ডিভিডেন্ড

মিজানুর রহমান শেলী: আগামী পাঁচ বছরের হিসাব-নিকাশে কোম্পানিগুলোর পরিস্থিতি কেমন হবে, সে হিসাব কার্যত সবাইকেই কষতে হবে। কিন্তু যারা স্বল্প মেয়াদে বিনিয়োগ করে থাকে, সেসব কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান বা কোনো ব্যক্তি বিনিয়োগকারীর ভাবনার বিষয়টি খুব বেশি প্রকট হয় না। কেননা, পাঁচ বছরের এ সময়টি খুবই স্বল্প-বিস্তর। এটি বেশি বড় সময়ের ব্যবধান নয়। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের জন্য এই সময়কালটি তেমন কোনো ইস্যু হয়ে দাঁড়ায় না। তবে ছোট ছোট সময়-কাঠামোর মুখোমুখি হতে গেলে একটু বেশিই চিন্তা করতে হয়। এ সময় ধৈর্য আর আবেগ খুব দ্বান্দ্বিকতা সৃষ্টি করে। তাই যারা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে রয়েছেন তাদের জন্য ভাবনাটি গুরুতর। হেলাফেলায় বিষয়টিকে হারিয়ে ফেললে চলে না। বার্কশায়ার এখানে নিশ্চয়ই সেই বড় ভাবনার মধ্যেই রয়েছে। কার্যত তারা আগামী পাঁচ বছরে কীভাবে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে চলেছে এটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এখানে আইবিএমের সঙ্গে হিসাব-নিকাশের বিষয়টিও নিশ্চয়ই বার্কশায়ারের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আইবিএমের সিদ্ধান্তের ওপর বার্কশায়ারের সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে। তবে বার্কশায়ার অবশ্য নিজের ভাবনাকে আইবিএমের ভাবনার হাতে তুলে দেবে না। আমরা এ বিষয়টি নিয়ে পরিষ্কার ধারণা নিয়ে চলছি। আমরা কেবল আনুমানের ওপর ভর করে চলছি না। বরং ব্যবহারিক পর্যায় থেকেই আমরা অঙ্ক কষছি। বস্তুত এ বিষয়ে একটি গাণিতিক ও যৌক্তিক সিদ্ধান্তে সিদ্ধহস্তে পৌঁছাতে চেয়েছি।
এবার আমরা সেই গাণিতিক যুক্তি নিয়ে খানিক আলাপচারিতা করে নিতে পারি। অবশ্য এটি খুব সংক্ষেপিত। বিস্তৃত আলোচনা নয়। যদি আইবিএম আগামী পঞ্চম বছরে আনুমানিক ২০ বিলিয়ন ডলার আয় করে থাকে, তবে আমাদের শেয়ার সে বছরে তাদের আয় প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গেই বাড়তে থাকবে। দেখা যাবে, ২০ বিলিয়ন ডলার তারা আয় করলে আমাদের শেয়ার পুরোপুরি ১০০ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। এমনকি এর চেয়ে বেশিও হতে পারে। অথচ এ সময়ে নিম্নতর স্টক দরগুলোর বাজার খুবই হতাশার মধ্যে দিন কাটাবে। এমনকি বার্কশায়ারের এই প্রবৃদ্ধি তখন অন্যান্য নিচু স্টকের সর্বোচ্চ উচ্চ দরে পৌঁছানোর চেয়েও বেশি কিছু। এর কিছুদিন পরই আমাদের শেয়ার সম্ভবত আরও এক দশমিক পাঁচ বিলিয়ন ডলারের মূল্যমানে পৌঁছে যাবে, যদি কিনা উচ্চ দর পুনঃখরিদকরণের বিষয়টি ঠিকঠাক জায়গা করে নিতে পারে।
এ যুক্তিটি সাদামাটা। জটিলতার বাইরে গিয়ে সরল ভাষায় বলা যেতে পারে। যদি আপনি ভবিষ্যতে স্টকের একজন খাঁটি ক্রেতা হতে চান, আর সেক্ষেত্রে আপনি সরাসরি নিজের অর্থে স্টক খরিদ করতে পারেন অথবা পরোক্ষভাবে অন্য কারও অর্থে (কোনো একটি কোম্পানির মালিকানা শর্তে, যে কোম্পানি শেয়ারকে পুনরায় খরিদ করছে), তবে আপনি এক সময় নিশ্চিত আহত হবেন। আপনার হৃদয় ভেঙে যাবে যখন স্টকের দাম হুহু করে বেড়ে যাবে। আবার আপনি তখনই লাভবান হবেন যখন দেখবেন স্টকের দাম দমে গেছে। যাহোক, আমার দীর্ঘদিনের বিনিয়োগী অভিজ্ঞতার জায়গা থেকে বলতে চাই আবেগের বিষয় নিয়ে। মাঝে মাঝেই দেখা যায় অনেক বিনিয়োগকারী, মালিক বা ব্যবস্থাপক, এমনকি যে কেউই আবেগের বেড়াজালে আটকে পড়ে। মনে রাখতে হবে, আবেগ যে কোনো মুহূর্তে যে কোনো পরিস্থিতিকে অনেক বেশি জটিল করে ফেলতে পারে। বেশিরভাগ লোকই, এমনকি যারা আগামী দিনে একজন বিশুদ্ধ মানের স্টক ক্রেতা হতে চলেছেন, তিনিও খুব আরাম বা সুখানুভূতিতে ডুবে যান যখন দেখেন স্টকের দাম অগ্রসর হচ্ছে। এই স্টক ক্রেতাকে একজন গ্যাসচালিত পরিবহন সংস্থার গাড়ির যাত্রীর সঙ্গে তুলনা করা যায়। দেখা যায়, কখনও কখনও এ রকম পরিবহন সংস্থার যাত্রী গাড়িতে চড়ে খুব খুশি খুশি ভাব নিয়ে আছে। অথচ সে একটু আগেই জেনেছে যে, গ্যাসের দাম বেড়ে গেছে। এর কারণ, ওই গাড়িতে এখনও এক দিনের গ্যাস মজুত রয়েছে। ফলে তার পরিবহন খরচ হয়তো এখনই বাড়বে না। কিন্তু লোকটি এখনও ভাবতে পারছে না, একদিন পরই তাকে গাড়িতে চড়তে গেলে এই বাড়তি দামের প্রভাবে অতিরিক্ত ভাড়া পরিশোধ করেই গাড়িতে চড়তে হবে।
চার্লি আর আমি অবশ্য কারও চিন্তার জায়গায় নিজেদের খবরদারি চালাতে চাই না। আমরা কেউই আমাদের চিন্তা দিয়ে আপনাদের মতো বহু মানুষকে জয় করতে চাই না। আমরা আমাদের এ জীবনে বহু মানুষের আচার-আচরণ পর্যবেক্ষণ করেছি। মানুষ কখনও কখনও এমন আচরণ করে যে, সে যেন নিষ্ফলা জীবনের রহস্যের পেছনেই ছুটে চলে। আমরা দুজন তাদের এই প্রবণতাকে জোর করে বাধা দিতে পারি না। তবে আমাদের নিজস্ব হিসাব-নিকাশ ও বোঝাপড়ার জায়গা থেকে তাদের কিছু পরামর্শ দিতে পারি। আমরা চাই তারা সতর্ক হোক। আমি নিজেও যে এর বাইরে তা নয়। মানুষ হিসেবে আমারও সাধারণ দুর্বলতা রয়েছে অন্যদের মতো। আমিও আমার জীবনের প্রথমদিকে এসব দুর্বলতার শিকার হয়েছি এবং শিখেছি। তারপর ধীরে ধীরে নিজের সীমাবদ্ধতাকে কাটিয়ে উঠতে পেরেছি। যাহোক, এখানে আমি আমার প্রথম জীবনের একটি দুর্বলতার কথা উল্লেখ করতে চাই। তখন একবার আমি খুব উল্লসিত হয়েছিলাম। কেবল এ জন্য যে, বাজার বেড়ে গেছে। তারপর আমি বেন গ্রাহামের ইন্টেলিজেন্ট বইটি হাতে নিলাম। সেখান থেকে আট নম্বর অধ্যায়টি পড়তে থাকলাম। সেখানে বিশদভাবে আলোচনা করা হয়েছে যে, যখন স্টক ওঠানামা করে, তখন একজন বিনিয়োগকারী এ দশাকে কোন দৃষ্টিতে দেখবে। এখানে আবেগের কোনো জায়গা আছে কিনা কিংবা বাজার ওঠানামা অথবা উঠলে বা নামলে নিজের অনুভূতিকে কোন দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া উচিত সেটি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। অধ্যায়ের এসব পড়তে যতই আমার চোখ সামনে এগিয়ে চলতে থাকল, ততই যেন আমি নতুন কিছু দেখতে থাকলাম। আমার দৃষ্টিভঙ্গি ধীরে ধীরে পরিবর্তন হতে থাকল। নিজের চোখকেই যেন আর চিনতে পারছিলাম না। আমার চোখ পরিবর্তন হয়ে যেতে থাকল আর আমি ইন্টেলিজেন্ট ইনভেস্টরের অষ্টম অধ্যায় ধরে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকলাম। এরপর থেকেই নি¤œদর আমার বন্ধু হয়ে গেল। নিচুদরকে আমার আকাক্সক্ষায় জায়গা দিতে শুরু করলাম। আমি বলব, এ বইটি হাতে তুলে নেওয়াই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে সৌভাগ্যের মুহূর্ত।
সব শেষে বলতে চাই, আমরা আইবিএমে বিনিয়োগ করেছি। আমরা এ বিনিয়োগ থেকে তার ভবিষ্যৎ আয়ের মধ্য দিয়ে প্রাথমিকভাবে সফল হব বলে বিশ্বাস করি। কিন্তু মাধ্যমিক পর্যায়ে একটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হয়ে দাঁড়াবে। আর সেটা হলো কোম্পানি কতসংখ্যক শেয়ার বিপুল পরিমাণ অর্থ দিয়ে খরিদ করছে, তার হিসাব-নিকাশ। সম্ভবত এ বিষয়টিই শেষ পর্যন্ত এই সামগ্রিক কর্মকাণ্ডে বিসর্জন দিতে হতে পারে। আর যদি পুনরায় খরিদকরণ কখনও আইবিএম শেয়ারকে কমিয়ে আনতে পারে এবং ৬৩.৯ মিলিয়ন শেয়ার উৎকৃষ্ট শেয়ারে পরিণত হয়, তবে আমি আমার সারা জীবনের অর্জিত সাফল্য আর খ্যাতিকে বিসর্জন দেব এবং বার্কশায়ারের প্রত্যেক কর্মীকে একদিনের পরিশোধিত ছুটি ঘোষণা করব।

এই দর্শন রচনাবলি সম্পাদনা করেছেন লরেন্স এ. কানিংহ্যাম
অনুবাদক: গবেষক, শেয়ার বিজ