তালগাছে ভরে উঠুক হাওরাঞ্চল

জাকারিয়া চৌধুরী: মার্চ থেকে মে এই তিন মাসে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয় কোথায়? এ প্রশ্নে হয়তো অনেকের কাছেই অবাক লাগবে। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা ও মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্যমতে, বছরের এ সময়ে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয় বাংলাদেশের সুনামগঞ্জে। স্যাটেলাইট থেকে নেওয়া ১০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে এটি জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। ওই প্রতিবেদনে আরও জানা যায়, এশিয়ার বজ্রপাতপ্রবণ এলাকার মধ্যে বাংলাদেশের নোয়াখালীর অবস্থান পঞ্চম। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, বছরের এ সময়ে সুনামগঞ্জে প্রতি বর্গকিলোমিটার এলাকায় গড়ে ২৫টিরও বেশি বজ্রপাত আঘাত হানে। আবহাওয়াবিদদের মতে, বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল প্রকৃতিগতভাবে বজ্রপাতপ্রবণ। ভারতের খাসি ও মেঘালয় পাহাড়ে মার্চ থেকে মে মাসজুড়ে জমে থাকে প্রচুর মেঘ। এ স্তরীভূত মেঘে মেঘে ঘর্ষণের ফলে সৃষ্টি হয় বজ্রপাত। বাংলাদেশের সুনামগঞ্জ জেলা ওই পাহাড়ের পাদদেশে বলে ওখানে বজ্রপাতও হয় বেশি।

বাস্তবতা হলো, সাম্প্রতিককালে এ অঞ্চলে বজ্রপাত বাড়ছে। এতে মানুষের পাশাপাশি বাড়ছে পশুসম্পদের প্রাণহানি। অভিজ্ঞতায় দেখেছি, বজ্রপাত কখনও কখনও হয় অবিরতভাবে। ঠিক আতশবাজি ফোটানোর মতো। শব্দ এত বিকট হয় যে, মনে ভীতি ঢোকে। বজ্রপাত সাধারণত রাতেই হয় বেশি। প্রকট শব্দে মানুষের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। বিশেষত যারা কাঁচা ঘরে বাস করে, রাতে তাদের পক্ষে ঘুমানো কঠিন হয়ে পড়ে এ সময়। হাওরে চারণভূমির অভাব নেই। শীতকালে চারদিকে তাকালে চোখে পড়বে বিস্তীর্ণ মাঠ। দিগন্তজোড়া সবুজ। তাই এ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে গরু-ছাগল-ভেড়ার মতো পশুপালনের প্রবণতা বেশি। এগুলো দিনে সাধারণত বিচরণ করে চারণভূমিতে। এ সময় যদি সংশ্লিষ্ট এলাকায় বজ্রপাত ঘটে, তাহলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ওইসব পশু মারা যায়। হাওরাঞ্চলে বজ্রপাতে শত শত পশুর প্রাণহানির খবরও এখন সংবাদমাধ্যমে আসে। এতে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় মানুষ। তাই এ সময় অনেককে দেখা যায় অপেক্ষাকৃত কম দামে পশু বেচে দিতে। এ কারণেও কিন্তু প্রতিবছর অনেক কৃষককে গুনতে হয় বড় অঙ্কের ক্ষতি।

এ প্রতিকূলতা মোকাবিলার মতো উপায় হাওরের কৃষকের কাছে নেই। কারণ বজ্রপাত একধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এটি যদি ওই এলাকায় কমানো না যায়, তাহলে তাদের এ দুর্দশার শিগগির অবসান হবে বলে মনে হয় না। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, বজ্রপাতে যারা প্রাণ হারায় তারা সাধারণত কর্মঠ পুরুষ। বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেখা গেছে বজ্রপাতে যারা মারা যায়, তাদের সিংহভাগই পরিবারের আয়ক্ষম ব্যক্তি। তাদের ওপর নির্ভরশীল থাকে পরিবার। মাঠে কাজের সময়Ñনৌকা চালানো কিংবা অন্য কোনো কারণে বাইরে থাকায় তাদের প্রাণহানি ঘটে। এতে তার পরিবার পড়ে বড় বিপদে। আয়কর্তাকে হারিয়ে পথেও বসতে হয় কোনো কোনো পরিবারকে।

এ দুর্যোগ কীভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব? অনেকের মতে, বড় আকারের গাছ লাগিয়ে বজ্রপাতের হার কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব। হ্রাস করা সম্ভব মানুষ ও গবাদিপশুর প্রাণহানি। হাওরাঞ্চলে এ ধরনের গাছ সংখ্যায় কম বলে ওখানে বজ্রপাতও হয় বেশি। এ তথ্য যে কিছুটা হলেও ঠিক, তাতে সন্দেহ নেই। কারণ দেশের যেসব এলাকায় বড় আকারের গাছ বেশি, সেসব স্থানে বজ্রপাতের প্রবণতা কম। এজন্য হাওরাঞ্চলে বজ্রপাত কমাতে হলে ওখানেও বড় গাছ লাগাতে হবে বেশি বেশি।

সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা যায়, বজ্রপাত কমাতে দেশের বিভিন্ন স্থানে দশ লাখ তালগাছ লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এটিকে বেছে নেওয়ার অন্যতম কারণ, এ গাছ বজ্রপাত-নিরোধী; আবার এর ফল ও রস বিক্রি করে আয় করা যেতে পারে। তালগাছের কাঠ ব্যবহার করা যায় জ্বালানি এবং নৌকা ও ঘর তৈরির উপাদান হিসেবে। জানা যাচ্ছে, এ লক্ষ্যে তালবীজ ও চারা বিতরণ করা হচ্ছে সরকারিভাবে। কোথাও কোথাও তরুণরা এগিয়ে এসেছে স্বেচ্ছায়। বাড়ির আশপাশে ও পথের ধারে তারা তালের চারা রোপণ করছে সারিবদ্ধভাবে। পথের দুপাশে সারিবদ্ধ তালগাছের দৃশ্য যে মোহনীয়, তাও বলার অপেক্ষা রাখে না।

তরুণদের স্ব উদ্যোগে তালগাছ লাগানোর যে ঘটনা উল্লেখ করলাম, সেটা সম্প্রতি লক্ষ করা গেছে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের একটি জেলায়। ওই এলাকায় বজ্রপাত এখনও এত বেশি হয়নি। তারপরও সচেতনতা থেকে এগিয়ে এসেছে তরুণরা। হাওরাঞ্চলের যেসব এলাকা বজ্রপাতপ্রবণ হিসেবে পরিচিত, সেখানে এখনও এমন উদ্যোগ দেখা যায়নি। ওই এলাকার তরুণরা যদি একইভাবে এগিয়ে আসে, তাহলে সরকারের উদ্যোগটি সহজে বাস্তবায়ন সম্ভব হবে। তালগাছ লাগিয়ে বজ্রপাত মোকাবিলায় থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে যেভাবে সফলতা পাওয়া গেছে, একই সফলতা এখানেও আসবে বলে আশা করা যায়।

প্রশ্ন হলো, বজ্রপাতের মতো দুর্যোগ দেশে সাম্প্রতিককালে যেমন বড় আকারে দেখা দিয়েছেÑসারা দেশে মাত্র দশ লাখ তালগাছের চারা রোপণ করেই এর মোকাবিলা সম্ভব? এর উত্তর বিশেষজ্ঞরা ভালো দিতে পারবেন। তবে ধারণা করা যায়, সরকারের উদ্যোগটি প্রতীকী। এটা নেওয়া হয়েছে মানুষকে এ কাজে উদ্বুদ্ধ করার জন্য। এখন কেউ যদি ধারণা করেন, সরকারিভাবে দশ লাখ তালগাছের চারা রোপণ করলেই এ দুর্যোগ মোকাবিলা সম্ভব হবে, সেটা ভুল ধারণা। এর প্রকৃত দায়িত্ব নিতে হবে স্থানীয়দের। তারা যদি সরকারের উদ্যোগে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজ বাড়ির আশপাশ ও রাস্তায় এ গাছের চারা রোপণ শুরু করেন, তাহলেই সম্ভব হবে বজ্রপাতের মতো দুর্যোগ মোকাবিলা। এও মনে রাখতে হবে, তালচারা রোপণ করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। সেটা হবে দায়িত্বের প্রকৃত শুরু। প্রতিটি চারাকে গাছে এবং শেষ পর্যন্ত বজ্রপাত-প্রতিরোধী সাইজে পরিণত করতে পরিচর্যা করতে হবে পর্যাপ্ত। এ দায়িত্বও যদি আমরা সরকারের ওপর বর্তাই, তাহলে কাজটা অনেক কঠিন হবে। দশে মিলে এক্ষেত্রে এগিয়ে এলে আমাদের চারদিক যেমন সবুজে ভরে উঠবে, তেমন দুর্যোগ থেকেও রেহাই পাব।

হাওরাঞ্চলে যেহেতু বজ্রপাত বেশি হয়, তাই সেখানে এ গাছের চারাও রোপণ করতে হবে বেশি। দেশের হাওরাঞ্চল বিশেষত সুনামগঞ্জ এলাকায় এ গাছ কিন্তু খুব একটা চোখে পড়ে না। তাহলে স্থানীয়রা এত চারা পাবেন কোথায়? এ চিন্তা করতে হবে স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে। দেশের যে অঞ্চলে তালগাছ বেশি হয়, সেখান থেকে চারা আনা যেতে পারে। স্থানীয় নার্সারিগুলো যাতে এ ফলের চারা উৎপাদনে উৎসাহী হয়, সে লক্ষ্যেও তাদের জোগানো যেতে পারে সহায়তা। সর্বোপরি হাওরাঞ্চলের মানুষ যাতে এ ফলের গাছ রোপণে উৎসাহী হয়, সেজন্য তাদের সচেতন করতে নিতে হবে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ। হাওরাঞ্চল যদি তালগাছে ভরে ওঠে, তাহলে এখন নিত্যদিন ওখানকার মানুষকে যেসব ক্ষতি মেনে নিতে হচ্ছে, তাও হয়তো কমানো যাবে। ওই অঞ্চলের মানুষকে বোঝাতে হবে, তালগাছসহ অন্যান্য উঁচু বৃক্ষের চারা তাদের রোপণ ও তাকে পরিচর্যা করে বাড়িয়ে তুলতে হবে নিজেদের স্বার্থেই।

 

বেসরকারি খাতে কর্মরত