তাঁতের সঙ্গে দুধেও সমৃদ্ধ সিরাজগঞ্জের অর্থনীতি

উত্তরের বিভিন্ন জেলার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আবর্তিত হচ্ছে বিভিন্ন খাত ঘিরে। এসব খাত একদিকে অবদান রাখছে জেলাগুলোর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে, অন্যদিকে কর্মসংস্থানেও ভূমিকা রাখছে। উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডভিত্তিক এসব খাত নিয়ে ধারাবাহিক আয়োজনের পঞ্চম পর্ব

নাজমুল হুসাইন: ১৯৮৪ সালে সিরাজগঞ্জ মহকুমা যখন জেলা হিসেবে স্বীকৃতি পায় তখনও এখানকার প্রধান অর্থনীতি ছিল কৃষি। কিন্তু যমুনা নদীর অদূরে জেলাটির ফসল প্রায়ই তলিয়ে যেত। এতে বিকল্প হিসেবে অধিকতর পানিসহিষ্ণু প্রচলিত রেশম চাষে জোর দেন চাষিরা। নব্বইয়ের দশকে রেশমের কল্যাণে এলাকার তাঁতশিল্প আবারও বেশ প্রসার লাভ করে।

কিন্তু সেই সুদিন দীর্ঘায়িত হয়নি। নব্বই-পরবর্তীকালে বাজার অর্থনীতি চালুর ফলে বিদেশি কাঁচা রেশম সুতা আমদানি হতে শুরু হয় দেশে। তখন সিরাজগঞ্জে উৎপাদিত রেশমগুটির দাম পড়ে যায়। এতে বাজার হারিয়ে রেশম চাষে আগ্রহ কমে চাষিদের। তখন আরেক দফা সিরাজগঞ্জের তাঁতশিল্প বিপর্যয়ের মুখে পড়ে।

পরবর্তীকালে যখন রেশমগুটির দাম কিছুটা বাড়তে থাকে তখন আবার রেশম চাষ ও তাঁতের কারবার বাড়তে থাকে। তবে এবার তাঁতশিল্পে হানা দেয় দফায় দফায় বন্যা। পরপর ১৯৯৮, ২০০৪ ও ২০০৭ সালে তিনবার প্রলয়ঙ্করী বন্যায় রেশমচাষিদের তুঁতগাছ ব্যাপকভাবে মারা যায়। রেশম চাষের জন্য পলুঘর ও পলুপালন সরঞ্জাম সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে তাঁতশিল্প সম্প্রসারণ ও বিকাশে বাধা আসে।

বারবার এমন চড়াই-উতরাইয়ের পরও সিরাজগঞ্জের মানুষ তাঁতশিল্পপাগল। দেশের উন্নত তাঁতসমৃদ্ধ জেলা এটি। ফলে জেলাটির প্রধান অর্থনীতি তাঁতের ওপর ভর করেই গড়ে উঠেছে। দেশের সার্বিক তাঁতশিল্প রুগ্ন হয়ে পড়লেও এখানে এখনও তাঁত রয়েছে প্রায় সাড়ে চার লাখ, যার মধ্যে প্রায় সাড়ে তিন লাখ হ্যান্ডলুম (হস্তচালিত) ও এক লাখ পাওয়ার লুম (বিদ্যুৎচালিত)। সিরাজগঞ্জ জেলায় তাঁতি পরিবারের সংখ্যা এখন ১৪ হাজার ৮৭০টি। প্রতিবছর এ জেলায় শুধু হস্তচালিত তাঁত থেকে ২৩ কোটি মিটারের বেশি বস্ত্র উৎপাদিত হচ্ছে। এছাড়া এ শিল্প সিরাজগঞ্জ জেলায় প্রায় তিন লাখ লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

তবে তাঁতের এসব কর্মযজ্ঞের পাশাপাশি সিরাজগঞ্জে দীর্ঘসময় ধরে বড় হয়েছে আরেক প্রাণিসম্পদ খাত, যা এখন জেলাটির দ্বিতীয় চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে সিরাজগঞ্জের এই দুগ্ধশিল্প এখন অনেক প্রসার লাভ করছে, যার সূত্রপাত হয়েছিল ১৯৭৩ সালে সমবায় প্রতিষ্ঠান মিল্ক ভিটার হাত ধরে।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে মিল্ক ভিটা সিরাজগঞ্জসহ আরও কয়েকটি প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে দুধ সংগ্রহ করে গোটা দেশে দুগ্ধ ও দুগ্ধজাত সামগ্রীর চাহিদা পূরণ করে আসছে। মিল্ক ভিটার সবচেয়ে বড় কারখানাটি সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার বাঘাবাড়িতে অবস্থিত। বর্তমানে মিল্ক ভিটার প্রায় শতকরা ৮০ ভাগ দুধ শাহজাদপুরের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকদের দুগ্ধ খামার থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে। ফলে ওই এলাকা ঘিরে এখন আট হাজার ৪৬৮টি দুগ্ধ খামার গড়ে উঠেছে, যা দেশের অন্য যে কোনো জেলার তুলনায় সর্বোচ্চ। মিল্ক ভিটা দুধ উৎপাদনকারী সমবায়ীর সংখ্যা দুই হাজার ৪০০। এসব সমবায়ের সঙ্গে যুক্ত আছেন এক লাখ ২৪ হাজার মানুষ, যার অধিকাংশ সিরাজগঞ্জ জেলার।

সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট আবু ইউসুফ সূর্য শেয়ার বিজকে বলেন, নিঃসন্দেহে সিরাজগঞ্জে তাঁতের পরে দুগ্ধশিল্প জেলার অর্থনীতিতে বড় অবদান রেখেছে। জেলায় প্রায় পাঁচ থেকে ছয় হাজার কোটি টাকার দুগ্ধশিল্পের বাজার গড়ে উঠেছে।

তিনি বলেন, দুগ্ধশিল্পের কারণে সরকারি এবং প্রচুর বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সিরাজগঞ্জে শিল্পকারখানা গড়ে তুলেছে। এই খাতে বিনিয়োগ ক্রমেই বাড়ছে। ফলে জেলার দুগ্ধশিল্প দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, যা এখন নতুন বৃহৎ সম্ভাবনার আলো।

বাঘাবাড়ি মিল্ক ভিটা সূত্র জানায়, তাদের আওতায় ৭১৩টি প্রাথমিক দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতি রয়েছে। এসব সমিতিতে প্রতিদিন আড়াই থেকে তিন লাখ লিটার দুধ উৎপাদিত হয়ে থাকে, যা মোট মিল্ক ভিটার সংগ্রহের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ।

শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠান নয় জেলা প্রাণিসম্পদ সূত্রে জানা গেছে, ওই এলাকা থেকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্রাণ প্রতিদিন প্রায় ৫০ হাজার থেকে এক লাখ লিটার, ব্র্যাক ২৫ থেকে ৫০ হাজার লিটার, আকিজ পাঁচ থেকে ১০ হাজার লিটারসহ আড়ং, অ্যামুমিল্ক, আফতাব, বিক্রমপুর ডেইরি ও কোয়ালিটি ডেইরি প্রতিদিন হাজার হাজার লিটার দুধ সংগ্রহ করছে। এসব প্রতিষ্ঠান ওই এলাকায় গড়ে তুলেছে দুগ্ধ প্রক্রিয়াকরণ কারখানা, সংগ্রহ কেন্দ্রসহ অনেক প্রতিষ্ঠান, যেখানে এলাকার হাজার হাজার মানুষ কাজ করছে।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, পার্শ্ববর্তী পাবনা জেলার কিছু এলাকাসহ সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর ও উল্লাপাড়া উপজেলা নিয়ে দেশের প্রধান দুগ্ধ উৎপাদনকারী ও গরু পালনকারী দুগ্ধ শিল্প এলাকা গড়ে উঠেছে। লাভজনক হওয়ায় এ এলাকায় প্রায় সবাই গরুর খামার করে জীবিকানির্বাহ করছেন। এ আগ্রহী মানুষের সংখ্যা আরও বেড়েই চলেছে।

ওই এলাকায় খামারগুলোতে চরে জš§ানো প্রচুর কাঁচা ঘাস গবাদিপশুর প্রধান খাদ্য। ফলে গরু পালনের খরচ কম। উপরন্তু এসব কাঁচা ঘাস বেশি খাওয়ার জন্য গাভীগুলো দুধও দেয় বেশি। ওইসব এলাকায় চরগুলোর একটির সঙ্গে আরেকটির দূরত্ব ১৫ থেকে ৩৫ কিলোমিটার। এসব চরে বসবাসকারীর সংখ্যা প্রায় ৮০ হাজার বলে জানান এলাকাবাসী।

এখানে প্রায় বাড়িতেই রয়েছে গরুর ছোট ছোট খামার। সকাল ও বিকালবেলা দুই দফা এসব গরুর দুধ দোহন করে সমবায়ের মাধ্যমে বিশেষ ধরনের পাত্রে ভরে শাহাজাদপুর উপজেলা সদরের মিল্ক ভিটাসহ অন্যান্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বিক্রি করা হয়। দুধের কল্যাণে একসময় অবহেলিত চর এলাকাগুলো হয়ে উঠেছে শিল্পসমৃদ্ধ।