ঢাকা-সিলেট চার লেন : নির্মাণকাজে ৮৭ বিলাসবহুল গাড়ি চায় চায়না হারবার

 

ইসমাইল আলী: ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক জিটুজি ভিত্তিতে চার লেন নির্মাণে আগ্রহী চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি (সিএইচইসি)। তবে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদফতরের চেয়ে প্রায় ৪৩ শতাংশ বেশি দর চাইছে কোম্পানিটি। এর মধ্যে নির্মাণকাজের জন্য বিলাসবহুল ৮৭টি গাড়ি চায় সিএইচইসি। পাশাপাশি ৫০টি দামি বাইক সরবরাহের প্রস্তাবও দিয়েছে কোম্পানিটি। তবে এগুলোর দাম নিয়ে আপত্তি তুলেছে সওজ।

সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক বিস্তারিত প্রস্তাবে এ তথ্য উঠে এসেছে। এতে দেখা যাচ্ছে, এক কোটি সাড়ে ছয় লাখ টাকা দামের ২৫টি বিলাসবহুল জিপ, ৫৩ লাখ ২৯ হাজার টাকা দামের ৪৯টি ডাবল কেবিন পিকআপ ও একই দামের ১৩টি মাইক্রোবাস চেয়েছে চায়না হারবার। আর মোটরবাইকের দাম ধরা হয়েছে এক লাখ ৩৩ হাজার টাকা। ভ্যাট-শুল্কসহ এগুলো কেনায় মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৯ কোটি টাকা।

যদিও গাড়ি ও বাইকের দাম তুলনামূলক কম প্রস্তাব করেছে সওজ। এক্ষেত্রে প্রতিটি জিপের দাম ধরা হয়েছে (ভ্যাট-শুল্ক ছাড়া) ৭৪ লাখ ১৮ হাজার টাকা, ডাবল কেবিন পিকআপ ও মাইক্রোবাস ৩৭ লাখ ৯ হাজার করে এবং মোটরবাইক ৯২ হাজার টাকা। এক্ষেত্রে ভ্যাট-শুল্কসহ ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৪ কোটি ২৮ লাখ টাকা।

এদিকে গাড়ি ও বাইকগুলো রক্ষণাবেক্ষণে ৫৫ কোটি ৪৮ লাখ টাকা চেয়েছে সিএইচইসি। আর এ খাতে ৩৮ কোটি ৫৮ লাখ টাকা দিতে চেয়েছে সওজ। এছাড়া ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য অফিস নির্মাণ এবং আসবাব ও অন্যান্য সরঞ্জাম কেনায় প্রায় ৫০ কোটি টাকা চেয়েছে চায়না হারবার। আর এ খাতে ৩৬ কোটি টাকা ব্যয় প্রস্তাব করেছে সওজ।

সূত্র জানায়, ঢাকা-সিলেট ২২৬ কিলোমিটার মহাসড়ক চার লেন নির্মাণে দর ৫৮ শতাংশ বেশি প্রস্তাব করেছিল চায়না হারবার। পরে তা কমিয়ে ৪৩ শতাংশ বাড়তি দর প্রস্তাব করা হয়। এতে দেখা যায়, ঢাকার কাঁচপুর থেকে সিলেট পর্যন্ত চার লেনে নির্মাণে সওজ ব্যয় প্রাক্কলন করছে ১০ হাজার ৯৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। আর চায়না হারবার এ ব্যয় নির্ধারণ করেছে ১৪ হাজার ৪৭০ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ চার হাজার ৩৭৫ কোটি ৫১ লাখ টাকা বেশি ব্যয় প্রস্তাব করেছে চীনের কোম্পানিটি।

দ্বিতীয় প্রস্তাবেও সওজের প্রস্তাবিত দরের সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় তৃতীয় আরেকটি প্রস্তাব দিয়েছে চায়না হারবার। এতে দেখা যায়, চার লেন নির্মাণে ১৪ হাজার ৫২৪ হাজার কোটি টাকা চায় কোম্পানিটি। আর সওজ কিছুটা বাড়িয়ে এ দর প্রস্তাব করেছে ১২ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা। তবে এখনও দুই প্রস্তাবের মধ্যে এক হাজার ৮৫৬ কোটি টাকা বা ১৪ দশমিক ৬৫ শতাংশ দর পার্থক্য রয়েছে।

নতুন প্রস্তাবে চার লেন নির্মাণে ভ্যাট ও শুল্ক নিয়ে দর কষাকষি করছে সওজ ও চায়না হারবার। এতে দেখা যায়, মূল ব্যয়ের সঙ্গে ১৩ শতাংশ ভ্যাট ও শুল্ক যোগ করে ১৪ হাজার ৫৬১ কোটি ৪০ লাখ টাকা প্রস্তাব করেছে সওজ। আর চায়না হারবার বলছে, মূল প্রস্তাবের বাইরে শুল্ক ও ভ্যাট বাবদ এক হাজার ৮৮৮ কোটি ১২ লাখ টাকা সরকারকে দিতে হবে। এতে চার লেন নির্মাণে ব্যয় পড়বে ১৬ হাজার ৪১২ কোটি ১২ লাখ টাকা।

যদিও ৪৩ শতাংশ বেশি ব্যয়েই কাজটি দেওয়ার জন্য গত মে মাসে সুপারিশ করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। অর্থমন্ত্রীকে পাঠানো চায়না হারবারের এক চিঠিতে প্রকল্পটি দ্রুত অনুমোদনে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরকে অনুরোধ করা হয়। এজন্য চায়না হারবারের পাঠানো ওই প্রস্তাবের ওপর অর্থমন্ত্রী লিখেন ‘প্লিজ রিলিজ দিস ইস্যু অ্যাট ইয়োর আর্লিয়েস্ট কনভেনিয়েন্স’।

জানতে চাইলে সওজের প্রধান প্রকৌশলী ইবনে আলম হাসান শেয়ার বিজকে বলেন, চীনের অর্থায়নে ঢাকা-সিলেট চার লেন নির্মাণে আলোচনা চলছে। নেগোশিয়েশন কমিটি কয়েক দফা বৈঠক করে তৃতীয় একটি প্রস্তাব চ‚ড়ান্ত করা হয়েছে। এর পরও দর নিয়ে কিছুটা মতবিরোধ রয়েছে। বিষয়টি সমাধানে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, ঢাকা-সিলেট চার লেন নির্মাণে জমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন ও অন্যান্য ব্যয় যুক্ত করা হয়নি। এগুলো যোগ করা হলে প্রকল্পটির মোট ব্যয় ১৯ হাজার কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় পড়বে ৮৪ কোটি টাকা। অথচ গত বছর প্রাথমিক হিসাবে এ ব্যয় ধরা হয় কিলোমিটারপ্রতি ৫৬ কোটি টাকা।

এদিকে গত বছর অনুমোদিত এলেঙ্গা-রংপুর চার লেন নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় ধরা হয়েছে ৬০ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। আর ২০১৪ সালে শুরু হওয়া জয়দেবপুর থেকে টাঙ্গাইল হয়ে এলেঙ্গা চার লেনে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হচ্ছে ৪৮ কোটি ছয় লাখ টাকা। এ হিসাবে চীনের অর্থায়নে প্রকল্পটির ব্যয় অনেক বেশি পড়বে।

প্রসঙ্গত, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে ঢাকা-সিলেট চার লেন নির্মাণে সম্ভাবতা যাচাই ও বিস্তারিত নকশা প্রণয়ন করা হয়। এতে চার লেন নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছিল ১২ হাজার ৬৬৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এর মধ্যে জমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন ব্যয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। এছাড়া পরিষেবা সংযোগ লাইন অপসারণ ও পরামর্শক ব্যয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ব্যয়ের এ চারটি অংশ বহন করবে বাংলাদেশ সরকার। আর জিটুজি ভিত্তিতে মহাসড়কটির নির্মাণ ব্যয় বহন করার কথা চীনা সরকারের। তবে ব্যয় নিয়ে সমঝোতা না হলে প্রকল্পটি ঝুলে যেতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।