‘ডিজিটাল রেমিট্যান্সের দিকে এগোচ্ছে দেশ’

ব্যাংক হিসাব বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সরাসরি রেমিট্যান্স আনবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ডিজিটাল মানি ট্রান্সফার কোম্পানি ওয়ার্ল্ড রেমিট। লন্ডনভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠানটি সম্প্রতি ব্র্যাক ব্যাংক ও বিকাশের সঙ্গে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করেছে। এ লক্ষ্যে ঢাকায় এসেছেন ওয়ার্ল্ড রেমিটের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা (সিসিও) তামের এল-ইমারি। গতকাল শেয়ার বিজকে তিনি জানান, বাংলাদেশকে নিয়ে তাদের ব্যবসায়িক পরিকল্পনার কথা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শেখ শাফায়াত হোসেন।

শেয়ার বিজ: ব্যবসায়িক ক্ষেত্র হিসেবে বাংলাদেশকে বেছে নেওয়ার কারণ কী?

তামের এল-ইমারি: বাংলাদেশকে একটি আকর্ষণীয় বাজার বলে মনে করার অনেক কারণ রয়েছে। প্রথমত, এই দেশটিতে বছরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় দেড় হাজার কোটি ডলার রেমিট্যান্স আসছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য মতে, রেমিট্যান্স আহরণের দিক দিয়ে এ দেশটি নবম। বাংলাদেশের একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জনশক্তি বিদেশে কাজ করছে। প্রতি মাসেই নতুন নতুন জনশক্তি রফতানি হচ্ছে। স্বজনদের কাছে তারা টাকা পাঠাতে চায়। তাছাড়া এ দেশের প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের অর্ধেক এখনও ব্যাংকিং সেবার বাইরে রয়েছে। এদের ব্যাংকিং সেবার সঙ্গে যুক্ত করার দিকেও আমাদের মনোযোগ রয়েছে।’

শেয়ার বিজ: এদেশে তো বড় বড় মানি ট্রান্সফার কোম্পানি কাজ করছে। কী লক্ষ্য নিয়ে ওয়ার্ল্ড রেমিট বাংলাদেশে ব্যবসা সম্প্রসারণ করছে?

তামের এল-ইমারি: এখানে কিছু মানি ট্রান্সফার কোম্পানি কাজ করছে। কিন্তু তাদের বেশিরভাগই গতানুগতিক ধারার। ওয়ার্ল্ড রেমিট একটি অনলাইনভিত্তিক মানি ট্রান্সফার কোম্পানি। নগদ টাকার কারবার এখানে নেই। তাছাড়া আমরা তুলনামূলক সস্তায় ও স্বাচ্ছন্দ্যময়ভাবে প্রবাসীদের কষ্টার্জিত অর্থ দেশে পাঠাতে কাজ করছি। আর এটা সম্ভব হচ্ছে মোবাইল ফোনের অ্যাপ্লিকেশন (অ্যাপ) থাকার কারণে। এটা মূলত ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে সংযুক্ত করার একটি উদ্যোগ বলা যেতে পারে।

শেয়ার বিজ: ওয়ার্ল্ড রেমিট তুলনামূলক কতটা সস্তায় রেমিট্যান্স সেবা দেবে?

তামের এল-ইমারি: ‘আমাদের অ্যাপ ব্যবহার করে যে কেউ ঘরে বসেই তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা কার্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশে থাকা স্বজনদের ব্যাংক হিসাব বা মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবে অনলাইনে রেমিট্যান্স পাঠাতে পারবে। এতে দ্রুত সময়ের মধ্যে স্বজনরা টাকা পেয়ে যাবে। তবে প্রশ্ন হলো, টাকাটা বাংলাদেশে থাকা স্বজনরা কীভাবে নগদায়ন করবে। এখানে অনেকগুলো ভিন্ন ভিন্ন উপায় আমরা রেখেছি। এখানকার কোনো ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে টাকা জমা হওয়ার পর গ্রাহক সেই টাকা কার্ডের মাধ্যমে তুলে নিতে পারবে। আবার এদেশের মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টগুলো থেকেও যেভাবে টাকা তোলা যায় বা কেনাকাটার বিল পরিশোধ করা যায়, সে উপায়ও আমরা রাখছি। ওয়ার্ল্ড রেমিটের মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচ পড়ে গড়ে দেড় শতাংশ। যেখানে অন্যান্য গতানুগতিক ধারার মানিট্রান্সফারগুলোর মাধ্যমে করলে খরচ পড়ে পাঁচ দশমিক ২০ শতাংশ। এতে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স বাড়বে, অবৈধ চ্যানেল (হুন্ডি) নিরুৎসাহিত হবে।

শেয়ার বিজ: এদেশে ব্যবসার ক্ষেত্রে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে মনে করেন?

তামের এল-ইমারি: আমরা এখনই সব ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে রেমিট্যান্স আনতে পারছি না। এমনকি সব দেশ থেকেও আনতে পারছি না। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে আমরা এখনও রেমিট্যান্স বাংলাদেশে আনার অনুমোদন পাইনি। এটা বড় চ্যালেঞ্জ। তবে আশা করছি, আগামী ছয় থেকে ১২ মাসের মধ্যে এ অনুমোদন আমরা পেয়ে যাব। এখন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইতালিসহ অনেক দেশ থেকেই আনছি।
এখানে বড় আরেকটি চ্যালেঞ্জ হলো, মানুষকে আমাদের সেবা সম্পর্কে জানানো। এজন্য আমরা গুগল, ফেসবুকসহ সব ধরনের সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং এবং গণমাধ্যমের সহযোগিতা নিচ্ছি। বাংলাদেশ ডিজিটাল অর্থনীতির দিকে অনেক দূর এগিয়েছে। আশা করছি, অর্থনীতির গতি-প্রকৃতির দিকে নজর রেখে আমরা একসময় এই দেশে রেমিট্যান্স আনায় নেতৃত্ব দেব। এজন্য আমাদের সঠিক পার্টনার এবং সঠিক প্রযুক্তি বেছে নিতে হবে।

শেয়ার বিজ: বাংলাদেশে বাজার ধরার জন্য আপনারা কী করছেন?

তামের এল-ইমারি: ‘আমরা প্রথমেই একটি বড় বাণিজ্যিক ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি করেছি। তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিকাশ এদেশের নেতৃস্থানীয় মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান। তাদের প্রায় তিন কোটি মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব রয়েছে। ওই ব্যাংকটির মাধ্যমেও আমরা অতিরিক্ত ১৫ লাখ ব্যাংক হিসাব পাচ্ছি। আমরা ভবিষ্যতে এমন আরও বড় বড় ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস) প্রোভাইডারদের সঙ্গে চুক্তি করার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছি।’

শেয়ার বিজ: এই সেবার নিরাপত্তায় আপনারা কী ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছেন?

তামের এল-ইমারি: আমরা সাধারণ মানুষের অর্থ নিয়ে কাজ করি। এখানে কমপ্লায়েন্স নিয়ে সবসময় সতর্ক থাকতে হয়। নগদ লেনদেন থেকে সরে এসে ডিজিটাল লেনদেনে গ্রাহকদের অভ্যস্ত করানোটাও কঠিন। এর মধ্যে অনলাইনে তাদের তথ্যের (কেওয়াইসি) সত্যতা নিশ্চিত করার ঝুঁকি রয়েছে। আর্থিক লেনদেনের নিরাপত্তার প্রশ্নে আমরা নতুন নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করছি এবং এর মাধ্যমে আর্থিক লেনদেনগুলোকে কঠোরভাবে তদারক করছি।
তাছাড়া ওয়ার্ল্ড রেমিটের বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ফেসবুকের মতো বড় বড় প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ রয়েছে। তারা জানে কীভাবে ছোট প্রতিষ্ঠানকে বড় করে গড়ে তুলতে হয়। তারা আমাদের প্রতিনিয়ত নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছে।