ঢাকা-সিলেট চার লেন নির্মাণ: ৪৩ শতাংশ বেশি দরে কাজ চায় চায়না হারবার

ইসমাইল আলী: ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক চার লেন জিটুজি ভিত্তিতে নির্মাণে গত মার্চে প্রস্তাব দেয় চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি (সিএইচইসি)। তবে কোম্পানিটি সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদফতরের চেয়ে প্রায় ৫৮ শতাংশ বেশি দরপ্রস্তাব করে। এ নিয়ে আপত্তি তোলে সওজ। পরে আলোচনার ভিত্তিতে কিছুটা ছাড় দিলেও ৪৩ শতাংশ বেশি দরে কাজ চায় কোম্পানিটি। এ নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় পড়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ।

সম্প্রতি এ-সংক্রান্ত চূড়ান্ত প্রস্তাব তৈরি করেছে সড়ক বিভাগ। এতে দেখা যায়, ঢাকার কাঁচপুর থেকে সিলেট পর্যন্ত ২২৬ কিলোমিটার সড়ক চার লেনে নির্মাণে সওজ ব্যয় প্রাক্কলন করছে ১০ হাজার ৯৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। আর চায়না হারবার এ ব্যয় নির্ধারণ করেছে ১৪ হাজার ৪৭০ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ চার হাজার ৩৭৫ কোটি ৫১ লাখ টাকা বা ৪৩ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেশি ব্যয় প্রস্তাব করেছে চীনের কোম্পানিটি। নির্মাণব্যয়ের প্রতিটি ক্ষেত্রেই ব্যয় বেশি প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে এ ব্যয়ে জমি অধিগ্রহণ বিবেচনা করা হয়নি।

যদিও ৪৩ শতাংশ বেশি ব্যয়েই কাজটি দেওয়ার জন্য গত মে মাসে সুপারিশ করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। অর্থমন্ত্রীকে পাঠানো চায়না হারবারের এক চিঠিতে প্রকল্পটি দ্রুত অনুমোদনে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরকে অনুরোধ করা হয়। এজন্য চায়না হারবারের পাঠানো ওই প্রস্তাবের ওপর অর্থমন্ত্রী লেখেন, ‘প্লিজ রিলিজ দিস ইস্যু অ্যাট ইউর আর্লিয়েস্ট কনভেনিয়েন্স।’

প্রকল্পটির সর্বশেষ ব্যয় বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রকল্পটি স্বাভাবিক ও সাইট ফেসিলিটিসে ভ্যাট-করসহ চীনা কোম্পানি ব্যয় ধরেছে ২৮৬ কোটি ৬২ লাখ টাকা। সওজ এ ব্যয়ের পরিমাণ ধরেছিল ১৯৯ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। মাটির কাজে (আর্থ ওয়ার্ক) চায়না হারবার ব্যয় ধরে দুই হাজার ১৬২ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। আর সওজ এ ব্যয় ধরে এক হাজার ৫০৫ কোটি ৫১ লাখ টাকা। পেভমেন্টে সিএইচইসি ও সওজের ব্যয় প্রাক্কলন যথাক্রমে ছয় হাজার ৫৭০ কোটি ১৭ লাখ ও চার হাজার ৫৭৩ কোটি ১০ লাখ টাকা।

ফাউন্ডেশন ওয়ার্কে সওজ ব্যয় ধরেছে ৮৭৮ কোটি ৬২ লাখ টাকা। আর চায়না হারবার এ ব্যয় ধরে এক হাজার ২৬২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণে সওজ ব্যয় ধরেছে দুই হাজার ২৩১ কোটি ১১ লাখ টাকা ও চায়না হারবার তিন হাজার ২০৫ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। অন্যান্য ব্যয় সওজ প্রাক্কলন করে

৫৩৩ কোটি নয় লাখ টাকা ও চায়না হারবার ৭৬৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। আর ডে-ওয়ার্ক বাবদ চায়না হারবার প্রাক্কলন করে পাঁচ কোটি ১১ লাখ ও সওজ তিন কোটি ৫৬ লাখ টাকা। অন্যান্য ব্যয়েও এ ধরনের পার্থক্য দেখা যায়।

মূল নির্মাণকাজ ছাড়াও বিদ্যমান সড়কটি রক্ষণাবেক্ষণে ১৭০ কোটি ৮৬ লাখ টাকা ব্যয় প্রাক্কলন করেছে সওজ। তবে চায়না হারবার এ ব্যয় নির্ধারণ করেছে ২১২ কোটি ৭২ লাখ টাকা।

যদিও চার লেন নির্মাণে এর আগে কিছু বেশি ব্যয় প্রাক্কলন করেছিল সওজ, তবে চায়না হারবারের প্রস্তাব ছিল অনেক বেশি। তাতে দেখা যায়, ঢাকার কাঁচপুর থেকে সিলেট পর্যন্ত ২২৬ কিলোমিটার সড়ক চার লেনে নির্মাণে সওজ ব্যয় প্রাক্কলন করছে ১০ হাজার ৩৭০ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। আর চায়না হারবার এ ব্যয় নির্ধারণ করেছে ১৬ হাজার ৩৪৯ কোটি ২০ লাখ টাকা। অর্থাৎ আগের প্রাক্কলনে চায়না হারবার পাঁচ হাজার ৯৭৮ কোটি ৮৫ লাখ টাকা বেশি প্রস্তাব করেছিল।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রথম হিসাবে সওজের রেট শিডিউল ২০১৪ ও ২০১৫ বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল। তবে চায়না হারবারের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০১৬ সালের সর্বশেষ রেট শিডিউল বিবেচনা করা হয়। এতে দেখা যায়, বেশকিছু নির্মাণসামগ্রীর দর আগের চেয়ে কমেছে। এতে নতুন হিসাবে চার লেনের নির্মাণব্যয় কিছুটা কমে গেছে।

জানতে চাইলে সওজের প্রধান প্রকৌশলী ইবনে আলম হাসান শেয়ার বিজকে বলেন, চীনের অর্থায়নে ঢাকা-সিলেট চার লেন নির্মাণে আলোচনা চলছে। গত ফেব্রুয়ারিতে প্রকল্পটির ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়। তবে চায়না হারবারের সঙ্গে আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে কিছু আইটেমের ব্যয় প্রাক্কলনে বিবিএসের নতুন হিসাব ব্যবহার করা হয়েছে। এর পরও দর নিয়ে কিছুটা মতবিরোধ রয়েছে। বিষয়টি সমাধানে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, ঢাকা-সিলেট চার লেন নির্মাণ অংশের জন্য সওজ ২০ শতাংশ অনিশ্চিত ব্যয় (কনটিনজেন্সি) ও রক্ষণাবেক্ষণে ২৫ শতাংশ ব্যয় সমন্বয় প্রাক্কলন করে। এতে চার লেনের ব্যয় দাঁড়ায় ১৪ হাজার ৫৯৬ কোটি টাকা। তবে চায়না হারবার কনটিনজেন্সি ধরে পাঁচ শতাংশ ও ব্যয় সমন্বয় ১১ শতাংশ। সব মিলিয়ে চার লেন নির্মাণে কোম্পানির ব্যয় ধরেছে ১৬ হাজার ৭৭৫ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। এ হিসেবে ব্যয়ের পার্থক্য কমে এসেছে ১৫ শতাংশে।

জমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন ও অন্যান্য ব্যয় যুক্ত হলে প্রকল্পটির মোট ব্যয় ১৯ হাজার কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় পড়বে ৮৪ কোটি টাকা। অথচ গত বছর প্রাথমিক হিসাবে এ ব্যয় ধরা হয় কিলোমিটারপ্রতি ৫৬ কোটি টাকা।

এদিকে গত বছর অনুমোদিত এলেঙ্গা-রংপুর চার লেন নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় ধরা হয়েছে ৬০ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। আর ২০১৪ সালে শুরু হওয়া জয়দেবপুর থেকে টাঙ্গাইল হয়ে এলেঙ্গা চার লেনে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হচ্ছে ৪৮ কোটি ছয় লাখ টাকা। এ হিসেবে চীনের অর্থায়নে প্রকল্পটির ব্যয় অনেক বেশি পড়বে।

প্রসঙ্গত, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে ঢাকা-সিলেট চার লেন নির্মাণে সম্ভাবতা যাচাই ও বিস্তারিত নকশা প্রণয়ন করা হয়। এতে চার লেন নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছিল ১২ হাজার ৬৬৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এর মধ্যে জমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন ব্যয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। এছাড়া পরিষেবা সংযোগ লাইন অপসারণ ও পরামর্শক ব্যয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ব্যয়ের এ চারটি অংশ বহন করবে বাংলাদেশ সরকার। আর জিটুজি ভিত্তিতে মহাসড়কটির নির্মাণব্যয় বহন করার কথা চীন সরকারের। তবে ব্যয় নিয়ে সমঝোতা না হলে প্রকল্পটি ঝুলে যেতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।