভিন্ন ক্যাব বা গাড়িচালকরা এই প্ল্যাটফর্মে কাজ করার জন্য আকৃষ্ট হয়েছে। তাদের মধ্যে একটি অদৃশ্য নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠেছে। কেননা, উবারের জনপ্রিয়তা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এটা গুগলের সার্চ ইঞ্জিনের জন্য সম্ভব হয়েছে। আবার উবারের কারণে গুগলও বেশ সুবিধা লাভ করেছে। এখানে উভয় উভয়কে ফেলে দিতে পারছে না। গুগল এখানে অনেক বেশি সার্চ উপাত্ত ধারণ করতে পারছে। ফলে বাজারের ঐক্য এখানে অপরিহার্য এবং তা আরও ঘনীভূত হচ্ছে। তবে এটা মানতেই হবে যে, নিয়ন্ত্রণকারীরা প্রযুক্তি খাতের রাঘববোয়ালদের ওপর একটি কঠোর নজরদারি রাখতে পারত। যাতে করে এই প্রযুক্তি খাতের এই মহাকায়া দানবরা একের পর এক অধিগ্রহণের মাতলামি থেকে হয়তো বিরত থাকত। কিন্তু ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরে এসব উদ্যোগ এখন নিতে দেখা যাচ্ছে। ফলে এর সফলতা হবে অপ্রয়োজনীয়। এমনকি সাফল্যও আসবে দীর্ঘ কার্যক্রমের পরে। যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রকরা এটিঅ্যান্ডটি’র কার্যক্রম ভাঙতে চেষ্টা করেছে। আইবিএমও ১৩ বছর ধরে স্থির থাকে। তারপর এর বিরুদ্ধে যাবতীয় মামলা বাতিল হয়ে যায়। সব ধরনের প্রযুক্তি জায়ান্টদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযান কার্যকর হবে না। একেক ক্ষেত্রের পরিস্থিতি একেক রকম। অ্যাপল অনেক বড় বৃহৎকার কোম্পানি। এর রয়েছে একটি উল্লম্ব ঐক্য কাঠামো। আর ফেসবুক বিস্তার লাভ করেছে সমান্তরালে। আর অন্যদের কথায় যদি আসি তবে বলতে হবে তারা গাদাগাদি হয়ে একটি শক্তি অর্জন করেছে।
ভারত এখানে কিছু কিছু ক্ষেত্রে বেশ এগিয়ে এসেছে। সাম্প্রতিক কালে এসব প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রণ করার প্রতি আসক্তি এবং তার যথাযথ দলিল-প্রমাণ না থাকার মানে হলো, এখানে লড়াই বাধার ভালো একটি সুযোগ ও স্থান রয়েছে। এটা এমন সময়ে ঘটছে, যখন এই বিষয়গুলো দাঁত ভাঙা প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছে। একটি বহুমুখী প্ল্যাটফর্মে দাম-দর নির্ধারণ ঠিক কেমন হতে পারে? মনে রাখতে হবে এই প্ল্যাটফর্মের একটি বড় অংশ রয়েছে, একটি পক্ষের মালিকানাধীন আর অন্য পণ্যগুলো বিভিন্ন বিক্রেতার নির্ধারিত দামেই নির্ধারিত হয়। তারা এই মূল পক্ষের বা প্ল্যাটফর্মের খরচ বহন করে থাকে। পণ্য বাজারকে কীভাবে সংশ্লিষ্ট করা যায় এবং ডিজিটাল মার্কেটে বিভিন্ন প্রভাবের মাত্রা নিরূপণ কীভাবে করা যাবে সে প্রশ্নও থাকে। যদি তথ্যকে অভ্যন্তরীণ খরচ বলে বিবেচনা করা হয়ে থাকে তাহলে ব্যবহারকারীদের ফ্রি পণ্যে প্রবেশ করতেও খরচা করা লাগবে।
অবশ্য এসব টেক জায়ান্টরা যেভাবে বাজারকে অপব্যবহার করছে তা কেবল একটি লক্ষণ, কিন্তু কোনো সংকট নয়। সংকট হলো নিয়ন্ত্রণ কাঠামো। এই নিয়ন্ত্রণ কাঠামো এখন পর্যন্ত ডিজিটাল মার্কেটকে ধরতে পারেনি। এই সংকটটাকে চিহ্নিত করতে একটি মানদণ্ড প্রস্তুত করার প্রয়োজন পড়েছে। কেবল ভোঁতা শক্তি প্রয়োগ করে কাজ হবে না।

জুনিয়র ফেলো ও প্রধান
স্ট্র্যাটেজিক কমিউনিকেশন
আইডিএফসি ইনস্টিটিউট

হিন্দুস্তান টাইমস থেকে ভাষান্তর
মিজানুর রহমান শেলী

সর্বশেষ..



/* ]]> */