ডেরিভেটিভস

মিজানুর রহমান শেলী: আমাদের বাধ্যবাধকতাটি ছিল মোটামুটি উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো। কেননা, সেখানে এমন কোনো সম্ভাবনা ছিল না যা কোনো কিছুকে নতুন করে আবিষ্কার করতে পারে, সমাধান খুঁজে পায়। আবার যদিও পাওয়া যায়, তবুও সে সম্ভাবনার কোনো সীমা-পরিসীমা হিসাব করার মতো জো ছিল না আমাদের হতে। উপরন্তু যদি এসব নিদারুণ সংকট সংঘটিত হতে থাকত, তবে আমরা বুঝে নিতাম এ সংকটের সঙ্গে যোগসূত্র আছে এমন কিছু সমস্যার, যা অর্থসংস্থানিক বাজার অবধি ছেয়ে যায়। তাই আমি কোনো ব্যথা ছাড়াই এখান থেকে বেরিয়ে আসার মতো পথ খুঁজে পাইনি। এমনকি এসব পরিস্থিতি চলাকালীন সময়ই আমাদের বাণিজ্য খাতায় আরও পাতা খুলতে হলো, যেখানে নতুন নতুন বাণিজ্য অন্তর্ভুক্ত হলো। আমি যেন শিহরণের দায়ে দোষী হয়ে গেলাম। চার্লি আমাকে বোবা-দুষ্টু বলে ডাকা শুরু করল। যখনই কোনো সংকট থিতু হয়ে যায়, হোক তা কোনো কর্মীর কারণে অথবা এর ব্যবসা পরিচালনা পদ্ধতির কারণেÑযা-ই হোক না কেন, সেটাকে সামনে নিয়েই বর্তমানের সঙ্গে অভিনয় করে যেতে হতো।
আর দ্বিতীয় কারণ হলো আমি নিয়ত আমাদের সমস্যা নিয়ে বিবরণী দিতাম। বিশেষ করে এমন সব সমস্যাকে আমি গুরুত্ব দিতাম, যেসব সমস্যা আমাদের স্বপ্ন বা আশাকে বিজড়িত করে। কার্যত এ বিবরণী দেওয়ার মাধ্যমে আমি আমাদের ম্যানেজার, অডিটর ও রেগুলেটরদের তাদের স্বপ্ন বোনার ক্ষেত্রে আমার অভিজ্ঞতাকে ভাগাভাগি করে নিতে পারতাম। ফলে তারা বেশ উপকৃত হতো বলে আমার বিশ্বাস ছিল। এ হিসেবে বলতে হয়, আমরা যেন এই কয়লা খনির ব্যবসার ক্যানারি। এখানে আমাদের সতর্কতার গান গাইতে হয়, যে সতর্কতার মেয়াদ আবার আমরা নিজেরাই নির্ধারণ করে থাকি। ডেরিভেটিভসের সংখ্যা ও মূল্যের চুক্তি এ দুনিয়ায় বেশ চমৎকারভাবে এগিয়ে চলেছে ব্যাঙের ছাতার মতো। ১৯৯৮ সালে এর সংখ্যামূল্য যে পরিমাণে ছিল, আজ তা বহুগুণে বেড়ে গিয়ে চারদিকে ছেয়ে গেছে। ফলে শেষ সময়ে যেটা ঘটছে, সেটা খুবই শোচনীয় ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা যেন সব ধরনের আর্থিক অর্থসংস্থানিক সংকটাদির সূত্রপাত ঘটিয়ে চলেছে। আমাদের অভিজ্ঞতাকে বস্তুত গুরুত্ব দিতেই হয়। এর একটি গুরুগাম্ভীর্যতা রয়েছে: এটা নিশ্চিত করে বলা চলে। কেননা, আমরা যদি শ্রেষ্ঠতর নাও হতে পারি, তবে সফলভাবে যে কোনো সমস্যা থেকে উৎরে আসার জন্য গড়পড়তা মাপের চেয়ে উত্তম মানতেই হবে।
তাছাড়া আমরা জানি, আমাদের সঙ্গে এমন কেউ নেই, যার আচার-আচরণ খারাপ। তবে এ বিষয়টি এখানকার আলোচনা নয়। বিষয়টি নিয়ে আমরা এরপর অন্য কোথাও আলোচনা করব। অবশ্য সে আলোচনাটি অন্যদের জন্য খুব শিক্ষণীয় হবে। এমনকি একটি ব্যতিক্রমী গল্প হবে; এ ব্যাপারে বস্তুত কোনো সন্দেহ থাকে না। কল্পনা করুন, আপনি চাইলে এটা নিয়ে ভাবতে পারেন ভবিষ্যতে: আমাদের এক বা একাধিক ফার্ম রয়েছে, যেগুলো প্রায় কোনো না কোনো সমস্যা চারদিকে ছড়িয়ে বেড়ায়, এরা কোনো বিশৃঙ্খল বাজারে তাদের সব সম্পদের তরলীকরণ করতে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কার্যত এ ফার্মগুলো তার সম্পদের তরলীকরণের জন্য বাজারের ঠিক এমন পরিস্থিতিকে বেছে নিয়েছে, যখন বাজার থাকে খুবই চাপের মধ্যে, নানা ধরনের বিশৃঙ্খলায় তা বুঁদ হয়ে থাকে। এ দৃশ্যপটটি খুবই মারাত্মক। আমাদের উচিত এখনই এখানে খুব গুরুত্বের সঙ্গে নজরদারি করা। এ সংকট সমাধানে যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো বিকল্প থাকবে না। বস্তুত এর বাইরে গেলে দেখা যাবে সবকিছু গড়বড়ে হয়ে যেতে পারে। পরিস্থিতি ঘটে যাওয়ার পর নয়, আগেই নজর দিতে হবে। এখনই সময় যে কোনোভাবে এ পরিস্থিতিকে বিবেচনায় নেওয়ার এবং তার উন্নয়ন সাধন করা। এক্ষেত্রে নিউ ওরলিয়ানস লিভের ওপর কিছুটা হলেও ভরসা রাখতে পারি। আমি জেন রে থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সব সময়ই প্রহর গুনতে থাকি। এখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারলে আমার অনুভূতি কেমন হবে সেটা নিয়েও এখনই ভাবতে ভালোবাসি। এটি আমার বহু প্রতীক্ষিত। আমি ঠিক এমন অনুভূতিতেই নিজেকে ভিজিয়ে নেব, যেমন অনুভূতি প্রকাশ হয়ে থাকে দেশাত্মবোধ গানের মাঝে: ‘বউ আমার সবচেয়ে অন্তরঙ্গ বন্ধুর হাত ধরে পালিয়ে গেল, তখন আমি নিশ্চিত যে আমি তাকে খুব মিস করব (২০০৬ সালের চিঠিতে এ ইঙ্গিতই এসেছিল যে, জেন রে থেকে তাদের সব ডেরিভেটিভস অপারেশন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে)।
আমরা এখন অবধি বিভিন্ন ধরনের ডেরিভেটিভস চুক্তির সঙ্গে নিজেদের জড়িয়ে নিয়েছি। এটি আমাদের স্বস্তিতে থাকতে দেয়নি। এখানে আমরা নিয়ত বিভিন্ন ধরনের সংকট ও অদ্ভুত পরিস্থিতি পার করছি। বর্তমান পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, চারদিক থেকে এই ডেরিভেটিভস দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। ব্যবহার বাড়ছে দেদারসে। ফলে এর প্রভাবও ব্যস্তানুপাতে বেড়ে দাঁড়াচ্ছে। বিশেষ করে ব্যবস্থাতান্ত্রিক সংকট সৃষ্টিতে এই ডেরিভেটিভস হুমকিস্বরূপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আপনি শুনে অবাক হয়ে যাবেন যে, এই বিষাক্ত জীবাণুর ছোবলে আমরা নিজেরাই বোকা বনে যাচ্ছি। কিন্তু কেন আমরা বোকা বনে যাচ্ছি?
এর একটিই জবাব: এই ডেরিভেটিভস। স্টকের কথা বলুন আর বন্ডের কথাই বলুন, যেটাই বলবেন না কেন, সব ক্ষেত্রেই মাঝে মাঝে ভুলভাল দামদর হেঁকে উঠছে। অনেক বছর ধরে আমরা ধারাবাহিকভাবে এই ডেরিভেটিভস নিয়ে অনেক লেখালেখি করেছি। এই ডেরিভেটিভস চুক্তিগুলো সংখ্যায় হয়তো বেশি নয়। কিন্তু একেকটি চুক্তির ডলারে অর্থের অঙ্ক সুবিশাল। আমাদের এখন ৬২টি চমৎকার চুক্তি রয়েছে। আমি নিজেই এগুলোর ব্যবস্থাপনা করে থাকি। আর এগুলো বিপরীত পক্ষের ক্রেডিট ঝুঁকি থেকে একেবারেই মুক্ত। এখন অবধি এসব ডেরিভেটিভস চুক্তি আমাদের সঙ্গে খুব ভালোভাবেই কাজ করে যাচ্ছে। কোনোরকম সমস্যা বা সংকট এখন অবধি দেখা যাচ্ছে না। খুব স্বাভাবিক উপায়েই তা আমাদের জন্য প্রি-ট্যাক্স প্রফিট দিয়ে চলেছে। এই প্রফিট বা লভ্যাংশগুলো প্রায় শত শত মিলিয়ন ডলারের হিসাব-নিকাশ। এরপরও আমরা প্রায়ই এসব ব্যবসা থেকে বিপুল পরিমাণ ক্ষতির মধ্যে পড়ে যাই। খুব সৌভাগ্যবশতই আমরা এই ডেরিভেটিভস চুক্তি থেকে লাভের ফসল ঘরে তুলতে পারি। মোটের ওপর আমাদের এই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ লভ্যাংশ আসছে মিস-প্রাইসড ডেরিভেটিভস থেকে, তা আসলেই কেমন যেন রহস্যাবৃত সৌভাগ্য ছাড়া আর কিছুই নয়।
ডেরিভেটিভস নিতান্তই খুব বিপজ্জনক। এটি খুব নাটকীয়ভাবে লিভারেজকে বাড়িয়ে দিয়েছে। এমনকি আমাদের অর্থসংস্থানিক ব্যবস্থাকে একেবারেই বিষাদগ্রস্ত করে তুলেছে। সবকিছুই যেন এখন একটি ঝুঁকির মধ্যে। এগুলো আমাদের বড় বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি ধোঁয়াশা তৈরি করে দিয়েছে: তারা আমাদের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক ব্যাংক ও বিনিয়োগী ব্যাংকগুলো সম্পর্কে কোনো ধারণাই পাচ্ছে না। কোনো কিছুতেই আজ আর তারা ভালো করে বিশ্লেষণী সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। তারা ফ্যানি মাই ও ফ্রেডি ম্যাককে বছরের পর বছর ধরে আয়ের ধ্বংসাত্মক ভুল তথ্য প্রদানে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এখানে ফ্রেডি আর ফেনির ব্যাপারে কোনো ধরনের পাঠোদ্ধার সম্ভব নয়। এদের ফেডারেল রেগুলেটর, ওএফএইচইও’তে ১০০’র বেশি চাকরিজীবী তাদের চাকরি হারিয়েছেন।

এই দর্শন রচনাবলি সম্পাদনা করেছেন লরেন্স এ. কানিংহ্যাম
অনুবাদক: গবেষক, শেয়ার বিজ