ত্রিভুবনে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা

সোমবার দুপুরবেলায় প্রতিবেশী নেপালের ত্রিভুবন বিমানবন্দরে স্থানীয় বেসরকারি বিমান সংস্থা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটের দুর্ঘটনার কথা শুধু আমরা কেন বিশ্বেরও জানতে বাকি নেই। ক’বছর আগে মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের বিমান নিখোঁজ হওয়ার পর ক্ষয়ক্ষতির দিক থেকে এখন পর্যন্ত এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে কি না জানা নেই। ঘটনাস্থলেই মারা গেছেন অর্ধশতাধিক যাত্রী। জীবিত যাদের উদ্ধার করা হয়েছে, শেষ পর্যন্ত তাদের ক’জন জীবিত থাকবেন, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। ঘটনার ভয়াবহতা স্বভাবতই নাড়া দিয়েছে বাংলাদেশ ও নেপাল দু’দেশের খোদ সরকারপ্রধানকে। পারস্পরিক সহায়তার সর্বোচ্চ নিদর্শনও মিলেছে অকুস্থলে। তবে যত যোগাযোগই হোক, যত উদ্যোগই নেওয়া হোকÑবড় বিমান দুর্ঘটনায় যেটি ঘটে থাকে অর্থাৎ পরিস্থিতি অসহায়ভাবে অবলোকন ছাড়া কোনো উপায় থাকে নাÑত্রিভুবন বিমানবন্দরেও সেটি ঘটেছে। অসহায় বিমানযাত্রীদের জন্য বলতে গেলে কিছুই করণীয় ছিল না আমাদের। যাত্রীদের কেউ কেউ পরীক্ষা শেষে ফিরছিলেন বাড়ি; কারও জন্য এটা ছিল বিজনেস ট্রিপ, কেউ বা মধুচন্দ্রিমা যাপন কিংবা পরিবার নিয়ে অথবা একা ঘুরতে যাচ্ছিলেন সেখানে। এই যে দুর্ভাগা মানুষগুলো কাক্সিক্ষত বিমানবন্দর পেরুনোর কিছু সময় আগেই চিরতরে হারিয়ে গেলেন, তাদের পরিবার ও স্বজনদের সমবেদনা জানানোর ভাষা আমাদের জানা নেই।

দুর্ঘটনায় যারা বেঁচে আছেন, তাদের ভবিষ্যৎ কেমন হবে, সেটি নিয়েও দুর্ভাবনা রয়েছে। প্রত্যাশা শুধু এটুকুÑতাদের সর্বোত্তম সেবা ও সহায়তা দেওয়া হবে এবং দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবেন তারা। এ দুর্ঘটনা শুধু বিপুলসংখ্যক মানুষকে নাড়া দিয়েছে, তা নয়। এর প্রভাব পড়বে স্থানীয় বিমান খাতের ওপর। অভ্যন্তরীণ রুটে ইউএস-বাংলাসহ একাধিক এয়ারলাইন্স ভালোই ব্যবসা করছিল। সাম্প্রতিক সময়ে বিমান টিকিট কাটার হিড়িক থেকেও তা বোঝা যায়। এখন কাঠমান্ডু দুর্ঘটনায় গোটা বিমান খাতেই তার প্রভাব না পড়ে পারে না। সেজন্য আমরা আশা করব, দুর্ঘটনাটির সুষ্ঠু তদন্ত হবে। এটি কেন ঘটেছে, তা নিয়ে নানা মত ব্যক্ত করছেন বিশেষজ্ঞরা। সামাজিক গণমাধ্যমও ছেয়ে গেছে অবিশেষজ্ঞ সমব্যথীদের ক্ষোভ ও হতাশায়। তাদের একাংশ মনে করে, পুরোনো এয়ারক্র্যাফট ব্যবহারেই ঘটেছে এমনটা। তারা স্মরণ করিয়ে দিতে চাইছেন, আগেও একাধিকবার ইউএস-বাংলার ফ্লাইটে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিয়েছিল। আবার কারও কারও মতে, অধিক মুনাফা প্রবৃত্তিই ডেকে এনেছে ওই সর্বনাশ। এক্ষেত্রে বিশেষ একটি এয়ারলাইন্সকে ‘ভিকটিমাইজ’ করার প্রবণতাও লক্ষণীয়। তদন্তে এসব অনুমান পরিত্যাজ্য বৈকি। তার বদলে বরং খতিয়ে দেখা উচিত, আসলে কতটা গাফিলতি ছিল গ্রাউন্ড কন্ট্রোলের? কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে পাইলটের যোগাযোগ কি ক্র্যাশের আগে ঘটেছিল, নাকি পরে? আসলে তখন বিমানটি চালাচ্ছিলেন কে? ‘টেক-অফে’র আগে কি ল্যান্ডিং গিয়ার ভালোভাবে চেক করা হয়েছিল? জানা যায়, ল্যান্ডিংয়ের আগেই আগুন ধরে যায় বিমানে। সেগুলো অবশ্যই ফরেনসিক বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। এখানে কোনো গলদ রয়ে গেলে তা একটা মস্ত ঝুঁকি হিসেবে থেকে যাবে কিন্তু। যুক্তিপ্রবণ প্রতিটি মানুষই চাইবেন, স্থানীয় বিমান খাতের জন্য কাঠমান্ডু দুর্ঘটনা হোক ‘ওয়েক-আপ কল’। ওই দুর্ঘটনায় যারা বড় ক্ষতির শিকার হলেন, কোনো কিছু দিয়েই তা পূরণ করা যাবে না। তবু তাদের ন্যায়সঙ্গত আর্থিক ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা তো করতেই হবে; পাশাপাশি আগামীতে যেন তাদের মতো আর কেউ এমন দুর্ভাগ্যের শিকার না হন, সে লক্ষ্যে এখন থেকেই জোর উদ্যোগ নিতে হবে খোদ বিমান খাতের ব্যবসায়ী, নিয়ন্ত্রকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে।