তালেবানরা কি আবারও ক্ষমতায় ফিরছে?

সোহেল রানা: প্রতিবেশী আফগানিস্তানের কমিউনিস্ট সরকারকে ক্ষমতায় রাখতে দেশটিতে ১৯৭৯  সালে সেনা পাঠিয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। কিন্তু তাতে রুশ সমর্থনপুষ্ট সরকারকে রক্ষা করা যায়নি। আফগান মুজাহিদরা যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের সরবরাহ করা অস্ত্রে সোভিয়েত সেনাদের তাড়িয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এ মুজাহিদরাই আবার কোন্দলে জড়িয়ে বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ হয়ে পড়ল, তাদেরই একটা অংশ ‘তালেবান’ নামে আত্মপ্রকাশ করল।

দখলদার সোভিয়েত বাহিনীকে পরাস্ত করার পর চরম গোলযোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে আফগান ভূখণ্ডে তালেবান যোদ্ধাদের উত্থান ঘটেছিল। দেশটির মাদ্রাসা শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিয়ে গঠিত হয়েছিল এ বাহিনী। ‘তালেব’ কথাটির অর্থ শিক্ষার্থী, যার বহুবচন ‘তালেবান’। শুরুর দিকে তালেবানদের স্বাগত জানিয়েছিল আফগানিস্তানের জনগণ কারণ টানা যুদ্ধবিগ্রহ আর চরম অস্থিতিশীলতায় ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল, ঝিমিয়ে পড়েছিল দেশটির প্রশাসনযন্ত্র, অর্থনীতি সবকিছুই। এ সুযোগে দক্ষিণ-পশ্চিম আফগানিস্তান থেকে শুরু হওয়া তালেবান সংগ্রাম ক্রমেই বিস্তার লাভ করতে থাকে। এক পর্যায়ে বড় ধরনের সফলতা আসে। ১৯৯৬ সালে প্রেসিডেন্ট বুরহানুদ্দিন রব্বানির সরকারকে উৎখাত করে রাজধানী কাবুল দখল করে তালেবান যোদ্ধারা। তালেবানের উত্থানে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা থাকলেও তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দেয়নি দেশটি। পাকিস্তান আর তাদের দুই মিত্র সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বীকৃতি নিয়েই টানা পাঁচ বছর আফগানিস্তান শাসন করে তালেবানরা।

২০০১ সালে টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলার জেরে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত সামরিক জোট ন্যাটো আফগানিস্তানে বিমান ও স্থল হামলা চালালে ক্ষমতাচ্যুত হয় তালেবানরা। তাদের বেশিরভাগই নেতাই পালিয়ে বেড়াতে থাকেন, নেতাদের বড় একটা অংশের আশ্রয় হয় পাকিস্তানে। সেখানেও শুরু হয় তালেবানি কার্যক্রম। সে থেকে সীমান্তবর্তী পাকিস্তানের ওয়াজিরিস্তান পরিণত হয় এক আতঙ্কের জনপদে। পাকিস্তানে শুরু হয় সিরিজ বোমা হামলা। তালেবানবিরোধী পশ্চিমা লড়াই পাকিস্তানকে এক অস্থিতিশীল রাষ্ট্রে পরিণত করে। তাই একসময়ের মিত্র তালেবানদের বিরুদ্ধে মার্কিন হামলায় সহায়তার ফলাফল নিয়ে তৃপ্ত হতে পারেনি পাকিস্তান। তালেবান থেকে মুখ ফেরানোর ঘটনায় অনুতপ্ত পাকিস্তান আবারও তালেবানদের উত্থানে পরিকল্পনা সাজাচ্ছে, এমন আশঙ্কা যুক্তরাষ্ট্রের। এর জের ধরেই পাকিস্তানে আর্থিক সাহায্য বন্ধের ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

এদিকে গত ৩০ জানুয়ারি ব্রিটিশ সংবাদ সংস্থা বিবিসি এক জরিপের তথ্য প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, আফগানিস্তানের ৭০ শতাংশ এলাকায় তালেবানরা সক্রিয়। এর এক-চতুর্থাংশ এলাকার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণই তাদের হাতে। আফগান সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে মাত্র ৩০ শতাংশ এলাকা। তবে এখানেও তালেবানের হামলার ঘটনা ঘটেছে।

গবেষণাটিতে দেশটির ৩০টি জেলায় জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের উপস্থিতির তথ্য প্রকাশ করা হলেও কোনো এলাকায়ই তাদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই। এর আগে ন্যাটো এক বিবৃতিতে দাবি করেছিল ২০১৭ সালের অক্টোবর পর্যন্ত আফগানিস্তানের মাত্র ৪৪ শতাংশ এলাকায় তালেবানের উপস্থিতি ছিল। নতুন প্রতিবেদন তালেবান পুনরুত্থানের আশঙ্কা বাড়িয়েছে। এমনিতেই আশরাফ ঘানির সরকার তালেবান আতঙ্কে সময় পার করছেন। সম্প্রতি তালেবানরা সরকারের একটি আলোচনার প্রস্তাবও ফিরিয়ে দিয়েছে।

এবার আবারও অতীতে ফেরা যাক। ১৯৭৮ থেকে ১৯৯২-এর মধ্যবর্তী সময়ে আফগানদের সঙ্গে মিলে স্থানীয় পশতুন যোদ্ধারা রুশ সেনাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। পরবর্তী সময়ে এ পশতুনরাই তালেবান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল। ১৯৯২ থেকে ৯৬ সালের মধ্যবর্তী সময়ে আফগানিস্তানে চলে গৃহযুদ্ধ। পাকিস্তানের সহায়তায় তখন ক্ষমতার কাছাকাছি পৌঁছে যায় পাকিস্তান।

২০০১ সালে তালেবানদের উৎখাত করে বসানো হয় নতুন সরকার। পুতুল সরকারের প্রধান করা হয় হামিদ কারজাইকে। বর্তমানে আফগানিস্তানে আশরাফ ঘানির যে সরকার রয়েছে তারা পাকিস্তানের পরিবর্তে ভারতকেই গুরুত্ব দিচ্ছে বেশি; এতে বেজায় ক্ষুব্ধ এক সময়কার মিত্র প্রতিবেশী পাকিস্তান। এবার পাকিস্তান সত্যিই যদি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করে, প্রত্যক্ষভাবে তালেবানদের রসদ জোগায় তাহলে ইরান-ভারতের প্রতিশ্রুতি আর ন্যাটো বাহিনীর উপস্থিতি তাদের কতটা ঠেকাতে পারবে, সেটিই প্রশ্ন।

পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে তালেবান যোদ্ধারা আফগানিস্তানে ক্ষমতাসীন ছিল। কিন্তু এ সময়ে পাকিস্তানসহ মাত্র তিনটি দেশ তাদের স্বীকৃত দিয়েছিল। ইরান, ভারত, তুরস্ক, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্য এশিয়ার অধিকাংশ দেশ তালেবান শাসনের বিরোধিতা করেছিল এবং তালেবানবিরোধী জোট আফগান নর্দান অ্যালায়েন্সকে সাহায্য করেছিল।

আফগানিস্তানে তালেবান উত্থানের একটা পটভূমি রয়েছে। এ উত্থানের কাহিনি সিনেমার কাহিনিকেও হার মানায়।

সোভিয়েতবিরোধী মুজাহিদদের প্রতিরোধ যুদ্ধে অর্থ ও অস্ত্রের জোগান দেওয়া পাকিস্তান সে সময় সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে। যুদ্ধের কারণে পাক সীমান্তবর্তী আফগান প্রদেশগুলোতে গড়ে উঠেছিল পশতুন শরণার্থী ক্যাম্প। এমন প্রেক্ষাপটে ১৯৯৪ সালে দ্বিতীয়বারের মতো পাকিস্তানের ক্ষমতায় আসে বেনজীর ভুট্টোর পাকিস্তান পিপলস পার্টি। নয়া সরকারের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ, কারণ সমস্যার চূড়ান্তে পাকিস্তানের অর্থনীতি, ছিল দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিও। ওই সময় পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থাÑআইএসআই’র (এ সংস্থা তালেবান উত্থানে ব্যাপক ভূমিকা রাখে) হাতে পরিচালিত হচ্ছিল পাকিস্তান ও অ্যামেরিকার আফগান নীতি। আফগান গৃহযুদ্ধে পাকিস্তানের সমর্থনপুষ্ট গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ার তখন তার বাহিনী নিয়ে পিছু হটছিলেন। অর্থনীতি রক্ষায় সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে সদ্য স্বাধীন হওয়া মধ্য এশিয়ার দেশগুলোতে (তুর্কমেনিস্তান, কিরগিজস্তান, উজবেকিস্তান, কাজাখস্তান ও তাজিকিস্তান) পাকিস্তানি পণ্য রফতানির বাজার তৈরির উদ্যোগ নেন বেনজীর ভুট্টো। একই সময় বেলুচিস্তানের সুই গ্যাস ফিল্ডের গ্যাস প্রায় শেষ হওয়ার পথে থাকায় আর্জেন্টাইন তেল কোম্পানি বিরদাস ও পাকিস্তান মিলে তুর্কমেনিস্তান থেকে আফগানিস্তানের মধ্য দিয়ে পাইপলাইনে গ্যাস পাকিস্তান পর্যন্ত আনার পরিকল্পনা করা হয়। তবে এ সবকিছুর জন্যই প্রয়োজন ছিল একটি স্থিতিশীল আফগানিস্তানের। তারপরও নিজেদের অর্থনীতি বাঁচাতে ঝুঁকি নিয়েই মধ্য এশিয়ায় পণ্য রফতানির সিদ্ধান্ত নেয় পাকিস্তান। এ জন্য পাকিস্তান পশতুন বংশোদ্ভূত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নাসিরউল্লাহ বাবরের মাধ্যমে আইএসআইর সহায়তায় মধ্য এশিয়ায় স্থলপথে পণ্য পরিবহনে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার জন্য হেরাত প্রদেশের যুদ্ধবাজ নেতা ইসমাইল খাঁ ও উত্তরের মাজার-ই-শরিফে আবদুর রশিদ দোস্তানের সঙ্গে সমঝোতা করেন। কিন্তু কান্দাহারের (এটি প্রাচীন একটি নগরী, এর গোড়াপত্তন করেন গ্রিক মহাবীর আলেকজান্ডার। তালেবান আমলে এটি তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী ঘাঁটি ছিল)

যুদ্ধবাজ গোত্র নেতাদের সঙ্গে কোনোভাবেই সমঝোতায় পৌঁছানো যাচ্ছিল না। এ অবস্থায় ১৯৯৪ সালের অক্টোবরে পাকিস্তানি পণ্যবাহী ট্রাকের বিশাল বহর সীমান্ত অতিক্রম করে কান্দাহার- হেরাত-মাজার-ই শরিফ রুট হয়ে আফগানিস্তানের ওপর দিয়ে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর দিকে যাত্রা শুরু করে। কিন্তু কান্দাহারে এ কনভয় পৌঁছালে স্থানীয় যুদ্ধবাজ নেতাদের হাতে শত শত কোটি টাকার পণ্যর এ চালান আটক হয়। আইএসআইয়ের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক না থাকলেও সংস্থাটির সহায়তা নেওয়া ছাড়া বেনজির সরকারের সামনে বিকল্প কোনো পথ খোলা ছিল না।

গুলবদ্দিন হেকমতিয়ারের বাহিনী ব্যাকফুটে থাকায় পাক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আফগানিস্তানে কর্মকর্তা আইএসআই কর্নেল সুলতান ইমামের সাহায্য চান। কান্দাহারের এক মাদ্রাসার শিক্ষক, প্রাক্তন মুজাহিদিন ও সোভিয়েতবিরোধী যুদ্ধের কমান্ডার মোল্লা মোহাম্মদ উমরের নেতৃত্বে স্থানীয় মাদ্রাসার ছাত্রদের সহায়তায় মাল বোঝাই কনভয় উদ্ধার করে আইএসআই। এ ঘটনার পরই লাইমলাইটে চলে আসেন মোল্লা উমর, স্থানীয় মাদ্রাসার ছাত্রদের প্রতি কান্দাহারে অরাজকতা অবসানে লড়াইয়ের ডাক দেন। ওইদিনই ধর্ষণের অভিযোগে কান্দাহারের গভর্নরকে তারই বাহিনীর ট্যাংকের ব্যারেলে ঝুলিয়ে ফাঁসি দেওয়ার মাধ্যমে সমগ্র কান্দাহার মাদ্রাসার ছাত্রদের দখলে চলে আসে। এ খবর পাকিস্তানের পেশোয়ারের মাদ্রাসা ও শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে পৌঁছলে হাজার হাজার পশতুন বংশোদ্ভূত মাদ্রাসার ছাত্র সীমানা পেরিয়ে মোল্লা মরের দলে যোগ দেয়। এভাবেই ‘তালেবান’-এর জš§ হয়।

এ তালেবানরা ক্ষমতায় থাকার সময় মুসলিম শরিয়াহ্ভিত্তিক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিল আফগানিস্তানে। পুরুষদের দাড়ি রাখতে হতো, নারীদের বোরকা পরতে বাধ্য করা হতো। আট বছর বয়সের পর তাদের চাকরি বা শিক্ষা লাভ করতে দেওয়া হতো না। যারা পড়তে চায়, তো তাদের ভূগর্ভস্থ বিদ্যালয়ে পাঠানো হতো। পুরুষ ডাক্তাররা নারীদের চিকিৎসা করতে পারতেন না। যদি একান্তই প্রয়োজন হতো, সেক্ষেত্রে কোনো পুরুষ আত্মীয় বা স্বামী নিয়ে আসতে হতো।

 

গণমাধ্যমকর্মী