সাক্ষাৎকার

ঢাকায় মিনিটে উবার অ্যাপ ব্যবহার করছে ২০৫ জন

২০১৬ সালের ২২ নভেম্বর ঢাকায় অ্যাপভিত্তিক ট্যাক্সিসেবা চালু করে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক উবার। ঢাকার পাশাপাশি চট্টগ্রাম ও সিলেটে সেবা সম্প্রসারণের মাধ্যমে বাংলাদেশে রাইড শেয়ারিংয়ে এখন নেতৃত্ব দিচ্ছে উবার। জুলকার কাজী ইসলাম উবার বাংলাদেশের লিড পারসনের দায়িত্ব পালন করছেন। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে দৈনিক শেয়ার বিজের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শেখ শাফায়াত হোসেন

শেয়ার বিজ: বিশ্বের ৬০০টির মতো শহরে উবারের সেবা পাওয়া যায়। বাংলাদেশে উবার অ্যাপ চালুর গোড়ার দিকের কথাগুলো জানতে চাই। শুরুটা কীভাবে হয়েছিল?

জুলকার কাজী ইসলাম: ২০১৩ সালে আমি প্রথম প্যারিসে উবার অ্যাপ ব্যবহার করে পরিবহন সেবা গ্রহণ করি। তখনই আমার মনে হয়েছিল এমন একটি সেবা বাংলাদেশেও চালু করা যায়। আমার এমন বিশ্বাসও ছিল যে, এটা বাংলাদেশে খুব ভালো একটি জায়গা করে নেবে। আমি বলব, গত পৌনে তিন বছরে এই সেবাটি দেশে চমৎকার একটি সেবায় পরিণত হয়েছে।
বিশেষ করে ঢাকায় বিপুলসংখ্যক মানুষের বসবাস। জনসংখ্যার প্রবৃদ্ধি এখন যতটা, পরিবহন সুবিধা কিন্তু ততটা হয়নি। এ কারণেই একস্থান থেকে অন্যস্থানে পৌঁছানোর একটি নিরাপদ সেবার প্রয়োজনীয়তা রয়েই গিয়েছিল। উবার চালুর পর থেকে এই সেবার প্রতি সাধারণ মানুষের যে পরিমাণ সাড়া আমরা দেখেছি, তাতে আমরা রীতিমতো উচ্ছ্বসিত। আমি দুই বছর ৯ মাস হলো উবারে যোগ দিয়েছি। প্রকৃতপক্ষে উবার বাংলাদেশে চালুর সময় থেকে যে দলটি এর সঙ্গে কাজ করেছে, আমি সেই দলটিতে ছিলাম। আমরা তিনজন বাংলাদেশে উবারের ব্যবসা শুরু করি।
আন্তর্জাতিক একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবেই উবার চাচ্ছিল পৃথিবীর যতটা দেশে সম্ভব এই সেবাটি পৌঁছে দিতে। বাংলাদেশও তাদের অন্যতম প্রধান বাজার। এদেশে ১৬ কোটি মানুষের বাস। দ্রুত উচ্চহারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হচ্ছে। এছাড়া সরকার রাইড শেয়ারিং ব্যবসার জন্য যে নীতিমালাটি তৈরি করেছে, সেটিও অনেক বেশি প্রগতিশীল। অনেক অল্প সময়ের মধ্যে একটি নীতিমালা সরকার করেছে। সবকিছু মিলিয়ে উবার এখন বাংলাদেশের দিকে বিশেষভাবে দৃষ্টি দিচ্ছে।

শেয়ার বিজ: বাংলাদেশে উবার অ্যাপে কত ধরনের সেবা পাওয়া যায়? অ্যাপ ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে কেমন সাড়া পাচ্ছেন?

জুলকার কাজী ইসলাম: বাংলাদেশে উবার অ্যাপে ছয় ধরনের সেবা রয়েছে। উবার এক্স, উবার প্রিমিয়ার, উবার হায়ার, উবার ইন্টারসিটি, উবার মটো ও উবার এক্সএল। উবার এক্সএলের মাধ্যমে বড় গাড়ি ভাড়া করা, উবার ইন্টারসিটির মাধ্যমে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় যাওয়া এবং উবার মটোর মাধ্যমে বাইকে আরোহী হিসেবে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়া যাচ্ছে।
গত ফেব্রুয়ারির একটি পরিসংখ্যান দিয়ে বলি, প্রতি মিনিটে ২০৫ জন উবার অ্যাপ ব্যবহার করছে। এর আগের মাসে এই হার ছিল ১৫৫। এটা থেকেই উবার অ্যাপ ব্যবহারের প্রবৃদ্ধি সম্পর্কে বোঝা যাবে। এ থেকে একটা বিষয় প্রমাণিত যে, এই সেবাটির প্রয়োজনীয়তা আছে এবং দেশের মানুষ সেবাটি অনেক চায়।
উবারের মাধ্যমে গত পৌনে তিন বছরে আমরা দেশে এক লাখের বেশি উদ্যোক্তা তৈরি করতে পেরেছি। তারা কোনো না কোনোভাবে উবারের অ্যাপের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করতে পারছেন।

শেয়ার বিজ: অন্য কোনো প্রতিযোগী রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠান একটি-দুটি সেবায় আলোকপাত করলেও অনেক ধরনের সেবা আনতে পারেনি। সেদিক দিয়ে উবার এখনও এগিয়ে রয়েছে। এক্ষেত্রে উবার আর কী কী বিষয়ে জোর দিচ্ছে?

জুলকার কাজী ইসলাম: আমি মনে করি প্রতিযোগিতা সব ব্যবসার জন্যই ভালো। দু-তিনটি প্রতিষ্ঠান যখন একই বাজারে প্রতিযোগিতা করে, তখন ওই খাতে বিনিয়োগ বাড়ে। একই সঙ্গে সেবার পরিধিও দ্রুত বাড়তে থাকে। আমরা চেষ্টা করছি অ্যাপ ব্যবহার করে যত ধরনের পরিবহন সেবা দেওয়া সম্ভব, তার সবটাই যেন উবার অ্যাপে থাকে। আমাদের উবার এক্সেল দিয়ে দূরপাল্লার পরিবহন ভাড়া নেওয়া যায়। উবার মটো দিয়ে মোটরবাইক এবং উবার হায়ার দিয়ে ব্যক্তিগত গাড়ি ভাড়ায় খাটানো হচ্ছে। অথবা উবার ইন্টারসিটি ব্যবহার করে আন্তঃজেলা পরিবহন সেবা পাওয়া যাচ্ছে।
‘উবার’ শব্দটি এখন একটি ক্রিয়াপদে পরিণত হয়েছে। এখন অনেকে বলে, আমি ‘উবার করে’ এলাম। এটা আমার জন্য অত্যন্ত গর্বের একটি বিষয়। বাংলাদেশের মানুষ রাতদিন যেকোনো সময় রাস্তাঘাটে উবারের সেবা নিয়ে একস্থান থেকে অন্যস্থানে যাচ্ছে উবার বাংলাদেশের লিড পারসন হিসেবে এটা আসলেই গর্ব করার মতো একটি বিষয়।
উবার বিমার বিষয়টিতে খুব গুরুত্ব দিচ্ছে। আরোহী অনাকাক্সিক্ষত কোনো দুর্ঘটনায় পতিত হলে যাতে বিমাসংক্রান্ত সুরক্ষা পেতে পারেন, সে লক্ষ্য নিয়েই আমরা বিমা সুবিধা চালু করেছি। তবে উবার সবসময়ই চালক ও আরোহীর নিরাপত্তার বিষয়ে খুবই সজাগ দৃষ্টি দিচ্ছে।

শেয়ার বিজ: উবার বাংলাদেশের সঙ্গে মূল প্রতিষ্ঠান উবারের মুনাফা ভাগাভাগি নিয়ে একটা ধোঁয়াশা ছিল। সে বিষয়টি কি এখন নিরসন হয়েছে?

জুলকার কাজী ইসলাম: উবার বাংলাদেশ লিমিটেড একটি নিবন্ধিত করদাতা প্রতিষ্ঠান। সরকারের যত ধরনের রেগুলেশন আছে, তার সবকিছু মেনে এখানে সেবা দিচ্ছে। মূল প্রতিষ্ঠান উবারের সঙ্গে মুনাফা ভাগাভাগির বিষয়টিও সব ধরনের আইনের মধ্যে থেকেই সম্পন্ন হচ্ছে। মুনাফা ভাগাভাগির এই প্রক্রিয়াটি অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের তুলনায় ভিন্ন নয়।

শেয়ার বিজ: ২০১৮ সালের ১২ এপ্রিল চট্টগ্রামে উবার এক্স, হায়ার ও মটো সেবা চালু হয়। গত ১২ ফেব্রুয়ারি সিলেটে চালু হয় উবার মটো সেবা। এরপর কোথায় যাবে উবার?

জুলকার কাজী ইসলাম: ২৭ নভেম্বর, ২০১৮ পর্যন্ত এক লাখেরও বেশি চালক উবারে সাইন আপ করার ভিত্তিতে ধারণা করা হচ্ছে ২০১৯ সালে বাংলাদেশে উবারের কার্যক্রম দক্ষিণ এশিয়ার কোম্পানিটির মোট প্রবৃদ্ধির ২৫ শতাংশ অবদান রাখবে। প্রতি সপ্তাহে আড়াই হাজার নতুন চালক উবারে সাইন আপ করছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ সাইন আপ উবার মটোতে। প্রতি সপ্তাহে দুই হাজার পার্টনার সাইন আপ করছে। গত বছরের অক্টোবর মাস ছিল সবচেয়ে ব্যস্ততম মাস। বাংলাদেশে যাত্রা শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ১৬ কোটি কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছে উবার। ঢাকা শহরের ২২ শতাংশ মানুষ অন্তত একবার উবার অ্যাপ ব্যবহার করেছে। সবচেয়ে বেশি রাইড দিচ্ছে বিমানবন্দরে, এরপর গুলশান-১ ও বসুন্ধরা সিটিতে। চট্টগ্রাম ও সিলেটের পরে আমাদের আরও বেশ কয়েকটি শহরে যাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। তবে নির্দিষ্ট করে এখনই কিছু বলা সম্ভব হচ্ছে না।

শেয়ার বিজ: উবারের সেবা নিয়ে নানা ভোগান্তির অভিযোগ পাওয়া যায়। এ বিষয়ে আপনাদের কী কী পদক্ষেপ রয়েছে।

জুলকার কাজী ইসলাম: অনেক সময় কারিগরি কিছু কারণে ভাড়া বেশি দেখাতে পারে বা ভুল রাইড দেখাতে পারে। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। আমরা কারও কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া নেব না। সেক্ষেত্রে আরোহী বা অ্যাপ ব্যবহারকারীকে সঠিক পথ অবলম্বন করে অভিযোগটা আমাদের জানাতে হবে। তাছাড়া কোনো চালক আরোহীকে ডিসকাউন্ট সুবিধা দিতে না চাইলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা নেব। তাছাড়া অ্যাপ ব্যবহার করতে অনাগ্রহ প্রকাশ করা চালকদের আমরা সিস্টেম থেকে বের করে দিচ্ছি, যদিও সেটা খুব কমসংখ্যক। কারণ সিস্টেম থেকে বের হয়ে যাওয়াটা ওইসব চালকের জন্য লোকসানের। এছাড়া নিরাপত্তার জন্যই আরোহীদের অ্যাপ ছাড়া রাইডে ওঠা ঠিক নয়।

সর্বশেষ..