প্রচ্ছদ শেষ পাতা

তারল্য আটকা চার খাতে সংকটে ভুগছে ব্যাংক ও পুঁজিবাজার

শেখ আবু তালেব: ব্যাংক ও পুঁজিবাজারে তারল্যপ্রবাহ কমে যাচ্ছে। আস্থার সংকটে পুঁজিবাজার থেকে বিনিয়োগ সরিয়ে নিচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। সঞ্চয়পত্রের সুদহার বেশি হওয়ায় গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বিনিয়োগ হয়েছে এ খাতে। এর বাইরে খেলাপি ঋণ, অফশোর ইউনিটের ঋণের বিপরীতে বিধিবদ্ধ জমা ও ডলার কেনায় ব্যাংকগুলোর নগদ অর্থ আটকে গেছে। এর ফলে অর্থবছরের গত আট মাসে ব্যাংকের বিনিয়োগযোগ্য অতিরিক্ত তারল্য কমেছে অর্ধেকের বেশি। বিশ্লেষকদের মতে, আর্থিক খাতগুলোর মধ্যে সুদহার সমন্বয় করা প্রয়োজন, নইলে বিশৃঙ্খলা আরও বৃদ্ধি পাবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরে (২০১৮-১৯) জাতীয় সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৬ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা। কিন্তু চলতি অর্থবছরের গত আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) খাতটি থেকে সরকার ঋণ নিয়েছে ৩৫ হাজার ৬০২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। অপরদিকে ব্যাংক খাত থেকে নিয়েছে মাত্র ১০ হাজার ৮০ কোটি টাকা। ব্যাংকের চেয়ে সুদহার বেশি হওয়ায় এ খাতে ঝুঁকছেন আমানতকারীরা।
আমদানি বাণিজ্য বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যাংকগুলো ডলার সংকটে ভুগছে। ব্যাংকগুলোর কাছে চলতি বছরে প্রায় ২০০ কোটি ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর বিপরীতে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়েছে ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে। ফলে ব্যাংকের নগদ অর্থের পরিমাণ কমে গেছে।
ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, আগের নিয়মে ব্যাংকগুলো অফশোর ইউনিট থেকে ঋণ দিলেও তার বিপরীতে সিআরআর ও এসএলআর বাবদ অর্থ জমা রাখতে হতো না। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, এখন থেকে প্রয়োজনীয় বিধিবদ্ধ জমা সংরক্ষণ করতে হবে। এতেও ব্যাংকের কিছু অর্থ আটকে যাবে। ফলে এ খাত দিয়েও ব্যাংকের বিনিয়োগ সক্ষমতা কমে যাবে।
অপরদিকে বর্তমানে খেলাপি ঋণের উচ্চহার ব্যাংক খাতে ক্যানসারের মতো দাঁড়িয়েছে। গত ডিসেম্বর শেষে খেলাপির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৯ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। এর বাইরে অবলোপন করা হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া পুনঃতফসিল করা হয়েছে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার ঋণ। সব মিলিয়ে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা আটকে আছে একশ্রেণির ব্যবসায়ীদের হাতে। এসব ঋণের মধ্যে মন্দ ঋণের বিপরীতে শতভাগ নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে হয়েছে বার্ষিক আয় থেকে। এভাবেও কমছে বিনিয়োগযোগ্য অর্থের পরিমাণ।
এভাবে অর্থ বিভিন্ন খাতে আটকে যাওয়ায় ব্যাংকের বিনিয়োগ সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। ২০১৮ সালে ব্যাংক খাতে তরল সম্পদ বা তারল্যর পরিমাণ ছিল দুই লাখ ৬৪ হাজার ২৬৭ কোটি টাকা। আট মাস পরে তা দাঁড়িয়েছে দুই লাখ ৪৭ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা। আট মাসে তারল্য কমেছে ১৭ হাজার ১১৮ কোটি টাকা বা ছয় দশমিক ৪৮ শতাংশ। গত ফেব্রুয়ারি শেষে ব্যাংক খাতে সর্বনিন্ম তরল সম্পদ সংরক্ষণের প্রয়োজন ছিল এক লাখ ৮৩ হাজার ২২৬ কোটি টাকা।
এর ফলে ২০১৮ সালের জুলাই মাসে ব্যাংকগুলোর হাতে বিনিয়োগযোগ্য অতিরিক্ত নগদ অর্থের পরিমাণ ছিল ১২ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা। এই সময়ে প্রবৃদ্ধি ছিল চার শতাংশ। গত ফেব্রুয়ারি মাসে তা নেমেছে ছয় হাজার ৩৯৯ কোটি টাকায়। এই সাত মাসে কমেছে পাঁচ হাজার ৯৩৯ কোটি টাকা। প্রবৃদ্ধি নেমেছে দুই দশমিক ৫৯ শতাংশে।
এ সংকটে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো উচ্চসুদে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে বিশেষ রেপোতে অর্থ ধার নিচ্ছে। ফলে কলমানি ও আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে সুদহার বৃদ্ধি পেয়েছে। গত মাসে আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজার ইন্টার ব্যাংক রেপোতে ধার নেওয়ার পরিমাণ ও সংখ্যা দুটোই বৃদ্ধি পেয়ছে। এর পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে রেপো ও স্পেশাল রেপোর মাধ্যমে অর্থ নেওয়ার পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
শুধু ৯ শতাংশ সুদে স্পেশাল রেপোতে ব্যাংকগুলো সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকার বেশি ধার নিয়েছে। কিন্তু এক বছর আগে এই মাসটিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে রেপো ও বিশেষ রেপোর মধ্যমে কোনো ধার নেয়নি ব্যাংকগুলো। ইন্টার ব্যাংক রেপোতে ধার নেওয়া হলেও সুদের হার ছিল সর্বোচ্চ পাঁচ দশমিক ২৭ শতাংশ, যদিও মাসের শেষের দিকে তা দুই শতাংশে নেমে আসে।
তথ্য বলছে, ব্যাংক খাতে মার্চ শেষে আমানত দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ২৩ হাজার ২০৬ কোটি টাকা, এক বছর আগে যা ছিল ৯ লাখ ২৫ হাজার ২৭৯ কোটি টাকা। এ সময়ে আমানত প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ দশমিক ৫৮ শতাংশ। অপরদিকে মার্চ শেষে ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১১ লাখ ৫৮ হাজার ৯৬৫ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক ৯১ শতাংশ। তথ্য বলছে, ব্যাংক খাতে এখনও আমানত সংগ্রহের প্রবৃদ্ধির চেয়ে ঋণের প্রবৃদ্ধি অনেক বেশি।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেসরকারি ব্যাংকের শীর্ষ এক কর্মকর্তা বলেন, কয়েকটি ব্যাংকের আগ্রাসী ব্যাংকিংয়ের কারণে সামগ্রিকভাবে ঋণ-আমানত অনুপাত বেশি। ফারমার্স (বর্তমানে পদ্মা) ব্যাংকের কেলেঙ্কারির ঘটনায় আমানতকারীরা ব্যাংকের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলছেন। এজন্য সঞ্চয়পত্র জনপ্রিয় হচ্ছে। আগেও সঞ্চয়পত্রের চেয়ে ব্যাংক আমানতের সুদহার কম ছিল। তারপরও ব্যাংকগুলো আমানত পেত, কিন্তু এখন পাচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে আর্থিক খাতে সুদ হারের সমন্বয় নেই। পুঁজিবাজারেও আস্থার সংকট চলায় সেখানেও বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছেন না কেউ। নিরাপদ ও সুদহার বেশি হওয়ায় সবাই ছুটছেন সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে। ব্যাংক ও পুঁজিবাজারে অর্থের প্রবাহ কমে গেছে। এজন্য প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পরও ব্যাংকগুলো সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনতে পারছে না।
ব্যাংকের সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনতে উদ্যোগ নেওয়া ব্যাংকগুলো পর্যন্ত ১০ শতাংশের বেশি সুদে আমানত সংগ্রহ করছে, কিন্তু কাক্সিক্ষত আমানত পাওয়া যাচ্ছে না। বিশ্লেষকরা বলছেন, আর্থিক খাতের সুদহার একেক জায়গায় একেক রকম। একটিতে বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে অন্যগুলোতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে বিষয়টি আলোচনা হয়েছে। তখন বলা হয়েছিল, সুদহারের ব্যবধান অর্থনীতিতে ভারসাম্যহীনতা তৈরি করবে। মুদ্রানীতি ও সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনা চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়বে। তারল্য সংকট কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজন সব নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে আন্তঃসমন্বয়। এক্ষেত্রে সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে।

সর্বশেষ..