তরুণ ছাত্রসমাজের অহংকার বিএনসিসি

ব্রিটিশ সরকার ১৯২০ সালে ভারতবর্ষের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে নিয়ে গঠন করে ‘ইউনিভার্সিটি কোর’। ১৯২৩ সালে ভারতীয় দেশরক্ষা বাহিনী আইন-১৯২৩ অনুসারে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘ইউনিভার্সিটি ট্রেনিং কোর বা ইউটিসি।’ ১৯২৭ সালের নভেম্বরে ক্যাপ্টেন ই. গ্রুম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৬ শিক্ষক ও ১০০ ছাত্রকে প্রথম সাহায্যকারী কোরের সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। ১৯৫০ সালে ৬২৫ ক্যাডেট ও ৪০ কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দিয়ে একে একটি ব্যাটালিয়নে উন্নীত করা হয়। ১৯৫৩ সালে ‘ইউটিসি’র কার্যক্রম পাকিস্তান সরকার নিষিদ্ধ করলেও পরবর্তীকালে ছাত্র আন্দোলনের মুখে ১৯৬৬ সালে পুনরায় এর অনুমতি দিতে বাধ্য হয়। একই সালে এর নামকরণ করা হয় ‘পিসিসি’। জুনিয়রদের জন্য গঠন করা হয় ‘জেসিসি’। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে পিসিসি ও জেসিসির ২২ ক্যাডেট শহীদ হন। স্বাধীনতার পর এ নামটি পরিবর্তন করে ‘বাংলাদেশ ক্যাডেট কোর’ নামকরণ করা হয়। ১৯৭৯ সালের ২৩ মার্চ বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি) প্রতিষ্ঠিত হয়।
তরুণ ছাত্রসমাজকে জ্ঞানার্জনের উপায় সম্পর্কে অবহিত করা, সর্বজনীন ব্যক্তিজীবনের শৃঙ্খলা ও সমাজে স্বেচ্ছাসেবকমূলক কাজের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে বিএনসিসি। এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে খুলনা রেজিমেন্টের আওতাধীন বিএনসিসির সেনা শাখার ২৪ ব্যাটালিয়ন ক্যাম্পিং (বিসি) ০৪/২০১৮ শীর্ষক এক কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়।
বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান মিলনায়তনে বিএনসিসির সপ্তাহব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মশালার ক্যাম্পিং উদ্বোধন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড.
হারুন-উর-রশীদ আসকারি। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা গঠনের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিএনসিসি সদস্যদের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। বিএনসিসি সদস্যরা সামরিক প্রশিক্ষণে প্রশিক্ষিত হয়ে শৃঙ্খলা, সময়ানুবর্তিতা, ন্যায়পরায়ণতা ও দেশপ্রেমের মাধ্যমে দেশ-জাতি গঠনে সামরিক শক্তির পাশাপাশি সহায়ক শক্তি হিসেবে দেশের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। উপাচার্য আরও বলেন, যারা বিএনসিসির সঙ্গে জড়িত, দেশের মানুষকে তাদের শৃঙ্খলা শিক্ষা দিতে হবে। দেশের আপৎকালীন সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে উপ-উপাচার্য ও ২৪ ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক লে. অধ্যাপক ড. মো. শাহিনুুর রহমান (বিটিএফও) বলেন, দেশের প্রয়োজনে তোমরা সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেদের নৈতিক চরিত্র ও নেতৃত্বের গুণাবলি অর্জন করতে পারবে।
সামরিক প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে ক্যাডেটদের দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি মমত্ববোধ এবং ভালোবাসা গড়ে তুলতে হবে। সব সময় মানুষের বিপদ-আপদে পাশে থাকতে হবে, নেতৃত্ব দিতে হবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. সেলিম তোহা বলেন, লেখাপড়ার পাশাপাশি সততা, নিষ্ঠা, একাগ্রতার সঙ্গে রাষ্ট্র ও সমাজকে সেবাদানের বিষয়ে বিএনসিসি সদস্যদের কাজের ভূমিকা অনস্বীকার্য। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সব অনুষ্ঠানে, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের সব থেকে বড় সমাবর্তনের শৃঙ্খলা রক্ষাসহ অর্পিত দায়িত্ব বিএনসিসি সদস্যরা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছে। সবার মধ্যে এ মানবিক মূল্যবোধ, মানবিকতা ও সাংস্কৃতিক বোধের উম্মেষ ঘটাতে হবে।
অনুষ্ঠানে বিএনসিসি ২৪ ব্যাটালিয়নের অ্যাডজুটেন্ট ও প্রশিক্ষক মেজর নাজমুল হক, প্রক্টর প্রফেসর ড. মো. মাহবুবর রহমান, বিএনসিসির প্রধান সমন্বয়কারী কর্মকর্তা প্রফেসর ড. মোহা. জাহাঙ্গীর হোসেনসহ বিএনসিসির অফিসার, পিইউও, টিইউও, সামরিক ও বেসামরিক প্রশিক্ষকরা উপস্থিত ছিলেন।
বিএনসিসির প্রশিক্ষণ কর্মশালায় কুষ্টিয়া, মাগুরা, রাজবাড়ী ও ফরিদপুরের ১৮ প্রতিষ্ঠান থেকে ১৭০ ক্যাডেট অংশ নেন। কর্মশালায় ড্রিল, অস্ত্র চালনা প্রশিক্ষণ, মাঠ নৈপুণ্য, শারীরিক প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্র ও রণকৌশল, সামরিক ইতিহাস, সামরিক বিজ্ঞান, মানচিত্র অধ্যয়ন, প্রাথমিক চিকিৎসা, ফায়ার সার্ভিসিং অধ্যয়নসহ নেতৃত্বের বিষয়ে শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এছাড়া ক্যাম্পে মেয়েদের জন্য হ্যান্ডবল ও ছেলেদের জন্য ভলিবল খেলার ব্যবস্থা করে ২৪ ব্যাটালিয়ন ক্যাম্প।
অনুষ্ঠানের ষষ্ঠ দিনে বিশ্ববিদ্যালয় অডিটরিয়ামে ক্যাডেটদের অংশগ্রহণে ‘তারুণ্যের উচ্ছ্বাস’ নামে একটি মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার আয়োজন করা হয়। এ সময় ক্যাম্পে অংশ নেন খুলনা রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল ইমরান আজাদ, এসইউপি, এসজিপি, জি আর্টিলারি। তিনি ক্যাডেটদের নৈতিক শিক্ষা, সুশৃঙ্খল জীবন, পড়ালেখা ও সমাজের স্বেচ্ছামূলক কাজে অংশ নেওয়া এবং দেহ-মন সুস্থ-সবল রাখার জন্য খেলাধুলার ওপর গুরুত্ব দেন।