ডেরিভেটিভস

মিজানুর রহমান শেলী: কোম্পানি যখন ডেরিভেটিভসের দাবিদাওয়া মানতে যায়, তখনই কোম্পানির যাবতীয় ক্যাশ লিকুইডিটি সংকটে পড়ে যায়। তখন দেখা যায় ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। প্রথমে কোম্পানির বাণিজ্যিক প্রতিকূলতা, সে মুহূর্তে ডেরিভেটিভসের দাবি পূরণে মরণ লড়াই; ঠিক তখনই আবার কোম্পানির অধোগতি লাফিয়ে লাফিয়ে ত্বরান্বিত হতে থাকে। এই পুরো প্রক্রিয়া যেন একটি প্যাঁচে প্যাঁচে বাঁধা সুই-সুতার সেলাই, প্রক্রিয়াটি একবার শুরু হয়ে গেলে তা আর থামানো যায় না সহজে। ফলে করপোরেটটি গলন প্রক্রিয়া অতি দ্রুত নিঃশেষ হতে থাকে।
ডেরিভেটিভস ডেইজি চেইন ঝুঁকি তৈরি করে। এটা এক ধরনের দুষ্টুচক্র। এই ঝুঁকিগুলো বিমা বা পুনর্বিমা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়। ফলে তাদের ব্যবসায় প্রায় হোঁচট খেয়ে পড়ে অন্যদের ওপর। এ উভয় ক্ষেত্রেই বিপরীত পক্ষের কাছ বিপুল পরিমাণ উত্তোলনযোগ্য অর্থ ওভারটাইমে পড়ে যায়। তখন একজন অংশগ্রহণকারী নিজেকে খুব দূরদর্শী বলে মনে করতে থাকেন। এমনকি তিনি বিশ্বাস করতে থাকেন তার বিপুল অঙ্কের ক্রেডিট বৈচিত্র্যতা লাভ করছে। ফলে সামনে আর কোনো সমস্যা নেই। এ বিশেষ পরিস্থিতিতে যদিও বহিরাগত বিভিন্ন ইভেন্ট উদয় হতে থাকে যা কোম্পানি ‘এ’র কাছ থেকে খারাপ উদ্দেশ্যে পাওনাদার, তবুও তা ‘গ’র ভেতর দিয়ে ‘খ’কে প্রভাবিত করতে থাকে। ইতিহাস থেকে আমরা শিক্ষা নিয়ে থাকি: ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দিয়েছে সংকট মাঝে মাঝে এমন সমস্যা তৈরি করে, যা শোচনীয় সময়গুলোতে না দেখা স্বপ্নগুলোকে একটি নির্দিষ্ট ভঙ্গিমায় সাদৃশ্যপূর্ণ করে তোলে।
ব্যাংক ব্যবস্থায় ‘লিংকেজ’ সমস্যার স্বীকৃতিই ছিল ফেডারেল রিজার্ভ ব্যবস্থা চালু করার অনেকগুলো কারণের মধ্যে একটি। ফেডারেল রিজার্ভ চালু হওয়ার আগে দুর্বল ব্যাংকের ব্যর্থতা কখনও কখনও হঠাৎ ও অসমর্থিত লিকুইডিটি চাহিদা অন্য বড় ও সফল কোনো ব্যাংকের ওপর চাপিয়ে দিত। এর ফলে এই ব্যাংকগুলোও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতো। এসব সংকট থেকে শক্তিশালী ব্যাংকগুলোকে প্রতিরক্ষা দেওয়ার জন্য ফেডারেল রিজার্ভ এখন সদা প্রস্তুত। তারা এই দুর্বল ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে সফল ব্যাংকগুলোকে নিয়ত সুরক্ষা দিয়ে চলেছে। কিন্তু এখন অবধি এমন কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংককে দেখা গেল না যারা বিমা ও ডেরিভেটিভসের কুপ্রভাব থেকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য কোনো দায়িত্বশীল কাজ গ্রহণ করেছে। ফলে ডমিনো টপলিংয়ের সংকটকে কোনোভাবেই কাটানো সম্ভব হচ্ছে না। এসব ইন্ডাস্ট্রি ও ফার্মের মধ্যে যেগুলো বেশ মৌলিকত্ব ধরে রাখে, তারা খুব সাধারণভাবেই অন্যান্য ইন্ডাস্ট্রি বা ফার্মের শোচনীয় পরিস্থিতির চক্রাকার প্রভাবে প্রভাবান্বিত হয়ে পড়ে। আসলে এটা এমন এক বস্তু সংস্থানিকচক্র, যাতে একটি ইন্ডাস্ট্রি বা ফার্ম বিপদগ্রস্ত হলে তার প্রভাব অন্যদের ওপরও পড়ে যায়।
হ্যাঁ, এই ডেরিভেটিভসের পক্ষে যে কোনো কথা নেই, কেউ যে এর শুভাকাক্সক্ষী নয়Ñতা বলা যায় না। অনেকেই এই ডেরিভেটিভসের সুফল খুঁজে বের করেছেন। তাদের মতে, ডেরিভেটিভস অনেক ব্যবস্থাতান্ত্রিক সমস্যা সমাধান করে দেয়। সাধারণত কিছু অংশীদার আছেন, যারা বিশেষ কিছু ঝুঁকি বহন করতে পারেন না। ফলে তারা সেই ঝুঁকি পরিবহনের জন্য ডেরিভেটিভসকে ব্যবহার করে থাকেন। তারা খুব সহজেই এই ঝুঁকি কোনো শক্তিশালী হাতে হস্তান্তর করে দিতে পারেন। তারা মনে করেন, ডেরিভেটিভস হলো বৈদ্যুতিক সংকট মিটমাট করতে রেফ্রিজারেটরে যেমন স্ট্যাবিলাইজার ব্যবহার করে ঝুঁকিমুক্ত থাকা যায়, ঠিক তেমনি এই ডেরিভেটিভস ব্যবহার করেও অর্থনৈতিক ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকা যায়। তারা আরও বিশ্বাস করেন যে, এই ডেরিভেটিভস বাণিজ্যকে সুবিধা দিয়ে থাকে এবং ব্যক্তি অংশীদারদের নানান বাধাবিপত্তি থেকে সুরক্ষা দিয়ে থাকে।
হ্যাঁ, এসব ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পর্যায় থেকে চিন্তা করলে যে কেউ এই ডেরিভেটিভসের মধ্যে ভালো কিছু খুঁজে পাবেনÑএটা অস্বীকার করা যায় না। তাই এদের কথা কখনও কখনও সত্য বা সঠিক হয়। এ বিষয়টিকে আমিও আমার ব্যবসায় কৌশলে কাজে লাগিয়ে থাকি। কখনও কখনও বার্কশায়ারে আমি বড় মাপের ডেরিভেটিভস লেনদেনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ি, তখন দেখা যায় আমার বিনিয়োগী কৌশল বেশ সুবিধা পেয়ে যাচ্ছে।
যাহোক, চার্লি আর আমি আরও বেশি গভীরে চিন্তা করে থাকি। চার্লি আর আমি যদিও এই ডেরিভেটিভসের সুবিধা মাঝে মাঝে নিয়ে থাকি, তবুও বিশ্বাস করি এটা ক্ষুদ্র পর্যায়ে কিছু সুবিধা দিয়ে থাকলেও বৃহৎ পর্যায়ে তা খুব বিপজ্জনক এবং এ বিপদের মাত্রা দিনে দিনে বেড়ে চলেছে। এমনকি এটি চলতে থাকলে অনেক ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। অনেক বড় অঙ্কের ঝুঁকির কথায় যদি আসি, তবে প্রথমেই বলতে হয় ক্রেডিট ঝুঁকির কথা। এই বিশাল ঝুঁকি বিশেষ করে কিছু ডেরিভেটিভস ডিলারের হাতে পূঞ্জীভূত হয়ে পড়েছে। এই ডিলাররা একে অন্যের সঙ্গে অনেক বড় ব্যবসা করে থাকে। ফলে একটি চক্রাকার পরিস্থিতি গঠিত হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে যে কেউ যে কোনো সময় খুব বড় সংকটের মধ্যে নিপতিত হয়। এসবের বাইরে এই ডিলাররা অনেক বড় অঙ্কের ঋণের বোঝা নিয়ে চলে। এরা এসব ঋণ গ্রহণ করে তাদের নন-ডিলার ব্যবসায় বিপক্ষের কাছ থেকে। আমি আগেই বলেছি, এরা একটি চক্রাকার পরিস্থিতি গঠন করে, ঠিক সেভাবেই এই ডিলাররা যখন কোনো সংকট তৈরি করে বা কোনো সংকটে পড়ে, তখন ওই ঋণদাতা নন-ডিলাররাও সে সংকটের প্রভাবে প্রভাবান্বিত হয়ে থাকে। সাধারণত কোনো কোনো ছোট ঘটনাকে কেন্দ্র করেও এই সংকট তৈরি হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, টেলিকম ইন্ডাস্ট্রির ইমপ্লোশন কিংবা মার্চেন্ট পাওয়ার প্রকল্পের আওতাধীন যদি ভ্যালু প্রিসিপিটিশন ঘটে থাকে, তবে এসব ঘটনা ঘটতে পারে। এবার লিংকেজের কথায় আসি; এটা যদি উপরিতলে এসে জায়গা করে নেয় হঠাৎ করে, তবে মারাত্মক ব্যবস্থাতান্ত্রিক সংকট আরও বেশি হারে লাফিয়ে লাফিয়ে ওপরের দিকে উঠতে থাকে।
১৯৯৮ সালের লিভারেজ ও ডেরিভেটিভস: একক কিছু হেজ ফান্ড, দীর্ঘমেয়াদি মূলধন ব্যবস্থাপনার চড়া কর্মকাণ্ডে ফেডারেল রিজার্ভ বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ল। এটা এতটাই মারাত্মক ক্ষতিসাধন করার মতো ব্যাপার ছিল যে, তা দ্রুততার সঙ্গে পরিত্রাণের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হয়েছিল। পরবর্তীকালে এলটিসিএমের চমৎকার ব্যবসা ফেডারেল রিজার্ভের স্বীকৃতিতে কংগ্রেশনাল টেস্টিমনিতে বাজারে প্রবেশ করতে পারল না। কেননা, এই ফার্মটিকে বেশি মানুষ চিনত না। এখানে মাত্র কয়েকশ মানুষ চাকরি করত। কিন্তু কোম্পানিটি আমেরিকার ব্যবসায় বাজারের স্থায়িত্বের জন্য বেশ হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অন্য কথায় বলা যায়, এ পরিস্থিতিতে ফেডারেল রিজার্ভের কর্তাব্যক্তিরা কিছু পদক্ষেপ নিলেন এ জন্য যে, তারা বেশ আশঙ্কায় পড়ে গিয়েছিলেন এ অবস্থা চলমান থাকলে অন্য যে কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়বে এবং তা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সাধারণত সেসব প্রতিষ্ঠানের এসব ঝুঁকির মধ্যে পড়ার আশঙ্কা বেশি থাকবে, যারা এলটিসিএমের ডমিনো টপোল গ্রহণ করেছে। এ দশাটি ছিল খুবই দুর্দশাগ্রস্ত, খারাপের চেয়েও অনেক বেশি খারাপ। কেননা, এটা পুরো সপ্তাহ ধরে ফিক্সড ইনকাম বাজারের অনেকগুলো অঙ্ককে পুরোই পঙ্গু করে ফেলেছিল।

এই দর্শন রচনাবলি সম্পাদনা করেছেন লরেন্স এ. কানিংহ্যাম অনুবাদক: গবেষক, শেয়ার বিজ