প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

ঢাকার পরিকল্পিত উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর একগুচ্ছ নির্দেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজধানী শহর ঢাকার জনসংখ্যা দুই কোটি ছুঁই ছুঁই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ শহরে জনসংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি গড়ে উঠছে একের পর এক বহুতল ভবন। ফলে ইট-পাথরের এ শহরে কমছে সবুজের সমারোহ। প্রাণভরে নিঃশ্বাস নেওয়ার স্থানও খুঁজে পাওয়া দায়। সঙ্গে অপ্রশস্ত সড়ক এ শহরে যে কোনো দুর্যোগে জীবন ও সম্পদহানির মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে কয়েকগুণ। আর অপরিকল্পিত অবকাঠামোর বোঝা কাঁধে নিয়ে যানজট আর জলাবদ্ধতার শহরে পরিণত হয়েছে রাজধানী ঢাকা। ফলে বিশ্বের বাস অযোগ্য শহরের তালিকায় নিয়মিতই উপরের দিকে থাকছে ঢাকার নাম।
নগরের এসব সমস্যার কথা মাথায় রেখে রাজধানীবাসীর জীবনমান উন্নয়নে ঢাকার চারটি এলাকা উন্নয়নের উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ‘ঢাকা সিটি নেইবারহুড আপগ্রেডিং প্রজেক্ট’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় এ শহরকে চারটি ভাগে ভাগ করে উন্নয়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
গত ৫ মার্চ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়। সে সময় ঢাকা শহরের পরিকল্পিত উন্নয়নে একগুচ্ছ নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সম্প্রতি স্থানীয় সরকার বিভাগে এ-সংক্রান্ত চিঠি পাঠায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।
এতে বলা হয়, গত ৫ মার্চ অনুষ্ঠিত একনেক সভায় প্রধানমন্ত্রী নিম্মোক্ত বিষয়গুলো নিয়ে সদয় অনুশাসন প্রদান করেছেন। এগুলো হলো পুরান ঢাকার মাঠগুলো দখলমুক্ত করতে হবে, রাস্তার প্রস্থ বাড়াতে হবে, বৃষ্টির পানি যেন পুকুরে যায় তা বিবেচনা করে ড্রেনেজ ব্যবস্থা করতে হবে, সিটি করপোরেশনে নবযুক্ত ইউনিয়নের জন্য নতুনভাবে পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে, বাস-ট্রাক স্ট্যান্ড পিপিপি’র (সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব) আওতায় দেওয়া যায় কি না পর্যালোচনা করতে হবে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন করতে হবে এবং পুরান ঢাকায় আরবার রিনিউওয়াল প্রজেক্ট গ্রহণের উদ্যোগ নিতে হবে ও প্রয়োজনে এলাকাবাসীর সঙ্গে জনপ্রতিনিধিরা বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবেন।
প্রধানমন্ত্রীর এসব নির্দেশনা ঢাকার পরিকল্পিত উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন। তিনি শেয়ার বিজকে বলেন, এ শহরের বিশেষ করে পুরান ঢাকার সড়কগুলো এতই অপ্রশস্ত যে কোনো দুর্ঘটনায় উদ্ধার তৎপরতা চালানোও কঠিন হয়ে পড়ে। অগ্নিকাণ্ডে বিভিন্ন সড়কে আগুন নেভানোর জন্য ফায়ার সার্ভিসের গাড়িও ঢোকে না। সম্প্রতি চুড়িহাট্টার অগ্নিকাণ্ডে সে করুণ চিত্র আবার ফুটে উঠেছে। এছাড়া বিনোদন, অবকাশ বা অন্যান্য নাগরিক সুবিধায়ও এ শহরের অধিবাসীরা অনেক পিছিয়ে। আর যানজট আর জলাবদ্ধতা তো এ শহরের নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই প্রধানমন্ত্রী ঢাকার পরিকল্পিত উন্নয়নে সময়োপযোগী বিভিন্ন নির্দেশনা দিয়েছেন।
তথ্যমতে, ঢাকা সিটি নেইবারহুড আপগ্রেডিং প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ৮৮০ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে বৈদেশিক সহায়তা পাওয়া যাবে ৮৩৪ কোটি টাকা।
এ প্রকল্পের মাধ্যমে যেসব এলাকার উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরি করা হবে সেগুলো হচ্ছে কামরাঙ্গীরচর, লালবাগ, নয়াবাজার, সূত্রাপুর, গুলিস্তান, খিলগাঁও, মুগদা ও বাসাবো। এসব এলাকার নাগরিক সেবার মান বাড়ানো, উম্মুক্ত স্থান বৃদ্ধি, আর্থসামাজিক উন্নয়ন, পরিবেশের উন্নয়ন, ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাঘাট উন্নয়ন, পার্ক-খেলার মাঠ-কমিউনিটি সেন্টার কাম মাল্টিপারপাস কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন করা হবে।
প্রকল্পটির প্রস্তাবনায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ থেকে বলা হয়েছে, ঢাকা মহানগর এলাকা বাংলাদেশের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র। এ কারণে নগর জীবনের প্রাত্যহিক প্রয়োজনীয় উপকরণ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। ঢাকা মহানগর এলাকায় ৪০ বছরে জনসংখ্যা প্রায় ১০ গুণ বেড়েছে। বর্তমানে ঢাকা বিশ্বের ১১তম বড় শহর। ২০৩০ সাল নাগাদ এটি বিশ্বের পঞ্চম বৃহৎ শহরে পরিণত হবে। তখন জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ।
সূত্রমতে, রাজধানীর খিলগাঁও, বাসাবো, পুরান ঢাকা, কামরাঙ্গীরচর ও লালবাগ এলাকায় যেসব নদী, পুকুর বা ঝিল রয়েছে সেগুলোর উন্নয়ন করে দুই পাড় বাঁধাই করে দেওয়া হবে। এছাড়া দুপাশে লাগানো হবে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। পাবলিক টয়লেট, কমিউনিটি সেন্টার কাম মাল্টিপারপাস বিল্ডিংও নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পটির মাধ্যমে ডিএসসিসি এলাকায় যেসব নদী, পুকুর বা ঝিল রয়েছে সেগুলোর উন্নয়ন করে দুপাশে বাঁধাই করে দেওয়া হবে; সেখানে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগানো হবে, যাতে অবসরে মানুষ সেখানে সময় কাটাতে পারেন। এছাড়া উল্লিখিত এলাকায় পাবলিক টয়লেট, কমিউনিটি সেন্টার কাম মাল্টিপারপাস বিল্ডিং নির্মাণ করা হবে, যার ওপরে জিমনেশিয়াম ও লাইব্রেরি থাকবে। সেই সঙ্গে এলাকার যেসব রাস্তাঘাট ভাঙাচোরা ও ব্যবহার অযোগ্য সেগুলো ঠিক করার পাশাপাশি নতুন রাস্তা তৈরি করা হবে। এছাড়া বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য এসটিএস নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। আগামী ২০২২ সাল নাগাদ প্রকল্পের কাজ শেষ হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ সিরাজুল ইসলাম বলেন, নগরবাসীর সুবিধার্থে ইতোমধ্যে রাজধানীর বিভিন্ন পার্ক ও খেলার মাঠের উন্নয়নকাজ চলছে। কাজগুলো সম্পন্ন হলে সেখানে জনবান্ধব পরিবেশ তৈরি হবে। এছাড়া নগরবাসীর জীবনমান উন্নয়নে ঢাকার চারটি এলাকা চিহ্নিত করে নতুন একটি প্রকল্পের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এটি বাস্তবায়ন হলে এসব এলাকার নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধির পাশাপাশি এলাকার চিত্রও বদলে যাবে।

সর্বশেষ..