তালিকাচ্যুতি আতঙ্কে অস্থির পুঁজিবাজার

মুস্তাফিজুর রহমান নাহিদ: তালিকাচ্যুতির আতঙ্কে অনেকটাই অস্থির পুঁজিবাজার। রহিমা ফুড ও মডার্ন ডায়িংয়ের তালিকাচ্যুতির পর পুঁজিবাজারে এই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠান উৎপাদনে নেই, সেগুলোর শেয়ার নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। যে কোনো সময় এসব কোম্পানি তালিকাচ্যুত হয়ে যেতে পারে এই আতঙ্কে তারা কম দরে শেয়ার বিক্রি করে পুঁজি ফেরত নিতে মরিয়ে হয়ে উঠেছেন। যে কারণে গতকাল দিনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এসব শেয়ারের ক্রেতার চেয়ে বিক্রেতা বেশি ছিল। যার জেরে কমে গেছে এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, বর্তমানে তালিকাভুক্ত থেকেও উৎপাদনে নেই বেশ কিছু কোম্পানি। এমারেল্ড অয়েল, বিচ হ্যাচারি, ইউনাইটেড এয়ার, তুংহাই নিটিং, মেঘনা পিইটি ইন্ডাস্ট্রিজ, মেঘনা কনডেন্সড মিল্ক, বিডি ওয়েলডিং, জুট স্পিনার্স, সমতা লেদার, সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলসহ আরও কিছু প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন নেই।
গত বৃহস্পতিবার লেনদেনের শুরু থেকে এসব কোম্পানির সেল প্রেশার লক্ষ করা যায়। ফলে প্রথম থেকেই এসব শেয়ারদর কমতে থাকে। দিন শেষে লেনদেনে সমতা লেদার, জুট স্পিনার্স ও এমারেল্ড অয়েলের ১০ শতাংশ শেয়ারদর কমে যায়। এছাড়া বিচ হ্যাচারির ৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ, মেঘনা কনডেন্সড মিল্কের ৯ দশমিক ৮৩ শতাংশ, দুলামিয়া, মেঘনা পিইটি ইন্ডাস্ট্রিজের ৯ দশমিক ৭২ শতাংশ, ইউনাইটেড এয়ারের ৯ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ, সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলের দশমিক ৪৮ শতাংশ ও তুংহাই নিটিংয়ের চার দশমিক ৩৫ শতাংশ শেয়ারদর কমেছে।
এদিকে সম্প্রতি রহিমা ফুড ও মডার্ন ডায়িংয়ের তালিকাচ্যুতির খবরকে স্বাগত জানিয়েছেন বাজার-সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, এ ধরনের উদ্যোগ পুঁজিবাজারের জন্য ভালো। এতে ছোট ছোট কোম্পানি ও উৎপাদনে না থাকা কোম্পানি ঘিরে যেসব কারসাজির ঘটনা ঘটে, তা বন্ধ হবে।
এ প্রসঙ্গে ডিএসইর সাবেক প্রেসিডেন্ট রকিবুর রহমান বলেন, এটি একটি ভালো সিদ্ধান্ত, যা পুঁজিবাজারের জন্য ইতিবাচক। যেসব কোম্পানির উৎপাদন নেই কিংবা স্বল্প মূলধনি, সেসব প্রতিষ্ঠান থেকে বিনিয়োগকারীরা বেশি প্রতারিত হন। কারণ এসব কোম্পানিতে কারসাজির ঘটনা ঘটে বেশি। ডিএসইর এ সিদ্ধান্তের ফলে কারসাজিকারীদের দৌরাত্ম্য কমবে।
একই প্রসঙ্গে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, এটি একটি সঠিক সিদ্ধান্ত। তবে এটি আরও অনেক আগে করা উচিত ছিল। একটি কোম্পানি ২০১০ সাল থেকে বন্ধ রয়েছে অথচ এটা করা হয়েছে ২০১৮ সালে। কোম্পানি দুটির তালিকাচ্যুত হওয়া উচিত ছিল আরও অনেক আগে।
জানা যায়, ১৯৯৭ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত রহিমা ফুড কোম্পানির উৎপাদন বন্ধ রয়েছে ২০১৩ সালের ১৩ জুন থেকে। ২০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনের কোম্পানিটির কাছে ভবিষ্যতে উৎপাদন শুরু হওয়ার মতো কোনো সম্ভাবনা নেই। তবে কোম্পানিটির শেয়ারদর রয়েছে আকাশচুম্বী অবস্থায়। শেষ দিনে ১০ টাকা দরের এ শেয়ার লেনদেন হয় ১৭৪ টাকা ৭০ পয়সায়।
অন্যদিকে মডার্ন ডায়িং অ্যান্ড স্ক্রিন প্রিন্টিং কোম্পানির ২০১০ সালের ৩১ জানুয়ারি থেকে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। প্লান্ট, শ্রমিক ও গ্যাস সমস্যা এবং মেশিনের কার্যকারিতা অনেক কম হওয়ায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। যাতে ওই বছরের ৩ আগস্ট বিশেষ সাধারণ সভায় (ইজিএম) শেয়ারহোল্ডারদের সম্মতিক্রমে ফ্যাক্টরির জায়গা দীর্ঘ মেয়াদে গোডাউনের জন্য ভাড়া দেওয়া হয়েছে। তারপরও বছরজুড়ে বাড়ছে এ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর। বর্তমানে এ শেয়ারের দর অবস্থান করছে ৩২৬ টাকা ৩০ পয়সায়।
১৯৮৮ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত মডার্ন ডায়িংয়ের পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ মাত্র এক কোটি ৩৬ লাখ ৮০ হাজার টাকা।
এদিকে হঠাৎ তালিকাচ্যুত হওয়ায় এ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার নিয়ে বিপাকে পড়েছেন বিনিয়োগকারীরা। ভুক্তভোগীরা বলছেন, আমাদের কথা না ভেবেই ডিএসই হঠাৎ এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা সঠিক নয়। কারণ এখানে আমাদের লাখ লাখ টাকা আটকে রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে আবুল হোসন নামে এক বিনিয়োগকারী বলেন, আমাদের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে বিষয়টি আগে জানানো উচিত ছিল। তাহলে আমরা এ প্রতিষ্ঠান থেকে বের হওয়ার সুযোগ পেতাম। ডিএসই কর্তৃপক্ষের কাছে আমরা এমনটি আশা করিনি।
অন্যদিকে বিষয়টি নিয়ে কথা বললে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএসইর একজন পরিচালক বলেন, তালিকাচ্যুতির আগে জানানো হলেও এ প্রতিষ্ঠান থেকে বের হতে পারতেন না বিনিয়োগকারীরা। কারণ তালিকাচ্যুতি হতে পারেÑএমন খবর জানতে পারলে এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের ক্রেতা পাওয়া যেত না। আমরা যেটা করেছি, তা ঠিকই করেছি। এ ধরনের কোম্পানি নিয়ে কারসাজি রোধে অনেক আগেই এমনটি করা উচিত ছিল।