প্রচ্ছদ শেষ পাতা

তীব্র তারল্য সংকটে ঋণাত্মক ক্যাশফ্লো ১৪ ব্যাংকের

শেখ আবু তালেব: ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট ক্রমেই তীব্র আকার ধারণ করছে। পুরোনো খেলাপি তালিকার সঙ্গে সঙ্গে যোগ হচ্ছে নতুন নতুন খেলাপি প্রতিষ্ঠান। সুদ মওকুফ ও খেলাপি হওয়া প্রতিষ্ঠানের ঋণ পুনঃতফসিল করেও ফল পাচ্ছে না ব্যাংকগুলো। ব্যাংক থেকে যে পরিমাণ অর্থ বেরিয়ে যাচ্ছে, তার চেয়ে প্রবেশ করছে কম। ফলে তারল্য সংকটে চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে ১৪ ব্যাংকের শেয়ারপ্রতি ক্যাশফ্লো ঋণাত্মক হয়ে গেছে। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে একটি সরকারি এবং বাকি ১৩টি বেসরকারি খাতের।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে এমন তথ্য জানা গেছে। ব্যাংকগুলো হচ্ছে রূপালী, উত্তরা, ট্রাস্ট, মিউচুয়াল ট্রাস্ট, ইউসিবি, এক্সিম, আইএফআইসি, এনসিসি, ন্যাশনাল, এবি, যমুনা, সোস্যাল ইসলামী ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক।
কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যাচাই-বাছাই ছাড়াই আগ্রাসীভাবে ঋণ বিতরণ করায় নতুন খেলাপি বাড়ছে। তাদের কাছে আটকে যাচ্ছে ব্যাংকের টাকা। ব্যাংকের প্রতি আস্থা কমায় আমানতকারীরাও ব্যাংকবিমুখ হচ্ছেন। এতে আমানত প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় প্রয়োজনীয় নগদ টাকার জোগান দিতে পারছে না কিছু ব্যাংক। ফলে ধার বাড়ছে তাদের।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে বলেন, ‘মূলত আমানত সংগ্রহ কমে যাওয়ায় ক্যাশফ্লো ঋণাত্মক হয়ে গেছে। বিতরণ করা ঋণের বিপরীতে আদায়যোগ্য কিস্তির সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংকে ফেরত আসছে না। আবার অনেক ক্ষেত্রে খেলাপি হওয়া ঋণ পুনঃতফসিল করলেও সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে ক্যাশফ্লো ঋণাত্মক হয়ে গেছে। তবে চেষ্টা করা হচ্ছে, এ সমস্যা দ্রুত কাটিয়ে ওঠার।’
এর প্রভাব সম্পর্কে তিনি বলেন, টাকার চাহিদা মেটাতে সব ব্যাংকেই সুদহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে এক অঙ্কে সুদহার নামিয়ে আনা সম্ভব হবে না। প্রয়োজনীয় আমানত না এলে ব্যাংকে বিনিয়োগ বা ঋণ প্রদানের হার কমিয়ে এনে সমন্বয় করতে হবে। ফলে তহবিল ব্যয় ব্যবস্থাপনা বৃদ্ধি পাবে কিছুটা হলেও। এতে হয়তো বছর শেষে মুনাফা কিছু হলেও কমে আসতে পারে। কিন্তু ব্যাংকের কোনো সমস্যা হবে না।
তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে এসব ব্যাংকের ক্যাশফ্লো (নগদ টাকার প্রবাহ) ঋণাত্মক ছিল। গত বছরের একই সময়ে শুধু আইএফআইসি, এনসিসি ও ইউসিবি ব্যাংকের ক্যাশফ্লো ঋণাত্মক ছিল না। বাকি সবগুলো ব্যাংকের অবস্থা একই ছিল। চলতি বছরে নতুন করে এ তিন ব্যাংক যোগ হয়েছে।
এসব ব্যাংকের মধ্যে রূপালী ব্যাংকের ক্যাশফ্লো সবচেয়ে বেশি ঋণাত্মক। ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি ঋণাত্মক ক্যাশফ্লো ছিল ৭৯ দশমিক ৫১ টাকা, যা গত বছরের এ সময়ে ছিল ৩২ দশমিক ১১ টাকা। এছাড়া উত্তরা ব্যাংকের শেয়ারপ্রতি ঋণাত্মক ক্যাশফ্লো ছিল ১৮ দশমিক ৯৬ টাকা। গত বছরের এ সময়ের চেয়ে তারল্য সংকট বেড়েছে ছয়গুণ। ট্রাস্ট ব্যাংকের ১২ দশমিক ৪১ টাকা, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) আট দশমিক ৬৫ টাকা, ইউসিবির পাঁচ দশমিক ৭৮ টাকা, এক্সিম ব্যাংকের চার টাকা, আইএফআইসি ব্যাংকের তিন দশমিক তিন টাকা, এনসিসি ব্যাংকের শূন্য দশমিক ৫৮ টাকা, ন্যাশনাল ব্যাংকের দুই দশমিক ৭৬ টাকা, এবি ব্যাংকের পাঁচ দশমিক ৬৮ টাকা, যমুনা ব্যাংকের ছয় দশমিক ৮৩ টাকা, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংকের সাত দশমিক ৯২ টাকা, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের এক দশমিক ৮৩ টাকা।
ব্যাংকগুলোর তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত বছরের তুলনায় এ বছর ১০ ব্যাংকের তারল্য সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। গত বছরের এ সময়ও ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট থাকায় শেয়ারপ্রতি নগদ টাকার প্রবাহ নেতিবাচক ছিল।
জানা গেছে, প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ ’১৯) এসব ব্যাংকের নিট অপারেটিং ক্যাশফ্লো প্রতি শেয়ার (এনওসিএফপিএস) বা শেয়ারপ্রতি নগদ টাকার প্রবাহ ঋণাত্মক হয়েছে। ফলে এসব ব্যাংককে নিজেদের দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে প্রচুর পরিমাণ অর্থ ধার করতে হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পাশাপাশি অন্যান্য ব্যাংক থেকেও ধার করে চলতে হয়েছে ব্যাংকগুলোকে।
নগদ অর্থের প্রবাহ নেতিবাচক হওয়ার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কয়েক ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে ঋণ আদায়ের গতি কমেছে। খেলাপিদের নতুন সুবিধা দিতে অর্থমন্ত্রীর ঘোষণায় অনেক খেলাপি টাকা দিতে গড়িমসি শুরু করেন। ফলে ব্যাংকগুলো আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি। এটিও একটি অন্যতম কারণ।
এদিকে ব্যাংকগুলোর ধারের কারণে কলমানি রেট বৃদ্ধি পেয়েছে। আমানত সংগ্রহে ব্যাংকগুলো সুদহার বৃদ্ধি করেছে। এতে তহবিল ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে ব্যাংকগুলোর।
অপরদিকে আগ্রাসী ব্যাংকিং রোধে বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে ঋণ-আমানত (এডি) অনুপাত নির্দিষ্ট সীমায় নামিয়ে আনতে নির্দেশ দিয়েছে। আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রচলিত সুদভিত্তিক ব্যাংকগুলোকে ৮৩ দশমিক পাঁচ শতাংশ ও ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোকে ৮৯ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনতে বলা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সীমায় নামিয়ে আনতে ব্যাংকগুলোকে বিতরণ করা ঋণের কিস্তি যথাসময়ে আদায় করতে হবে। আমানত সংগ্রহ চাহিদা অনুযায়ী করতে হবে। নতুন করে কোনো ঋণ খেলাপি হলে সংকট আরও বৃদ্ধি পাবে। পুঁজিবাজারে থাকা বিনিয়োগ দ্রুত তুলতে হবে লোকসানে থাকলেও। এর প্রভাব পুঁজিবাজারেও পড়তে পারে। এজন্য যে কোনোভাবেই হোক, খেলাপি হওয়া ঋণের পরিমাণ কমিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে।

সর্বশেষ..