মত-বিশ্লেষণ

তরুণ সমাজকে মাদকের ছোবল থেকে রক্ষা করতে হবে

মো. রুপাল মিয়া: মানবজীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় কিশোর ও তরুণ বয়স। এই সময়েই নির্ধারিত হয় একজন মানুষের ভবিষ্যৎ। নিজেকে যে নিয়ন্ত্রণ করে ভালো কাজের দিকে জীবনকে ধাবিত করতে পারে, তার ভবিষ্যৎ হয় উজ্জ্বল। আর যে নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়, তার জীবন নিমজ্জিত হয় অন্ধকারে। কিশোর ও তরুণরা সঙ্গদোষে হোক বা অন্য কোনো কারণে হোক, ধূমপান থেকে নেশা শুরু করলেও মাদকের প্রতি ধীরে ধীরে আসক্ত হয়ে পড়ে।
পড়ালেখার জন্য মা-বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে অনেক সময় কিশোর-তরুণরা মাদক গ্রহণ করে। এ অর্থ যখন ফুরিয়ে যায় তখন মাদক কেনার অর্থ জোগাড় করতে গিয়েই কিশোর ও তরুণরা নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। এভাবে মাদকের এই নেশার জালে একবার জড়িয়ে পড়লে কেউ আর সহজে তা ছিন্ন করে বেরিয়ে আসতে পারে না। ফলে মাদকসেবীরা দিনে দিনে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তাদের দ্বারা ঘটে নানা ধরনের অপকর্ম।
স্কুল-কলেজগামী মেয়েদের নানাভাবে উত্ত্যক্ত করা, গুলি বা ছুরিকাঘাতে হত্যা করা কিংবা সড়ক দুর্ঘটনার আধিক্যের পেছনেও মাদকাসক্তির ভূমিকা অন্যতম। শুধু তাই নয়, কোনো কোনো পত্রিকার শিরোনামে ‘নেশাগ্রস্ত যুবকের গুলিতে জোড়া খুন,’ ‘মাদকাসক্ত মেয়ের নিজ হাতে মা-বাবাকে খুন’, ‘ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় খুন হলেন মা-বাবা’ ইত্যাদি খবরের পেছনের কারণ মাদকাসক্তি। এছাড়া ‘মাদকাসক্ত দেবর খুন করল তার ভাবিকে’, ‘মাদকাসক্ত ছেলের হাত থেকে বাঁচতে মা খুন করলেন ছেলেকে’ পত্রিকায় প্রকাশিত ইত্যাদি শিরোনাম নাড়া দেয় আমাদের বিবেককে, যার মূলে রয়েছে মাদকাসক্তি। সুতরাং মাদকাসক্তরা তাদের স্বাভাবিক বিবেক বুদ্ধি, মানবিক মূল্যবোধকে হারিয়ে হয়ে ওঠে বেপরোয়া ও উচ্ছৃঙ্খল।
এটা স্পষ্ট যে, মাদকাসক্ত ব্যক্তি শুধু নিজের জীবনকেই বিপন্ন করে না, সঙ্গে সঙ্গে তার পরিবারও থাকে হুমকিতে, গোটা সমাজ হয় ক্ষতিগ্রস্ত। সমাজের নানা সমস্যার মধ্যে অন্যতম সমস্যা হচ্ছে মাদক সমস্যা। তাই এ সমস্যা থেকে মাদকাসক্ত ব্যক্তি, তার পরিবার, সমাজ তথা গোটা দেশকে রক্ষা করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ একান্ত জরুরি।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে সমাজকে মাদকমুক্ত করার প্রত্যয় নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। সমস্যার মাঝে প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘ সফলতাও রয়েছে। সম্প্র্রতি সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বিল-২০১৮’ পাস করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, মাদকের চাষাবাদ, উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বহন, পরিবহন, স্থানান্তর, অর্পণ, গ্রহণ, প্রেরণ, লেনদেন, নিলামকরণ, ধারণ, গুদামজাতকরণ, প্রদর্শন, সেবন, প্রয়োগ ব্যবহারকে অপরাধ বলে গণ্য করা হবে। এতে ইয়াবার পরিমাণ পাঁচ গ্রামের কম হলে এক থেকে পাঁচ বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায়ই তার বক্তৃতায় সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও মাদকাসক্তি থেকে যুবসমাজকে ফিরিয়ে আনতে খেলাধুলার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, যুবসমাজ আজ নানাভাবে বিপথগামী হচ্ছে। তাদের যদি আমরা খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সক্রিয় রাখতে পারি তাহলে দেশ থেকে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নির্মূল করা সহজ হবে। সেদিকে লক্ষ্য রেখেই খেলাধুলা ও সংস্কৃতিচর্চার সুযোগ সম্প্রসারিত ও অবারিত করতে হবে।
মাদক নির্মূলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের অধিকতর কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। অধিদফতরের ইনফোর্সমেন্ট শক্তিশালী করার জন্য বিভাগীয় শহর ও সিটি করপোরেশনগুলোয় র‌্যাবের মতো স্ট্রাইকিং ফোর্স সৃষ্টি করা; জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম অব্যাহত রাখার জন্য এনজিও, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং কমিউনিটি লিডারদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা; ইলেকট্রনিক এবং প্রিন্ট মিডিয়াকে আরও বেশি মাদকবিরোধী সচেতনতা সৃষ্টিতে সম্পৃক্ত করা; সীমান্ত এলাকায় মাদক পাচারে জড়িত অতি দরিদ্রদের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা এবং সেফটি নেটওয়ার্কের আওতায় আনা; মাদক মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য পৃথক আদালত গঠন করা; তরুণরা কেন মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে তার কারণ খুঁজে বের করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং মাদকের পাচাররোধে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ আরও জোরদার করাসহ মাদকদ্রব্যের অপব্যবহাররোধে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
মাদকাসক্তি একটি সামাজিক সমস্যা, একটি সামাজিক ব্যাধি, যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জঙ্গি তৎপরতা। অতএব এ সবকিছুকেই সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে নির্মূল করতে হবে। আসুন মাদকের বিরুদ্ধে আমরা সবাই এক হই। দলমত-ধর্মবর্ণ-নির্বিশেষে সবাই হাতে হাত রেখে একসঙ্গে কাজ করি।

পিআইডি প্রবন্ধ

সর্বশেষ..