থার্ড পার্টির কারসাজিতে ক্ষতিগ্রস্ত কল সেন্টারে চাকরিজীবীরা

নীতিমালা নেই

হামিদুর রহমান : ঢাকা কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র রকিবুল ইসলাম চাকরি করছেন থার্ড পার্টির কল সেন্টার প্রতিষ্ঠান ‘ডিজিকন টেকনোলজি’তে। তিনি বলেন, ‘দেশে আউটসোর্সিংয়ের বাজার প্রতিনিয়ত বাড়ছে। কিন্তু নীতিমালা না থাকায় এ পেশায় চাকরিজীবীদের ভবিষ্যৎ নেই। অনেক আশা নিয়ে অনেকেই কল সেন্টারে চাকরি করতে এলেও বিভিন্ন ধরনের অনিয়মের কারণে কেউ এখানে বেশিদিন চাকরি করেন না।’

তিনি আরও বলেন, ‘কল সেন্টারে কতগুলো ডিভিশন আছে। বিশেষত যারা কলে বসেন, তাদের বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। যেমন মাথা ব্যথা কিংবা চোখের সমস্যা। আমার কখনও মাথা ব্যথা করত না, হেডফোনে প্রতিদিন পাঁচ-সাত ঘণ্টা কলে বসে কাস্টমারদের সঙ্গে কথা বলার কারণে এ সমস্যা হচ্ছে।’

অন্য আরেকটি প্রতিষ্ঠান ‘জেনিকস ইনফোসিস লিমিটেড’-এর সুমন আহম্মেদ (ছদ্মনাম) বলেন, ‘তিন বছরে তিনটি প্রতিষ্ঠানে কল সেন্টারে চাকরি করেছি। থার্ড পার্টির প্রতিষ্ঠানগুলোয় সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে বেতন নিয়ে। আগে মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোতে থার্ড পার্টির পরিবর্তে সরাসরি নিয়োগ পাওয়া যেত। এখন থার্ড পার্টির কারণে মোবাইল ফোন অপারেটরসহ অন্যান্য অফিসগুলো সরাসরি নিয়োগ না দিয়ে থার্ড পার্টির মাধ্যমে কম পারিশ্রমিকে কাজ চালায়। এতে উভয় প্রতিষ্ঠান লাভবান হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন চাকরিজীবীরা।’

তিনি আরও বলেন, ‘মাঝে মাঝে সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও অফিসে আসতে হয়; অনেক সময় ছুটি শেষেও বাড়তি কাজ করতে হয়, মিটিং করতে হয়। না করলে বেতন কর্তন করা  হয়। প্রতিদিন প্রায় ১০ ঘণ্টা ডিউটির বিনিময়ে মাস শেষে বেতন দেওয়া হয় মাত্র সাড়ে ৯ হাজার টাকা। অথচ একই কাজ যারা সরাসরি গ্রামীণফোনের হেড অফিসে করছেন, তারা বেতন পান প্রায় ৩৫ হাজার টাকা। দেশে কোনো নীতিমালা না থাকায় কল সেন্টারগুলোয় প্রতিনিয়ত অনিয়ম বাড়ছে’ বলে অভিযোগ করেন তিনি।

একই ধরনের অভিযোগ করেন ‘মিলভিক কাস্টমার কেয়ার’-এর মো. মিনার (ছদ্মনাম)। তিনি বলেন, ‘দেশে ই-কমার্সের জন্য বড় বড় সভা-সেমিনার করলেও অবকাঠামোগত জায়গাগুলোয় কোনো নজরদারি নেই। পার্টটাইম হিসেবে চাকরিতে যোগদানের সময় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা ডিউটির কথা বললেও প্রায় প্রতিদিন সাত ঘণ্টা পর্যন্ত ডিউটি করতে হয়। এছাড়াও অফিস শুরু হওয়ার  নির্দিষ্ট সময়ের ৩০ মিনিট আগে না পৌঁছালে বেতন কাটা হয়। প্রতিদিন সব মিলে সাড়ে সাত থেকে আট ঘণ্টা ডিউটি করতে হয়। আর মাস শেষে বেতন দেওয়া হয় মাত্র ছয় হাজার টাকা। এমন স্বেচ্ছাচারিতা অন্য কোনো দেশে হয় না।’

কল সেন্টার কর্মীদের এ ধরনের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ‘ডিজিকন টেকনোলজি’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওয়াহিদ শরিফ শেয়ার বিজকে বলেন, ‘বিষয়গুলো পুরোপুরি সত্য নয়। আমাদের এখন অনেক উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে, যেগুলো স্বাস্থ্যসম্মত। এছাড়া কর্মীদের কেয়ার নিতে মাঝেমধ্যেই চেক-আপ করানো হয়। পাশাপাশি কর্মীদের কাজের দক্ষতা বাড়াতে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।’

এদিকে থার্ড পার্টির মাধ্যমে মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোর কল সেন্টার পরিচালিত হওয়ায় প্রতিনিয়ত লোকসান গুনতে হচ্ছে কাস্টমার সার্ভিস রিপ্রেজেন্টেটিভদের (সিএসআর)। মোবাইল ফোন অপারেটরগুলো একজন রিপ্রেজেন্টেটিভের জন্য যে পরিমাণ অর্থ প্রদান করছে, তার প্রায় অর্ধেক টাকা কেটে নেয় থার্ড পার্টির প্রতিষ্ঠানগুলো। যা চাকরিজীবীদের সঙ্গে এক ধরনের প্রতারণা বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া কল সেন্টারে কাস্টমারদের সঙ্গে প্রতিদিন টানা পাঁচ-ছয় ঘণ্টা কথা বলাটাও স্বাস্থ্যগত দিক থেকে অনেক ঝুঁকিপূর্ণ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য-অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের ড. নাসরিন সুলতানা শেয়ার বিজকে বলেন, ‘কল সেন্টারগুলোতে সাধারণত ফিজিক্যাল  স্টেজের চেয়ে মানসিক চাপ থাকে বেশি। এতে ব্রেনের সমস্যা হতে পারে। এছাড়া ফোনে অতিরিক্ত কথা বলা ও মনিটরের দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখ ও কানের সমস্যা হয়। যদিও এসব সমস্যা সঙ্গে সঙ্গে বোঝা যায় না। প্রায় ২০-২৫ বছর পার হওয়ার পর এ সমস্যাগুলো অনেক বড় আকার ধারণ করে।’

সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে কল সেন্টার তৈরি করে রাতারাতি বড়লোক হচ্ছেন এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকরা। একজন রিপ্রেজেন্টেটিভের জন্য মোবাইল ফোন অপারেটর, ব্যাংক ও বিদেশি কোম্পানিসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যপরিচালনায় যে পরিমাণ অর্থ প্রদান করে, তার প্রায় ৬০ শতাংশও রিপ্রেজেন্টেটিভকে প্রদান করা হয় না। অর্থাৎ প্রায় ৪০ শতাংশ টাকাই কেটে নিচ্ছে দেশের থার্ড পার্টি প্রতিষ্ঠানগুলো।

একজন রিপ্রেজেন্টেটিভ প্রতিদিন আট-নয় ঘণ্টা পরিশ্রম করেন। নজরদারি না থাকায় কল সেন্টারগুলো প্রতিনিয়ত প্রতারণা করলেও এটা নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই। বাংলাদেশে মানুষের মেধাশ্রমের পারিশ্রমিক তুলনামূলক অন্যান্য দেশের তুলনায় খুব কম। নজরদারি না থাকায় এ সেক্টরের মালিকরা রাতারাতি বড়লোক হচ্ছে। অন্যদিকে চাকরিজীবীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। দেশ ডিজিটাল হলেও ডিজিটাল নজরদারি নেই।

তারা আরও জানান, দেশে আউটসোর্সিংয়ের জায়গা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কল সেন্টারের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের জন্য ‘কল সেন্টার অ্যাসোসিয়েশন’ থাকলেও তারাও খুব একটা নজর রাখছে না।

‘বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কল সেন্টার অ্যান্ড আউটসোর্সিং’ (বাক্য)-এর মহাসচিব তৌহিদ হোসেন শেয়ার বিজকে বলেন, ‘দেশে মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোতে যারা কাজ করছের, তাদের মাসিক বেতন ৩৫ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকার মতো। তুলনামূলকভাবে থার্ড পার্টিতে বেতন কম। কারণ এখানে যারা কাজ করছেন, তাদের বেশি অভিজ্ঞতা নেই। কাজের মাধ্যমে অভিজ্ঞতা বাড়ে, তখন চাইলে কোনো কর্মী বেশি বেতনে অন্য প্রতিষ্ঠানে যেতে পারেন।’

প্রযুক্তিবিদ মোস্তাফা জব্বার শেয়ার বিজকে বলেন, ‘এটি অত্যন্ত দুঃখজনক যে, দেশ প্রযুক্তির দিক থেকে এগিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত ই-কমার্সের জন্য আইন তৈরি হয়নি। আমরা বহু আগে থেকেই সরকারকে বলে আসছি এ বিষয়ে আইন প্রতিষ্ঠা করতে। আইন না থাকায় অনেক সময় অনেক অনিয়ম হলেও বিষয়গুলো মোকাবিলা করা যায় না।’

তিনি বলেন, ‘কল সেন্টারের পাশাপাশি মানুষ এখন ই-কমার্সে অনেক এগিয়ে। কেনাকাটা থেকে শুরু করে সবকিছুতে এখন অনলাইনে মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। আবার এ সেক্টরেও অনেক অনিয়ম হয়। তাই আমরা সরকারকে বলবÑপ্রযুক্তিগত সার্বিক বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণে আইন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিভিন্ন অনিয়ম দূরীকরণে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।’