ডিভিডেন্ড

মিজানুর রহমান শেলী: ১১০ শতাংশ বুক ভ্যালু দরে আমাদের শেয়ার কেনার সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। কেননা, তখন আমরা অল্প কয়েকদিনের ব্যবধানে বাজারে অবস্থান করে অনেক বেশি টাকার শেয়ার কিনতে সক্ষম হয়েছিলাম। কার্যত, সেই দিনগুলোয় আমরা শেয়ার কেনার ক্ষেত্রে দামের বিষয়টিকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলাম। এমনকি আমরা বাজারে নামার আগে নিজেদের একটি গণ্ডি নির্ধারণ করে নিয়েছিলাম। ফলে ওই গণ্ডির বাইরে গিয়ে আমরা কিছুই খরিদ করিনি। এ সময় শেয়ারের দামের পাশাপাশি শেয়ারের বিষয় নিয়ে গুরুত্বারোপের বিষয়টিও আমাদের কাছে পরামর্শ আকারে এসেছিল। যাহোক আপনাদের জানা উচিত যে, আমরা কখনোই স্টককে উঠে দাঁড়ানোর জন্য সহায়ক কিছু ব্যবহার করি না। বরং স্টককে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা করে থাকি। আর যদি আমরা সত্যিই এটা করে থাকতাম, তবে আমাদের স্টকগুলো দুর্বল বাজারে নিজেদের মেলে ধরতে পারত না। আকর্ষণীয় হতো না। সবার কাছে একটি মলিন স্টক বলে ধরা দিত। আর এসব দুর্বল বাজারে তখন আমাদের নিলামের আহ্বান একটি মলিন সুরের মতোই বেজে উঠত বারবার। সেটা নিশ্চয় আমাদের জন্য সম্মানের বিষয় হতো না। আবার যদি আমাদের ক্যাশ-ইকুইভেলেন্ট হোলডিংস হয় ২০ বিলিয়ন ডলারের নিচে, তবে আমরা সেই শেয়ার অবশ্যই কিনি না। কিনব না। বার্কশায়ার কখনও কোনো সময় আর্থিক শক্তিমত্তাকে আপস করেনি। করবেও না কখনও। এ বিষয়ে কেউ কোনো প্রশ্ন রাখতে পারে না। এটা প্রশ্নের ঊর্ধ্বে এবং সবার ক্ষেত্রেই একই নীতি কার্যকর হয়।
পুনরাই খরিদকরণের আলোচনায় আমার প্রতি পরোক্ষভাবে হলেও একটা সুযোগ গ্রহণের প্রস্তাব থাকে। এটা হলো স্টকের দাম পরিবর্তন করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে কিছু কিছু বিনিয়োগকারীর অযৌক্তিক প্রতিক্রিয়াকে চিহ্নিত করা। আমি এই সুযোগটা কাজে লাগাতে ভুল করলে মস্ত বড় ভুল করব। যাহোক, মনে রাখা উচিত যখন বার্কশায়ার কোনো কোম্পানির শেয়ার কোম্পানির কাছেই পুনরাই বিক্রি করে, তখন সেটা পুুনরাই খরিদকরণের প্রয়োজনেই করে। এক্ষেত্রে বার্কশায়ারের নির্দিষ্ট চাহিদা থাকে। কার্যত বার্কশায়ার দুটি ইভেন্টকে সামনে রেখে এ কাজটি করে থাকে। একটি হলো, আমরা বড় কোনো আকাক্সক্ষা রেখে চলি না। আমাদের আশাটি ছোট। এই ক্ষুদ্র আশার মধ্যেই আমরা চাই আমাদের ব্যবসার আয়-উপার্জন নিয়ত বৃদ্ধি হতে থাক। আর এই বৃদ্ধির মাত্রাটিকে নিয়ে আমরা আকাশ-কুসুম চিন্তা করি না। বরং স্বাভাবিকের মধ্যে থেকে তা যেন হয় একটি উত্তম পরিমাণের। আর এই প্রবৃদ্ধির হারটা যেন দীর্ঘদিন অবধি চলমান থাকে। দ্বিতীয়ত, আমরা যেটা আশা করি তা হলো এই স্টক দীর্ঘদিন ধরে বাজারে একটি নিম্ন পারফরম্যান্স ধরে রাখে। আমাদের এই দ্বিতীয় অনুসিদ্ধান্তের ব্যাপারে কিছু কথা থেকে যেতে পারে। এটা আসলে ‘আমাদের বই নিয়ে কথন’। এই কথনটি হলো, সেই স্টক নিয়ে যে স্টকের মালিক আমরা নিজেরাই। তাহলে নিজেদের স্টকের পারফরম্যান্স বাজারে দীর্ঘদিন নিচুতর থাকুক এই আশা রাখা নিশ্চয় খুব বেশি অন্যায় হতে পারে না। কেননা আমরা অন্যদের স্টক নিয়ে মন্দ আকাক্সক্ষা নিশ্চয় করছি না। তবে হ্যাঁ, আমাাদের নিজেদের স্টকের মন্দা চললে সেটা আমাদের জন্য কার্যকরী ভবিষ্যৎ বয়ে নিয়ে আসবে বলে আমরা মনে করি। কার্যত এটা তো বার্কশায়ারের জন্যই দীর্ঘদিনের মন্দাভাব বজায় থাকার দশা। তাহলে কেন সমালোচকরা এটা নিয়ে উচ্চ-বাচ্চ করতে পারে। আসলে তারা এ ব্যাপারটি নিয়ে কোনোই উচ্চবাচ্চ করতে পারে না।
এবার আইবিএম নিয়ে কিছু কথা বলা যাক। আইবিএম এ ক্ষেত্রে একটি ভালো উদাহরণ হতে পারে। সব ব্যবসায় পর্যবেক্ষকরাই এ বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা রাখে: লও জার্সৎনার ও স্যাম পামিসানো দুই বিখ্যাত সিইও। তারা গত বিশ বছর আগে ঘটে যাওয়া কুখ্যাত ব্যাংক দেওয়ালিয়া হওয়ার ঘটনায় চমৎকার কিছু কাজ করেছিলেন। সে সময়ে তাদের পরিচালনা কার্যক্রম ছিল সত্যিকার অর্থেই অসাধারণ, অনন্য।
আবার তাদের আর্থিক ব্যবস্থাপনাও ছিল একইভাবে অতি উত্তম। বিশেষ করে এই কার্যক্রমের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ওইসব কোম্পানির সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব হয়েছে। তাদের আর্থিক কাঠিন্য একেবারেই কমে এসেছে এবং একটি উত্তম পরিস্থিতি তারা পৌঁছে গিয়েছে। এমনকি আমি হলফ করে বলতে পারি এই আমেরিকায় আরও অনেক বড় বড় কোম্পানি রয়েছে; যাদের নাম, যশ ও যোগ্যতা সুউচ্চ। তবুও বলতে হয়, ওই দুই কোম্পানির আর্থিক পারফরম্যান্স সাম্প্রতিক সময় অন্যসব বড় বড় নামকরা কোম্পানির চেয়ে অনেক বেশি ভালো। এটি একটি নৈপুণ্যতা, এটা দিনে দিনে বেড়েছে। এই অর্জনটা আবার কার্যত আইবিএমের শেয়ারহোল্ডাররাই ভোগ করছে। কোম্পানি দুটি তাদের ঋণ খুব চৌকষতার সঙ্গে সতর্ক দৃষ্টি রেখে ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছে। আবার ক্যাশের বিনিময়ে তাদের মূল্য-সংযোজন অধিগ্রহণও করেছে বেশ চমৎকারভাবে। একই সঙ্গে কোনো পিছুটান না রেখে, কোনো দ্বিধা ছাড়াই পুরোপুরি আত্ম-প্রত্যয়ের সঙ্গে তারা এ কোম্পানির যাবতীয় স্টকের পুনরাই খরিদকরণও সম্পন্ন করেছে।
আজকে আইবিএমের দশা অতুলনীয়। তারা এখন এক হাজার ১৬ বিলিয়ন শেয়ারের অধিকারী। এর মধ্যে আমাদের রয়েছে ৬৩ দশমিক তিন মিলিয়ন, যা মোটের ওপর পাঁচ দশমিক পাঁচ শতাংশ। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সামনের পাঁচ বছরে কী ঘটবে। সামনের পাঁচ বছরে খুব স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় কোম্পানিগুলোর আয়-উপার্জনের ভাগ্যে কী লেখা আছে, সেটা নিয়ে আমাদের অবশ্যই ভাবতে হবে। এটা নিয়ে ভাবার ক্ষেত্রে আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায় রয়েছে। এই ভাবনার পেছনে নিশ্চয় কিছু কারণ রয়ে যায়। কেননা কোম্পানিগুলো আগামী পাঁচ বছরে নিশ্চয় ৫০ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ বা তার চেয়ে বেশি পরিমাণ ডলার পুনরাই শেয়ার খরিদকরণের কাজে ব্যয় করবে। এখন বার্কশায়ারের জন্যই সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয়। এমনকি বার্কশায়ার যদি চিন্তা নাও করে থাকে, তবে অন্যদের জন্য এটা একটি কুইজ হয়ে দাঁড়াবে যে বার্কশায়ার সামনের পাঁচ বছরে কী করতে পারে? আসলে বার্কশায়ারের মতো দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের জন্য সামনের পাঁচ বছর নিশ্চয় অনিশ্চিত এবং নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সময়।
আমি অবশ্য এই কুইজে আগে থেকেই কোনো ইঙ্গিত দিয়ে আপনাদের সাহায্য করতে চাই না। এক্ষেত্রে নিশ্চয় আপনাদের নিজেদেরই ভাবতে হবে। আর আমি কেবল সেই সুযোগটাই করে দিচ্ছি। আমরা শুধু আশা করব আইবিএমের স্টকের দাম যেন সামনের পাঁচ বছর ধরে দুর্বল হতে থাকে।

এবার চলুন আমরা অংক কষতে বসি। যদি আইবিএমের স্টক দর গড়পড়তায় চলে আসে: আনুমানিক ২০০ ডলার এই সময়ের মধ্যে। তবে কোম্পানিটি ২৫০ মিলিয়ন শেয়ার ৫০ বিলিয়ন ডলার দিয়ে দ্রুত অধিগ্রহণ করে নেবে। এর ধারাবাহিকতায় ৯১০ মিলিয়ন শেয়ার অতি চমৎকার স্থানে পৌঁছে যাবে। আর তখনই আমরা এ কোম্পানির সাত শতাংশ কিনে নেব। যদি বিপরীতক্রমে এই স্টকগুলো গড়ে ৩০০ ডলার করে বিক্রি হয় ওই পাঁচ বছর মেয়াদকালে, তখন আইবিএম কেবল ১৬৭ মিলিয়ন শেয়ার খরিদ করবে। তাতে করে পাঁচ বছর পরে ৯৯০টি শেয়ার দৃঢ়তর অবস্থানে পৌঁছাতে সক্ষম হবে। আর আমরা তখন ওই কোম্পানির মোটের ওপর ছয় দশমিক পাঁচ শতাংশ অধিকার করব।

এই দর্শন রচনাবলি সম্পাদনা করেছেন লরেন্স এ. কানিংহ্যাম।
অনুবাদক: গবেষক, শেয়ার বিজ।