দক্ষতা বাড়ুক এডিপি বাস্তবায়নে

প্রতি বছর বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার নিয়ে সম্পাদকীয় লেখাটা বোধকরি রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের জন্য। এডিপি বাস্তবায়নের ধীরগতি নিয়ে কিছুই লেখা হয়নি, বিশেষত অর্থবছরের শেষদিকে এমন মাস বোধহয় একটিও পাওয়া যাবে না। এমন যদি হতো যে, বাস্তবায়ন হারের পাশাপাশি এডিপির গুণগত মান বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া যেত তাহলেও কথা থাকত। তা নয়, বরং প্রতি বছরই এডিপি বাস্তবায়নে এমন ধীরগতি থাকে যে, মানের প্রশ্ন ঝেড়ে ফেলে আমাদের পরামর্শ দিতে হয়, বাস্তবায়নের গতি বাড়ান! দুর্ভাগ্যবশত এবারও তাতে ব্যতিক্রম নেই।

গতকালের শেয়ার বিজে খবর ছাপা হয়েছে ‘অর্থবছরের সাত মাসে এডিপি বাস্তবায়ন ৩৩ শতাংশ: জিওবির বাস্তবায়ন হার পাঁচ বছরে সর্বনিম্ন’। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) বরাত দিয়ে আমাদের প্রতিবেদক জানাচ্ছেন, ২০১৮ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে সার্বিকভাবে এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে ৩৩ দশমিক ৩৫ শতাংশ; যার মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় হয়েছে ২৮ হাজার ৬৭৭ কোটি টাকা (মোট বরাদ্দের ৩০ দশমিক শূন্য দুই শতাংশ)। প্রতিবেদকের পর্যবেক্ষণ অনুসারে, এ বাস্তবায়ন হার গত পাঁচ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। উল্লেখ্য, পূর্ববর্তী চার অর্থবছরে একই সময়ে নিজস্ব তহবিল থেকে বাস্তবায়নের হার ছিল যথাক্রমে ৩৬ দশমিক ৬৩, ৩১, ৩৩ ও ৩৫ শতাংশ। অবশ্য অস্বীকার করা যাবে না, শতাংশের হিসাবে কমলেও চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে টাকার অঙ্কে বেড়েছে এডিপির বাস্তবায়ন। প্রকল্প সাহায্য ব্যয়ের বেলায়ও গত পাঁচ বছরের মধ্যে চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে পারফরম্যান্স সর্বোচ্চ। এসব খবর সত্ত্বেও এডিপি বাস্তবায়নের গতি নিয়ে দুর্ভাবনা রয়ে যায় সঙ্গত কারণেই।

আমরা শুরুতে বলেছিলাম, চলতি এডিপি বাস্তবায়ন হারের চিত্র অন্যান্যবারের মতোই তথা গতানুগতিক। তবে এবারের অন্তর্নিহিত প্রধান কারণটিকে কিছুটা হলেও ব্যতিক্রম বলতে হয়। অন্যান্য অর্থবছরে দেখা গেছে, মূলত অদক্ষতার কারণেই পিছিয়ে থেকেছে এডিপি বাস্তবায়নের কাজ। এবার দেখা যাচ্ছে, পদ্মা সেতুর মতো বৃহৎ প্রকল্পে মনোযোগ ও রাজস্ব আহরণে কাক্সিক্ষত গতি না থাকায় ব্যাহত হচ্ছে এর বাস্তবায়ন। তার মানে এডিপি বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্টদের দক্ষতা বেড়েছে আগের চেয়ে; তবে ঘাটতি দেখা যাচ্ছে রাজস্ব অর্থায়নসহ অন্যান্য ইস্যুতে। এ অবস্থায় সবাই চাইবেন, এসব ঘাটতি পূরণপূর্বক এডিপি বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্টদের দক্ষতা অধিকতর বৃদ্ধির দিকে মনোযোগ দেওয়া হোক। যথাসময়ে এডিপি বাস্তবায়নের গুরুত্ব কী, তা সংশ্লিষ্টদের বুঝিয়ে বলার দরকার নেই। তার সঙ্গে শুধু এটুকু যোগ করা যায় যে, বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত এ দেশে মুখ্য উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বলতে বুঝিয়েছে সেতু-কালভার্ট-সড়ক নির্মাণকে। বেশ কয়েক বছর ধরে পদ্মা সেতু বা মেট্রোরেলের মতো দীর্ঘমেয়াদি মেগা প্রজেক্ট গ্রহণ ও তার বাস্তবায়নে দৃষ্টি দিয়েছি আমরা। কাণ্ডজ্ঞান বলে, এসবের প্রভাব এডিপি বাস্তবায়নের ওপর না পড়ে পারে না। এদিকে মেগা প্রজেক্টের কারণে এডিপি বাস্তবায়নের মতো নিয়মিত কাজে ধীরগতি দেখা দেবে, সেটা কোনোভাবে কাম্য নয়। প্রত্যাশা হলো মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে চলুক; তার সঙ্গে বাড়ুক এডিপি বাস্তবায়নের হার। খেয়াল রাখা দরকার, মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়নে এখন পর্যন্ত আমরা ব্যাপকভাবে বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। সে ক্ষেত্রে নিজস্ব কারিগরি সক্ষমতা বাড়ানো গেলে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হতো। এতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নে আত্মনির্ভরশীলতাও বাড়ত বৈকি। সবচেয়ে বড় কথা, এর সুপ্রভাব পড়ত এডিপি বাস্তবায়নের হার ও মানের ওপর। এমন পরিস্থিতিতে নীতিনির্ধারকরা উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্টদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে আরও দৃষ্টি দেবেন, এমনটাই সবার কামনা।