ঢাকায় হলো প্রথম ইংরেজি স্কুল  

ঢাকার পতিত নগর পরিসরে সহসা রাজধানী জেগে ওঠায় আবাসন ও নির্মাণ খাত হয়ে উঠেছিল অনিবার্য। সেই বাতাবরণে জহুরুল ইসলামের সৃজনী পদক্ষেপ ছিল তুরুপের তাস। ক্ষুদ্র ঠিকাদারি দিয়ে শুরু। দেশের সীমানা মাড়িয়ে বিদেশ-বিভুঁইয়ে তিনি গড়েছেন আকাশচুম্বী অট্টালিকা, সড়ক-মহাসড়ক, কল-কারখানা; এমনকি দেশের আঙিনায় বুলন্দ করেছেন বিদেশি বড়-প্রসিদ্ধ বাণিজ্যিক ও শৌখিন গাড়ির সমৃদ্ধি। রাজধানী ঢাকার নির্মাণ, আবাসন ও বিস্তৃতির বিবর্তনিক ইতিহাসের ধারাক্রমে জহুরুল ইসলাম তাই এক অবিচ্ছেদ্য প্রাসঙ্গিকতা। পর্ব-১৬

 

মিজানুর রহমান শেলী: উনিশ শতকে বাংলায় যে নবচেতনার ঢেউ বইতে লাগল তার মূল বাহন ছিল শিক্ষা। চারদিকে তখন শিক্ষা কাঠামো ছড়িয়ে দেওয়া ছিল উত্তম ব্রত। এই ব্রত নিয়ে যারা কাজ করেছেন সেই মহান মহতী হৃদয়ের মানুষের কথামালা আগের পর্বে বর্ণনা করা হয়েছে। সেই মহান মানুষগুলো কেবল নিজ এলাকায় ব্রত প্রতিষ্ঠা করেই ক্ষান্ত ছিলেন না। তা চারদিকে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য ছিল বদ্ধপরিকর। কার্যত বাংলা ভাষাভাষীদের পিছিয়ে থাকা লজ্জার ইতিহাস মুছে ফেলাই ছিল এর প্রধান উদ্দেশ্য। তাই কলকাতাকেন্দ্রিক সেই আন্দোলনের ঢেউ পূর্র্ববাংলার গ্রামে গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু এসবের বেশিরভাগই ছিল বেসরকারি উদ্যোগে। বেসরকারি উদ্যোগে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলন চলছিল, একই সঙ্গে গুণীজনরা ব্রিটিশ সরকারের কাছে সরকারিভাবে স্কুল প্রতিষ্ঠার আবেদনও করে আসছিল। সে সময় পূর্ববাংলায় অনেক যুবক কলকাতা থেকে শিক্ষা লাভ করে গ্রামে ফিরে আসতে শুরু করে। তাদের একমাত্র ব্রত ছিল গ্রাম উন্নয়ন। তাছাড়া শিক্ষিত যুবাদের তখন কলকাতার বুকে যথাযথ চাকরিরও ছিল আক্রা। বেকারত্ব বেড়েই চলেছিল। এই বেকারত্ব ছিল কৃত্রিম। তাই দেশের কাছে শিক্ষিত বেকাররা একটি বিপ্লবী চেতনা অনুভব করেন। সেই থেকে বাংলায় গঞ্জে-নগরে এবং গ্রামে গ্রামে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা শুরু হলো। এমনকি পরবর্তী সময়ে সরকারি উদ্যোগেও বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলো।

ঢাকাকেন্দ্রিক নবচেতনার এই ধারা বাংলাদেশের ইতিহাসে তাৎপর্যপূর্ণ। এই ইতিহাসের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে আজকের ঢাকার চলমানতা। রাজধানী শহর হিসেবে ঢাকা নগরী ২০১০ সালে ৪০০ বছর পার করেছে। বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে ১৯০৫ সালে পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশ গঠিত হলো। ঢাকা হলো তখন নবগঠিত প্রদেশের রাজধানী। রাজধানীর মর্যাদাও আবার ফিরে পেল। ফলে অবকাঠামোগত উন্নয়ন শুরু হলো। সেই সঙ্গে শিক্ষা ও সংস্কৃতিক বিকাশের দাঁড় উম্মোচিত হলো। নবচেতনা আর রাজধানী প্রতিষ্ঠার আবহাওয়ায় যেন ঢাকার মানুষের মনে আত্ম-মুক্তির বাসনা ঝড়োবেগে পেয়ে বসল। উন্নয়ন, প্রগতি আর মুক্তিই ছিল কাম্য। নগরজীবনের মানুষের মনে তখন নতুন স্বপ্ন ও উদ্দীপনা। এ সময় বিভিন্ন বিভাগ ও বিভিন্ন উচ্চ ও মধ্যপদস্থ কর্মকর্তাদের নিয়ে ঢাকায় প্রাদেশিক প্রশাসনের একটি উপরিকাঠামো প্রবর্তন করা হয়। একটি হাইকোর্ট ও একটি সচিবালয় প্রতিষ্ঠা হয়। হাইকোর্ট ভবনটিতে বিভিন্ন আকারের সারি-বাঁধা কক্ষ রয়েছে। রয়েছে বিশাল চতুর্ভুজাকার বেষ্টনী। কক্ষগুলো সামঞ্জস্যরূপে স্থাপিত চারটি অংশে বিন্যস্ত। সারিবদ্ধ ভবনটির অঙ্গনে প্রবেশের জন্য দক্ষিণ দিকে রয়েছে তিনটি খিলানবিশিষ্ট একটি স্মারক প্রবেশদ্বার। কোরিনথিয়ান স্তম্ভের ওপর স্থাপিত হয়েছে এর ঢালুকৃত তিনটি স্তরে উত্থিত সম্মুখভাগ। এর রয়েছে ত্রিভুজ আকৃতির ঝুলন্ত ছাদ। তার নিচে প্রবেশপথ। তাছাড়া দেখা যায়, একটি বৃত্তের ওপর সরু থাম এবং সংযুক্ত স্তম্ভের ওপর স্থাপিত হয়েছে একটি শোভন গম্বুজ। এটি ভবনটির শোভা বাড়ায়। রয়েছে সাদা মার্বেলে শোভিত একটি প্রশস্ত সিড়ি। বর্গাকার প্রবেশকক্ষ। সেখান থেকে বারান্দার পেছন দিক দিয়ে উপর তলায় উঠে গেছে। উত্তর অংশের মধ্যবর্তী স্থানে নির্মিত হয়েছে আরেকটি সিঁড়ি। এটিও চতুর্ভুজের অভ্যন্তরে দুই কোনায় অবস্থিত দুটি সম্পূরক প্যাঁচানো সিঁড়ির পাশ দিয়ে উপর তলায় উঠে গেছে। ভবনটি আয়তকার। এর চারটি বাহুতে দুই তলা। দুতলা মিলে বিভিন্ন আকারের পঞ্চাশটিরও বেশি কক্ষ রয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে বৈঠকখানা, খাবার ঘর, শয়ন কক্ষ, ড্রেসিং ও প্রসাধন কক্ষ, বাতিঘর, গুদামঘর, ভাঁড়ার ঘর ইত্যাদি। প্রত্যেক পার্শ্বকাঠামোর কেন্দ্রে রয়েছে একটি বৃত্তাকার বর্ধিত অংশ। পূর্বদিকের পার্শ্বকাঠামোতে বারান্দা। তার সম্মুখে একটি নাচঘর। পূর্বদিকের নাচঘর ছাড়া সমগ্র নিচ তলার মেঝে সাদা মার্বেল পাথরে শোভিত। নাচঘরের মেঝেতে বসানো হয়েছিল মসৃণ সেগুন কাঠ। ভবনটির এই স্থাপত্য রীতি অবিকল ইউরোপীয় রেনেসাঁ রীতিকে ফুটিয়ে তোলে। এটা হলো সংস্কৃতির পাঠ। একটি জাতি যখন কোনো অঞ্চলে আধিপত্য করতে চায়, তবে সেখানে তার ভাষা আর সংস্কৃতিকে পসরা সাজিয়ে বসতে হয়। এভাবেই ঢাকার নবচেতনায় ইউরোপ জেঁকে বসল। যেভাবে সারাবিশ্বে ইংল্যান্ডের সূর্য অস্ত যেত না।

তবে ঢাকাবাসী তা গ্রহণ করল। কেননা, এটা দিয়েই তাদের ভাগ্যোন্নয়ন সম্ভবÑতা তার বুঝে নিয়েছিল। আর বঙ্গভঙ্গের পরেই তার গতি বেড়ে চলল। কিন্তু এই উদ্দীপনা আর স্বপ্ন বেশিদিন টিকে রইল না। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হলো। ১৯১২ সালে ঢাকা আবারও রাজধানীর মর্যাদা হারাল।

এই বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে ঢাকা অঞ্চলের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক ভীষণ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হলো। তবুও ঢাকার বিবর্তনিক ইতিহাস রুদ্ধ হলো না। এই বিবর্তনের ইতিহাসের সঙ্গে শিক্ষা-সংস্কৃতির বিকাশের ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে গায়ে গায়ে। এ সময় পরিক্রমায় ঢাকায় বিভিন্ন ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। বিভিন্ন বিদেশিরা স্থায়ী বা অস্থায়ী বসবাসে বিভিন্ন রকম শিক্ষার প্রচলন করেছে। এর সঙ্গে রাজনৈতিক সংস্কৃতিও জড়িয়ে ছিল সমভাবে। আবার রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তনে ধর্ম ও শিক্ষারও পরিবর্তন ঘটেছে। তাই ধর্ম, রাজনীতি ও শিক্ষা খুব কাছাকাছি থেকে একটি সাংস্কৃতিক বিবর্তনের ইতিহাস নির্মাণ করে। বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার বিষয়বস্তু ও মাধ্যমও বিভিন্ন হয়।

মোগল শাসকরা শিক্ষার পৃষ্ঠপোষক ছিল। সে সময় অভিজাত ব্যক্তিরা সন্তানদের নিজগৃহে শিক্ষাগুরু রাখতেন। হিন্দুরা ছেলেমেয়েদের পাঠশালা ও টোলে পাঠাত। মুসলিমরা মসজিদসংলগ্ন মক্তবে। এসব শিক্ষার বেশিরভাগ অংশই ছিল ধর্মীয় ও ভাষাশিক্ষা কেন্দ্রিক। হিন্দু-মুসলিম সবাই তখন ফার্সি শিখত। কেননা এটা ছিল তখনকার রাজভাষা। চাকরি পাওয়ার আশায় সবাই ফার্সি শিখত। মুর্শিদ কুলী খান ঢাকা ও মুর্শিদাবাদে পারস্য থেকে আসা বিভিন্ন শাস্ত্রে জ্ঞানী পণ্ডিতদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। তারা এ অঞ্চলে শিক্ষা-সংস্কৃতির প্রসার করেছে। মোগল অভিজাত ও প্রশাসনিক বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারাও শিক্ষাক্ষেত্রে পৃষ্ঠপোষকতা করেছে।

পরবর্তী সময়ে ইংরেজরা এদেশে নতুনধারার শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে আসে। তবে তারা পূর্বের ধর্মীয় প্রভাবযুক্ত শিক্ষা কার্যক্রমকে প্রথমেই পরিবর্তন করেনি। দীর্ঘদিন ফার্সিকেই অফিশিয়াল ভাষা হিসেবে চালু রেখেছিল। তারা ১৭৮১ সালে কলকাতা মাদ্রাসা ও ১৭৯২ সালে কাশীতে সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠা করে। তারপর তারা নিজেদের আদলে শিক্ষা কাঠামোকে ঢেলে সাজায়। কলকাতা থেকেই শিক্ষা-সংস্কৃতিসহ সামাজিক ক্ষেত্রে পশ্চিমা ভাবধারার প্রথম সূচনা হয়। কেননা ঢাকাকে তখন ইংরেজরা উৎপাদন কেন্দ্র বানিয়েছিলেন। আর কলকাতায় তারা বসতি গড়ে তোলে।

পূর্ববাংলার মানুষরা ছিল কৃষিজীবী। তাই তারা শিক্ষা-দীক্ষায় ছিল পিছিয়ে। তবে কলকাতাকেন্দ্রিক শিক্ষা কার্যক্রমের ছোঁয়া এই বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে। তাই উনিশ শতকের বাংলার ‘নবচেতনা’ও ঢাকাকে আচ্ছন্ন করে কিছুটা হলেও।

মিশনারি ও কোম্পানির সুবিধার্থে যে ইউরোপীয় শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়েছিল, তারই ধারাবাহিকতায় ১৮৩০ সালে সরকার শিক্ষানীতি গ্রহণ করল। এই অঞ্চলে পাশ্চাত্য ভাবধারার শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বিজ্ঞানের অনুপ্রবেশ ঘটানো ছিল তাদের উদ্দেশ্য। এই শিক্ষানীতিতে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির জনবহুল শহরগুলোতে যতগুলো সম্ভব স্কুল খোলার প্রস্তাব করা হয়। এ সুপারিশের আলোকে ১৮৩৫ সালের ১৫ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকায় উপমহাদেশের প্রথম সরকারি ইংরেজি স্কুল খোলা হয়। এটিই ‘ঢাকা গভর্নমেন্ট স্কুল’। ১৮৪১ সালে একে একটি কলেজে উন্নীত করা হয়। এভাবে ইংরেজি ভাষা ও পাশ্চাত্য শিক্ষা সংস্কৃতি বাংলাদেশে বিস্তার লাভ করে।

 

লেখক: গবেষক, শেয়ার বিজ।