ডেরিভেটিভস

মিজানুর রহমান শেলী: ১৯৯৮ সালের লিভারেজ ও ডেরিভেটিভস: একক কিছু হেজ ফান্ড, দীর্ঘমেয়াদি মূলধন ব্যবস্থাপনার চড়া কর্মকাণ্ডে ফেডারেল রিজার্ভ বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ল। এটা এতটাই মারাত্মক ক্ষতিসাধনের মতো ব্যাপার ছিল যে, তা দ্রুততার সঙ্গে পরিত্রাণের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হয়েছিল। পরবর্তীকালে এলটিসিএমের চমৎকার ব্যবসা ফেডারেল রিজার্ভের স্বীকৃতিতে কংগ্রেশনাল টেস্টিমনিতে বাজারে প্রবেশ করতে পারল না। কেননা, এ ফার্মটিকে বেশি মানুষ চিনত না। এখানে মাত্র কয়েকশ মানুষ চাকরি করত। কিন্তু কোম্পানিটি আমেরিকার ব্যবসায় বাজারের স্থায়িত্বের জন্য বেশ হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অন্য কথায় বলা যায়, এ পরিস্থিতিতে ফেডারেল রিজার্ভের কর্তাব্যক্তিরা কিছু পদক্ষেপ নিল এ জন্য যে, তারা বেশ আশঙ্কায় পড়ে গিয়েছিল এ অবস্থা চলমান থাকলে অন্য যে কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়বে এবং তা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সাধারণত সেসব প্রতিষ্ঠানের এসব ঝুঁকির মধ্যে পড়া আশঙ্কা বেশি থাকবে, যারা এলটিসিএমের ডমিনো টপোল গ্রহণ করেছে। এ দশাটি ছিল খুবই দুর্দশাগ্রস্ত, খারাপের চেয়েও অনেক বেশি খারাপ। কেননা, এটি পুরো সপ্তাহ ধরে ফিক্সড ইনকাম বাজারের অনেকগুলো অঙ্গকে পুরোই পঙ্গু করে ফেলেছিল। এটা মন্দতর দশার চেয়ে অনেক বেশি খারাপ অবস্থা তৈরি করেছিল।
এলটিসিএমের ব্যবহƒত অন্যতম ডেরিভেটিভস উপকরণ ছিল টোটাল রিটার্ন সোয়াপ। চুক্তিতে উল্লেখ থাকত তারা বিভিন্ন বাজারে ১০০ ভাগ লিভারেজ সুবিধা পেয়ে থাকবে। এর সঙ্গে স্টক মার্কেটও যুক্ত ছিল। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ‘ক’ পক্ষ সাধারণত ব্যাংক হয়ে থাকে। এরা যখন কোনো চুক্তিতে যায়, তখন তাদের সব সম্পদ একটি স্টক কেনার জন্য লগ্নি করে থাকে। আর যখন পক্ষ ‘খ’ কোনো সম্পদ বিনিয়োগ না করেই এ চুক্তিতে সম্মত হয় যে, তারা ভবিষ্যতে যে কোনো লাভের ফসলে ভাগ নেবে; আবার যে কোনো ক্ষতিরও দুঃখ সইবে। আর এটাই ব্যাংক উপলব্ধি করে নিবিড়ভাবে।
টোটাল রিটার্ন সোয়াপের কথা এর আগেই একবার এসেছে। যাহোক, এটি প্রান্তিক স্তরের চাহিদার ক্ষেত্রে উপরোল্লিখিত ‘ক’ আর ‘খ’ পক্ষের মতো এ ধরনের তামাশা উৎপাদন করে থাকে। এসবের পেছনে রয়ে যায় আরও কথা, ডেরিভেটিভসের আরও কিছু ধরন রয়েছে, যেগুলো নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতাকে ধীরে ধীরে খর্ব করে ফেলে তাদের অঙ্গহানির মাধ্যমে। এতে করে তারা লিভারেজের সূচককে বাঁকা করে ফেলতে সক্ষম হয় এবং এভাবেই খুব সহজে তারা বিভিন্ন ব্যাংক, বিমা ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকি প্রোফাইলের চারদিকে অক্টোপাসের মতো তাদের অস্ত্র তাক করে রাখে। একইভাবে যেসব পুরোনো অভিজ্ঞ বিনিয়োগকারী এবং বিশ্লেষকরা বিভিন্ন ফার্মের আর্থিক অবস্থা বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে প্রধান প্রধান যেসব সংকটের সম্মুখীন হন, তাতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই ডেরিভেটিভসকে খুঁজে পাওয়া যায়। চার্লি আর আমি বিভিন্ন ব্যাংকের ডেরিভেটিভস একটিভিটিস পড়তে গিয়ে দেখি তারা ফুটনোটে ডেরিভেটিভস নিয়ে অনেক অনেক পেছনের কথা লিখেছে। বেশ আগ্রহ নিয়েই আমরা দুজনে সেসব দীর্ঘ ফুটনোট পড়তে থাকলাম। শেষতক আমরা দুজন একটি জিনিস মাত্র বুঝতে পারলাম যে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের পরিচালনা কাঠামোয় কতটা ঝুঁকির মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করছেন তা বুঝে ওঠা সম্ভব নয়।
জেনি নামের ডেরিভেটিভসটি এখন খুব ভালোভাবেই বোতল থেকে বের হতে পেরেছে। এখন এই জেনি তার বিভিন্ন উপকরণ মোটামুটি বহুগুণে বহু সংখ্যায় বৈচিত্র্য লাভ করবে এবং চারদিকে ছেয়ে নেবে ঠিক ততক্ষণ অবধি যতক্ষণ অবধি না কিছু পদক্ষেপের মাধ্যমে তাদের বিষ নষ্ট করা না হয়। এই জেনি ডেরিভেটিভস যে কত বড় ভয়ানক, তার জ্ঞান আমরা তখনই লাভ করতে পেরেছি যখন কিনা দেখেছি তা বিদ্যুৎ আর গ্যাসের ব্যবসাকে বিজড়িত করে নিয়েছিল। এই ডেরিভেটিভস ব্যবহারের কারণেই তা অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো জ্বলে উঠেছিল এবং নাটকীয়ভাবেই তা দ্রুততর সময়ের মধ্যে সব নাশ করে দিয়েছিল। যাহোক, অন্যান্য ক্ষেত্রে কিন্তু ডেরিভেটিভসের এই অপকর্ম ধরা পড়ছে না। কেননা, সেখানে ডেরিভেটিভস কোনো নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই উš§ুক্ত ময়দানের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। সেন্ট্রাল ব্যাংক কিংবা সরকার যার কথাই বলুন না কেন, কেউই এটাকে নিয়ন্ত্রণের কোনো মোক্ষম উপায় বের করতে পারছেন না। এমনকি তারা ঠিকঠাক দেখভালও করছে না। ফলে সেসব চুক্তির মধ্যে ঝুঁকিগুলো গোপনে ঠাঁই করে নিচ্ছে।
চার্লি আর আমি বিশ্বাস করি, বার্কশায়ার হবে আর্থিক ক্ষমতা কাঠামোর বড় দুর্গ। এটা আমাদের মালিকদের, ক্রেডিটরদের, পলিসিহোল্ডারদের এবং সর্বস্তরের চাকরিজীবীর স্বার্থ সংরক্ষণে সদা প্রস্তুত থাকবে। আমরা সদা সতর্ক থাকার জন্য মরণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাব যাতে করে কোনো ধরনের মেগা-ক্যাটাস্ট্রফি বা বড় বিপর্যয়ের ঝুঁকি আমাদের পেয়ে না বসে। এর যে কোনো ধরনের অঙ্গবিন্যাস আমাদের যে কোনো মুহূর্তে অযাচিতভাবে আটকে ফেলতে পারে। এই ঝুঁকির সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র হলো দীর্ঘমেয়াদি ডেরিভেটিভস চুক্তির দরকষাকষি সংখ্যাবাচকতা এবং অসমান্তরাল পাওনাদি যা দিনে দিনে অনিয়ন্ত্রিত উপায়ে বেড়েই চলেছে চারদিক থেকে। যাহোক, আমাদের দৃষ্টিতে ডেরিভেটিভস হলো বিশাল ধ্বংসযজ্ঞের জন্য এক বড় আর্থিক হাতিয়ার। এটা এমনভাবে তার ভয়াবহতা বহন করে চলে যে, তা কেউই ঠিকঠাক বুঝে উঠতে পারে না। এর সুপ্ত আশঙ্কা খুবই মারাত্মক।
অনেক আগে মার্ক টুইন বলেছিলেন, ‘একজন মানুষ যে একটি বিড়ালের লেজ ধরে বিড়ালকে নিজের বাড়িতে আনার চেষ্টা করে, সে নিশ্চয়ই একটি শিক্ষা গ্রহণ করবে, যে শিক্ষা আর অন্য কোনো উপায়ে লাভ করা সম্ভব নয়।’ যদি এ সময় টুইন আমাদের মাঝে থাকতেন, তবে তিনি হয়তো এই ডেরিভেটিভস ব্যবসাকে হাওয়া মিশিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতেন। কিছুদিন পরই হয়তো তিনি বিড়ালের লেজ ধরে বাড়ি আনার দক্ষতা বেশ ভালোভাবেই অর্জন করে নিতেন।
গত বছর আমরা ১০৪ মিলিয়ন ডলার প্রি-ট্যাক্স থেকে ক্ষতি করেছি। এর একমাত্র কারণ হলো জেন রে’র ডেরিভেটিভস ব্যবসা থেকে বেরিয়ে আসার প্রচেষ্টা। এ চেষ্টাটি আমরা বহুদিন আগে থেকেই নিরন্তর চালিয়ে যাচ্ছি। এ যাবৎ এই প্রচেষ্টায় আমরা বহু অর্থ ব্যয় করেছি। এ জন্য আমরা কার্যত একটি থোক নির্ধারণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। বস্তুত সব মিলে আমরা ৪০৪ মিলিয়ন ডলার ক্ষতি করেছি। মূলত আমাদের চুক্তির সংখ্যা ২৩২১৮। এগুলো সবই খুব চমৎকার। ২০০৫ সালের শুরুর দিকে আমাদের এসব চুক্তির সংখ্যা ২৮৯০-এর নিচে ছিল। আপনারা যদি আমাদের এই ক্ষতির বিষয়টি ভালো করে আঁচ করতে চান, তবে এ তথ্যটি যাচাই করুন। তাহলে অবশ্যই এত বড় ক্ষতির সত্যতা মিলবে। কিন্তু আমাদের রক্তের ধারা এখনও থমকে যায়নি। নিরবধি রক্তের প্রবাহ চলেছে অবিরত। উপরোল্লিখিত গত বছরের ১০৪ মিলিয়ন ডলারের পেছনে রয়েছে ৭০৪টি চুক্তি। ১৯৯০ সালে এ চুক্তির যৌক্তিকতা ছিল। এই যৌক্তিকতায় বিমা গ্রাহকদের চাহিদা পূরণে জেন রে’র ইচ্ছার অনুগামী আমরা হয়েছিলাম। এখন অবধি একটি চুক্তিকে আমরা তারলীকরণ করতে পেরেছি। এটি ২০০৫ সালে ১০০ বছরের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।

এই দর্শন রচনাবলি সম্পাদনা করেছেন লরেন্স এ. কানিংহ্যাম
অনুবাদক: গবেষক, শেয়ার বিজ