ঢাকার পালে কলকাতার হাওয়া

ঢাকার পতিত নগর পরিসরে সহসা রাজধানী জেগে ওঠায় আবাসন ও নির্মাণ খাত হয়ে উঠেছিল অনিবার্য। সেই বাতাবরণে জহুরুল ইসলামের সৃজনী পদক্ষেপ ছিল তুরুপের তাস। ক্ষুদ্র ঠিকাদারি দিয়ে শুরু। দেশের সীমানা মাড়িয়ে বিদেশ-বিভুঁইয়ে তিনি গড়েছেন আকাশচুম্বী অট্টালিকা, সড়ক-মহাসড়ক, কল-কারখানা; এমনকি দেশের আঙিনায় বুলন্দ করেছেন বিদেশি বড়-প্রসিদ্ধ বাণিজ্যিক ও শৌখিন গাড়ির সমৃদ্ধি। রাজধানী ঢাকার নির্মাণ, আবাসন ও বিস্তৃতির বিবর্তনিক ইতিহাসের ধারাক্রমে জহুরুল ইসলাম তাই এক অবিচ্ছেদ্য প্রাসঙ্গিকতা। পর্ব-১৫

মিজানুর রহমান শেলী: ঢাকার জীবনেরও এই নবচেতনার মূলে ছিল রোমান্টিসিজম। তবে তা কেবলই শিল্প-সাহিত্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। সাধারণ জীবনকে তখনও ছুঁইতে পারেনি। অথচ শিক্ষায় যে নবচেতনার জোয়ার আসলে ঢাকা অঞ্চলে তা ঢাকাবাসীকে মুক্তিকামী করে তুলেছিল। ফলে ঢাকাবাসী স্বদেশি ব্যবসা-বাণিজ্যে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল। হিন্দুদের থেকে পিছিয়ে থাকার কষ্ট মুসলিমরা অনুধাবন করতে পেরে তারাও শিক্ষিত হতে থাকল আধুনিক শিক্ষায়। ইংরেজদের কাছ থেকে বিভিন্ন দাবি-দাওয়া আদায় করে নেওয়ার প্রচেষ্টা ছিল। এর মধ্যে বঙ্গভঙ্গ উল্লেখ্য। আর বঙ্গভঙ্গ রদের পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলো এই নবচেতনার জোয়ারে। ধীরে ধীরে ঢাকার বাহ্যিক বা অবকাঠামোগত চেহারা পাল্টে যেতে থাকল। জহুরুল ইসলাম ছিল এই নবচেতনার পরিণত পর্বের একজন শক্তিমান পথিক।
কার্যত আঠারো কিংবা উনিশ শতকে রোমান্টিসিজম আন্দোলনখানি সাহিত্য, দর্শন, শিল্পকলা, ধর্ম, রাজনীতি ও রাজনৈতিক অর্থনীতিতে নাড়া দেয়। নিওক্লাসিজম আর আনুষ্ঠানিক অর্থডক্সির বাগডোর সহসা ছিন্ন করে। এই রোমান্টিসিজম রুশোর চিন্তা থেকে গঠিত হওয়া শুরু করলেও দেশে-বিদেশে বিভিন্ন সময় পরিস্থিতিতে রূপ পাল্টেছে। তাই ভিক্টর হুগো বলেন, রোমান্টিসিজম ‘সাহিত্যের উদারবাদী’ রূপ নিয়ে বিশেষত, শিল্পী ও লেখকরা জটমুক্ত হয়ে ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যকে উসকে দেয়; আর তক্ষণি সেটা হয়ে ওঠে বিপ্লবী রাজনৈতিক ধারণার উদ্দীপনা। রাজনীতিতে রোমান্টিসিজম হলো ইউটোপিয়ানিজমের আরেক অধ্যায়। এটা একটি প্রতিক্রিয়া বা বিপ্লব। সমাজকে এমন প্রান্তে ফিরিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন দেখায়, যে প্রান্ত কখনও বাস্তবে দেখা হয়নি। আদতে যে সমাজ কখনও চর্চা করেনি এমন সমাজের স্বপ্ন দেখানো হয় রোমান্টিসিজমে।
হালেকালে ব্রিটিশ ইন্ডিয়াবিষয়ক পণ্ডিতরা সেকালের আঞ্চলিক ও দেশীয় সাহিত্য নিয়ে গবেষণা শুরু করেছিলেন। তবে পূর্ব বাংলার সাহিত্যই তখন বেশি বেশি প্রাধান্য পাচ্ছিল। ড্যান হোয়াইটের ‘ফ্রম লিটল লন্ডন টু লিটল বেঙ্গল’, ড্যানিয়েল সঞ্জিব রবার্টসের ‘রোমান্টিসিজম’স এমবিগুয়াজ লিগ্যাসি ইন ইন্ডিয়া’, রোসিনকা চৌধুরীর ‘ডিরোজিও, পয়েট অব ইন্ডিয়া’ হলো তার উদাহরণ। হোয়াইট তার গবেষণায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্বারোপ করেছেন উপনিবেশ ও সাম্রাজ্যবাদের ওপর। তার গবেষণায় সাময়িকীগুলোই এই চেতনা সৃষ্টির মূল কারণ বলে প্রতীয়মান হয়নি, বরং মিশনারি শিক্ষা কার্যক্রম ছিল বাংলার নবচেতনায় রোমান্টিসিজমের প্রভাবের প্রধান মাধ্যম। ‘ড্রুমন্ড একাডেমি ইন ক্যালকাটা’ সেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রধান উল্লেখ্য। এখানে সব শ্রেণি-বর্ণের শিক্ষার্থী পড়ালেখা করত।
কবি ও রাজনৈতিক কর্মী হেনরি লুইস ভিভেন রোজিওর নাম এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য। তিনি ছিলেন ইংলিশ-পর্তুগাল বংশোদ্ভব। কলকাতায় বেড়ে ওঠা এই কবি ও রাজনীতিক যোগ দেন ‘ড্রুমন্ড একাডেমি ইন ক্যালকাটায়’। সেখানে তিনি ইংরেজি সাহিত্যের রোমান্টিক ধারণাদি উšে§াচন করেন। রোমান্টিক লেখক কিট, বাইরন ও শেলীর কবিতা তিনি পড়াতে থাকেন। যদিও তিনি ইউরোপিয়ান ছিলেন, তবুও তিনি ছিলেন বাংলার অন্যতম প্রথম জাতীয়তাবাদী কবি।
তবে ঠিক ইউরোপের মতো করে রোমান্টিসিজমের ধারণা বাংলায় এসেছিল তা বলা যাবে না। অদৃষ্টবাদে বিশ্বাসী বাঙালিদের ওপর রোমান্টিসিজমের প্রভাব যেমন দানা বাঁধতে থাকে, তেমনি যুক্তিবাদও মোক্ষ হয়ে ওঠে। ফলে তারা অদৃশ্যে বিশ্বাসের পাশাপাশি ইহমুখী ধারণা লাভ করল। এই ধারাবাহিকতায়, নবকৃষ্ণ, গঙ্গাগোবিন্দ, ‘ব্ল্যাক জমিদার’ গোবিন্দরাম মিত্র, রামদুলাল দে’র মতো লোকেরা অদৃশ্যে না তাকিয়ে নিজের ভাগ্য নিজে গড়ার তাগিদে কাজ শুরু করেন। কিছু দিন বাদেই ধনকুবেরে পরিণত হন।
যুক্তিবাদের ধারণা যখনই বাঙালিকে আত্মনির্ভরশীল ইহমুখী করে তুলল, তখনই তারা ভোগবাদে জড়িয়ে পড়ল। তারা প্রমোদে গা ভাসিয়ে দিল। ভোগেই জীবনের স্বার্থকতা এই মন্ত্র-পূজা মণ্ডপ অবধি আচ্ছন্ন হলো। দুর্গা উৎসব, পিতৃমাতৃশ্রাদ্ধ ও বিবাহ ইত্যাদি উপলক্ষে তারা প্রচুর টাকা কড়ি খরচা করতে থাকে। আদতে যুক্তিবাদ সমাজে পরিবর্তনের বাতাস বইয়ে দিল। কর্মক্ষেত্রে এলো চাঞ্চল্য। তবে অবশ্যই বিভিন্ন সামাজিক উৎসব উপলক্ষে টাকাকড়ি খরচা করার মতো ভোগবাদী চিন্তা একটি বিশেষ স্তর অবধি রোমান্টিসিজমের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়।
আসলে এই নবচেতনার দ্বীপ জ্বলেছিল যখন ইউরোপীয় শিক্ষার আলোক রশ্মি বাংলায় উদ্ভাসিত হয়। ১৮৮০ সালে অক্লান্তকর্মী যুক্তিবাদী হেয়ার এলেন কলকাতায়। শ্রীরামপুরের মিশনারিরাও বিভিন্ন শিক্ষা উদ্যোগ নিয়েছিলেন খ্রিস্টবাদ প্রচারের প্রয়োজনে। অর্থ-বিত্ত আর প্রাচুর্যের অধিকারী বেদ-বাইবেল কোরআনে স্নাত রামমোহন রায় এসে বাসা বাঁধলেন কলকাতায়। ১৮১৫ সালে ‘আত্মীয়সভা’য় বেদের আলোচনার পাশে সমাজ সমস্যার আলোচনা শুরু হলো। ১৮১৭ সালে ‘স্কুল অব সোসাইটি’ এবং পাশ্চাত্য বিদ্যাশিক্ষার যুগান্তকারী প্রতিষ্ঠান ‘হিন্দু কলেজ’ প্রতিষ্ঠা পায়। পরের বছর জ্ঞান বিস্তারের উদ্দেশ্যে ‘স্কুল সোসাইটি’ ও দেশীয় সাময়িকপত্রের আবির্ভাব হলো। তবে ইতোমধ্যে কেরি, উইলকিন্স, উইলিয়াম জোনস ও হেলহেডের মতো ইউরোপিয়ান পণ্ডিতরা এদেশের প্রাচীন ঐতিহ্য উদ্ধারে, ঐতিহাসিক সচেতনতা সঞ্চারে, দেশীয় ভাষার উন্নতি সাধনে, মুদ্রাযন্ত্র প্রবর্তনে, পত্রপত্রিকা প্রকাশে, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও জনশিক্ষা প্রসারে কাজ করেন।
আমেরিকায় স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠার পরে সাম্রাজ্য হারানোর বেদনায় ব্রিটিশ সরকার ভারতে আর শিক্ষা বিস্তারে তেমন আগ্রহী ছিলেন না। তখন বাঙালিরা নিজ গরজে ইংরেজি শেখে। সেক্ষেত্রে মিশনারি ও দরদি ইউরোপীয়দের সহায়তা তারা পান। হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ছিল এই যে বাঙালি তরুণরা হবেন পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত ‘হিন্দু’। কিন্তু তা ভেস্তে গেল। বরং দেখা গেল সেখানে পুরোপুরি ইংরেজি শিক্ষিত পাশ্চাত্য সংস্কৃতি-স্নাত হিন্দু তরুণ সৃষ্টি হলো।
এই পর্বটা ছিল নবজিজ্ঞাসার দ্বিতীয় পর্ব। নিয়ন্ত্রণে ছিল মধ্যবিত্ত বাঙালি। যাহোক, হিন্দু কলেজের নবজিজ্ঞাসার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তরুণ শিক্ষক মুক্তচিন্তার অধিকারী ডিরোজিও। শ্রেণিকক্ষে তিনি ইতিহাস ও সাহিত্যের সব আলোচনা করতে পারতেন না। তাই ডজনখানিক ভক্ত শিক্ষার্থীদের নিয়ে তিনি প্রগতিশীল জ্ঞানচর্চা করতেন শ্রেণিকক্ষের বাইরে। তারা ছিলেন টমাস পেইনের ‘এজ অব দ্য রিজনস’ ও ‘রাইটস অব ম্যান’-এর আগ্রহী পাঠক। ১৫ বছর কাল তারা ‘একাডেমিক অ্যাসোসিয়েশনে’র মাধ্যমে বিপ্লবী ধ্যান-ধারণা প্রচার করেন। প্রথমে তারা হিন্দু ধর্মের অসারতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। পরে ঔপনিবেশিক সরকারের নানা ব্যর্থতায় দৃষ্টি নিবন্ধ করেন। পার্থিনন, ইস্ট ইন্ডিয়া, ইনক্যুয়ারার, জ্ঞানান্বেষণ, হিন্দু পাইওনিয়র ও বেঙ্গল স্পেক্টেটর নামের ছয়টি পত্রিকার সঙ্গে তারা সংযুক্ত ছিলেন। সময়টা ছিল ফরাসি বিপ্লব, শিল্পবিপ্লবের; রোমান্টিসিজম, জাতীয়তাবাদ আর বস্তুবাদের। সমকালীন বিশ্বের এসব ঘটনাস্রোতের জ্ঞান লাভ করে ডিরোজিওর শিক্ষার্থীদের মনে নবজিজ্ঞাসা শুরু হয়। সমাজের রীতি-প্রথায় সংশয় জাগে। সমাজ সংস্কারের আক্রমণ আর প্রতি আক্রমণের পালা শুরু হলো। এই আক্রমণ অনাচারাশ্রয়ী ছিল না। কিন্তু তা ছিল পাশ্চাত্য আদর্শাশ্রীয়। ডিরোজিও ছিলেন এই দ্বিতীয় পর্বের আন্দোলনের পুরোধা। ডিরোজিওরা আধ্যাত্মিকতা নয়, বিশুদ্ধ যুক্তিতে বিশ্বাসী ছিলেন। রামমোহনবাদীদের তারা ‘আধা-উদারবাদী’ মনে করতেন।
ব্রাহ্মসমাজের নেতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বিজ্ঞানপন্থি অক্ষয়কুমার দত্তের মধ্যে ধর্মীয় গ্রন্থের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সংঘাত হয়। দেবেন্দ্রনাথ রামমোহনের আধ্যাত্মিকতার উত্তরাধিকারী ছিলেন। আর দত্ত ছিলেন রামমোহনের যুক্তিবাদী বিজ্ঞানমনস্কতার পক্ষে। অক্ষয়কুমার দত্ত ব্রাহ্মবাদকে অতিবর্তী ঈশ্বরবাদে রূপান্তর এবং বিজ্ঞানভিত্তিক জ্ঞানাণ্বেষাকে ঈশ্বরের প্রত্যাদেশে পরিণত করতে চেয়েছিলেন। ১৮৫০ সালে এ দ্বন্দ্বে যোগ দেন মানবতাবাদী ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। দত্তের বিজ্ঞানসম্মত যুক্তিবাদের সঙ্গে বিদ্যাসাগরের মানবতাবাদের সুসমন্বয় ঘটেছিল। তবে দেবেন্দ্রনাথের আধ্যাত্মিকতাবাদ মেনে নেননি।
শেষত, ব্রাহ্মসমাজ থেকে দত্ত বহিষ্কার হলেন। সংঘাতও মিটল। অজ্ঞেয়বাদী হলেন তিনি। দত্ত তখন যুক্তিবাদ, বস্তুনিষ্ঠতা ও সমালোচনামূলক দৃষ্টিতে ভারতীয় ধর্ম ও দর্শনের ইতিহাস বিশ্লেষণের সচেষ্ট হন। উনিশ শতকের বাংলায় নবজাগৃতির অধিকারী অসংখ্য সুধীজনের জীবন-কর্মে এ লক্ষণগুলো ফুটে ওঠে। বিদ্যাসাগরও অজ্ঞেয়তাবাদী (নাস্তিক্য) ধারণা নিয়ে হিন্দু বিধবা পুনর্বিবাহ আন্দোলন চালান। তিনি ষাটের দশকে কুলীন ব্রাহ্মণদের বহুবিবাহের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেন। স্ত্রীশিক্ষার প্রসারে প্রচেষ্টা চালান। ডিরোজিও, অক্ষয়কুমার ও বিদ্যাসাগর মিলে সংশয়বাদী-অজ্ঞেয়তাবাদী-নাস্তিক্যবাদী যে ঐতিহ্য গড়ে তোলেন, তা পরিণত রূপ লাভ করে প্রত্যক্ষবাদী নাস্তিক কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্যের হাতে।
বিদ্যাসাগর ও অক্ষয়কুমার দুজনে মিলে আধুনিক বাংলা গদ্যের সৌধ গড়েন। এক্ষেত্রে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিত, শ্রীরামপুর ব্যাপটিস্ট চার্চের মিশনারি এবং রামমোহন ও তার বিরোধীদের সৃষ্টভিত্তিকে তারা ব্যবহার করেন। এসব গদ্য প্যারীচাঁদ, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথের হাত ধরে নানারূপে বিকশিত হয়। কাব্য ও নাটকে প্রতিমা-পূজাবিরোধী এবং ভাবের দিক থেকে ডিরোজিওপন্থি ছিলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। তিনি রীতি ভেঙে ব্যক্তিবাদ, জড়পার্থিবতা, দেশপ্রেমিকতা, নারীচরিত্রের প্রাধান্য আবিষ্কার করেন।
বিজ্ঞান, ইতিহাস ও দর্শনেও আসে নতুনত্ব। মধুসূদন গুপ্ত, মহেন্দ্রলাল সরকার, জগদীশ চন্দ্র বসু, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, রাজেন্দ্রলাল মিত্র, রমেশচন্দ্র দত্ত, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য ছিলেন এর কারিগর।
বাংলার এ নবজাগরণের মূল চালিকাশক্তি ছিল যুক্তিবাদ। উদ্দেশ্য ছিল সংস্কার। সাধারণ লক্ষ্য ছিল হিন্দুত্বের ত্রুটি। নবজাগরণের শেষ চার দশক ছিল জাতীয়তাবাদের, উদ্দেশ্য ছিল পুনর্জাগরণ সৃষ্টি। এই আন্দোলনের বিপক্ষ ছিল ব্রিটিশ উপনিবেশ। আবার এই যুক্তিবাদীরা তখন কালো আইন পাস-সংক্রান্ত বিতর্ক, সিপাহি বিপ্লব ও নীলবিদ্রোহের মতো ঘটনাপ্রবাহে বাঙালিকে জাতীয়তাবাদের পথ দেখায়। নবগোপাল মিত্র, রাজনারায়ণ বসু, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো ব্রাহ্মসমাজ হিন্দু মেলা ও ‘হিন্দু ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব’ শীর্ষক আলোচনাসভার ভেতর দিয়ে হিন্দু জাতীয়তাবাদের সূচনা করেন। এটাই ছিল নব্যহিন্দুত্ববাদী আন্দোলন। এখানে হিন্দুধর্মকে ইউরোপীয় জ্ঞানের সঙ্গে সামঞ্জস্য আনার চেষ্টা করা হয়। ভূদেব মুখোপাধ্যায়, বঙ্কিমচন্দ্র, স্বামী বিবেকানন্দ ও ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায় ছিলেন এর অগ্রনায়ক। একেশ্বরবাদের বিপরীতে সর্বেশ্বরবাদী যুক্তির মাধ্যমে হিন্দুধর্মের সামাজিক সংস্কারবাদ তারা প্রত্যাখ্যান করেন। সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন এবং মাতৃভূমিকে মাতৃদেবীরূপে কল্পনা করতে উৎসাহ জাগান।
এই হিন্দু জাতীয়তাবাদ পরবর্তীকালে যুক্তিবাদী ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদের জš§ দেয়। সৃষ্টি হয় ইন্ডিয়া লিগ, ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন, ন্যাশনাল কনফারেন্স ও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস।
তবে এই জাতীয়তাবাদ ও হিন্দুত্ববাদের প্রসারের ফলে নবচেতনার প্রভাব পরবর্তীকালেও ম্রিয়মাণ হয়নি। বরং বিশ শতকে যুক্তিবাদী চিন্তাবিদ, ঔপন্যাসিক ও নাট্যকার দেলোয়ার হোসায়েন, সামাজ সমালোচক মীর মশাররফ হোসেন এবং লেখক, শিক্ষাবিদ ও মুসলিম নারীমুক্তির জন্য সংগ্রামী ব্যক্তিত্ব বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনদের আবির্ভাব ঘটে।
যাহোক, উনিশ শতকের নবচেতনায় ইউরোপীয় রোমান্টিসিজম, তার সঙ্গে ভোগবাদ ও জাতীয়তাবাদের যে প্রভাব সৃষ্টি হয়েছিল তা বিশ শতকের কৃর্তীমান পুরুষদের কাজকর্মে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। উনিশ শতকে এই চেতনা ছিল কেবল শিক্ষিত এবং ধনাঢ্যদের মাঝে সীমাবদ্ধ। কিন্তু বিশ শতকে দেখা গেল রণদা প্রসাদ সাহার মতো একজন প্রান্তিক ও নামসর্বস্ব স্বাক্ষর জ্ঞানের অধিকারী লোকের মাঝেও সঞ্চারিত হয় নবচেতনার পরিণত অবয়ব। এই অবয়বের পরিণত পর্বে যখন পাকিস্তান সৃষ্টি হলো তখন বাংলার ঢাকাবাসী সচেতন। এই সচেতনতাই ঢাকবাসীকে উন্নত ভাগ্যের স্বপ্ন দেখিয়েছিল। উন্নত রাষ্ট্র বা রাজধানী ঢাকার আবাসন অবকাঠামো নির্মাণও তাই হয়ে উঠেছিল অনিবার্য। জহুরুল ইসলাম ছিলেন এই সময়ের একজন অল্প শিক্ষিত কিন্তু প্রগতির পথে চলা মানুষ। তাই তিনি নিজেকে আর এই ঢাকাকে সাজানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন।

লেখক: গবেষক, শেয়ার বিজ।