দর বৃদ্ধিতে হাক্কানী পাল্প ও খুলনা প্রিন্টিংয়ের দাপট

মুস্তাফিজুর রহমান নাহিদ: পুঁজিবাজারে কাগজ ও প্রকাশনা খাতের তালিকাভুক্তির সংখ্যা দুটি। প্রতিষ্ঠান দুটিরই আর্থিক অবস্থা নাজুক। কিন্তু তারপরও দর বাড়ছে এ দুই প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের। বাজার-সংশ্লিষ্ট থেকে শুরু করে খোদ কোম্পানি কর্তৃপক্ষ কেউই বলতে পারছেন না এই দর বৃদ্ধির কারণ। প্রতিষ্ঠান দুটি হচ্ছে হাক্কানী পাল্প ও খুলনা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং। এর মধ্যে ‘হাক্কানী পাল্প নতুন একটি প্রকল্প চালু করতে যাচ্ছে’Ñবাজারে এমন প্রচারণা রয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, তিন মাসের ব্যবধানে তালিকাভুক্ত হাক্কানী পাল্পের শেয়ারদর বেড়েছে প্রায় ৭৩ শতাংশ। তিন মাস আগে এ শেয়ারের দর ছিল ৫২ টাকা ৯০ পয়সা। বর্তমানে যে শেয়ার লেনদেন হচ্ছে ৮৮ টাকা থেকে ৯২ টাকার মধ্যে।

বাজারে গুজব রয়েছে, হাক্কানী পাল্প খুব শিগগিরই একটি নতুন প্রকল্প চালু করবে। তবে এর কোনো ভিত্তি নেই বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তাদের ভাষ্য, গুজব কাজে লাগিয়ে একটি শ্রেণি ফায়দা লুটছে।  জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানের সচিব মোহাম্মদ মুসা শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর কেন বাড়ছেÑসেটা বলতে পারছি না। তবে আমাদের কাছে দর বৃদ্ধির কোনো সংবেদনশীল তথ্য নেই। বিষয়টি ইতোমধ্যে স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।’

নতুন প্রকল্প চালুর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের একটি টিস্যু প্রজেক্ট চালুর কথা রয়েছে। তবে এর জন্য সময়ের প্রয়োজন। ফলে এর সঙ্গে দর বৃদ্ধির কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা আমার জানা নেই।’

এদিকে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ব্যবসা মন্দা থাকায় লোকসানের পরিমাণ বেড়েছে। ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা হয়েছিল ৮৫ লাখ টাকা। ২০১৬ সালে লাভের বদলে এক কোটি ৩৭ লাখ টাকা লোকসান করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

দীর্ঘদিন থেকে শেয়ারহোল্ডার পাঁচ শতাংশ শেয়ার প্রদান করে কোনোরকম ‘বি’ ক্যাটাগরি টিকিয়ে রেখেছে প্রতিষ্ঠানটি। ২০০১ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানটির মোট শেয়ারের মধ্যে পরিচালকদের কাছে রয়েছে ৫৫.৫২ শতাংশ। এছাড়া ৩৬.১৬ শতাংশ শেয়ার ধারণ করছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। বাকি ৮.৩২ শতাংশ রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর কাছে। ২০১৬-এর ৩০ জুন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকদের কাছে শেয়ারের পরিমাণ ছিল ৫৭.২৯ শতাংশ। পরবর্তীতে তারা ১.৭৭ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করে দেন।

অন্যদিকে তিন মাসের ব্যবধানে লোকসানি প্রতিষ্ঠান খুলনা প্রিন্টিংয়ের শেয়ারদর বেড়েছে ২৬ শতাংশ। ২০১৪ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত খুলনা প্রিন্টিং ২০১৫ সালে ১০ কোটি ২৩ লাখ টাকা মুনাফা করে। পরের বছরই প্রতিষ্ঠানটির মুনাফায় ধস দেখা যায়। সর্বশেষ ২০১৬ সালের আর্থিক হিসাবে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা প্রায় আট কোটি টাকা কমে গেছে।  এ বছর মুনাফা কমে হয়েছে দুই কোটি ৩৭ লাখ টাকা। প্রতিষ্ঠানটি প্রথম বছর (২০১৪) শেয়ারহোল্ডারদের ১৫ শতাংশ লভ্যাংশ দেয়। পরের বছর জটিলতার কারণে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে চলে যায় কোম্পানিটি।

জানা যায়, নির্দিষ্ট সময়ে লভ্যাংশ বণ্টন-সংক্রান্ত জটিলতায় ‘এ’ থেকে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে অবস্থান করছে খুলনা প্রিন্টিং। ২০১৫ সালের জন্য কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের ১০ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল, যা টাকার অঙ্কে চার কোটি ৪০ লাখ টাকা। এ ডিভিডেন্ড কোম্পানিটির শুধু সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের জন্য প্রযোজ্য হবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছিল। বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) বিনিয়োগকারীরা ঘোষিত ডিভিডেন্ডের অনুমোদন দিয়েছিল। কিন্তু এজিএম সম্পন্ন হওয়ার পর প্রায় ৩০ কার্যদিবস পেরিয়ে গেলেও লভ্যাংশ প্রদানে ব্যর্থ হয় কোম্পানিটি। ডিএসই লিস্টিং রেগুলেশনের ২৯ ধারা অনুযায়ী ডিভিডেন্ড পরিশোধ-সংক্রান্ত কমপ্লায়েন্স প্রতিবেদন সাত দিনের মধ্যে ডিএসই ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) জমা দিতে হয়। সেটি করতে না পারায় প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান হয় ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে।

এ-প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএসই’র এক সাবেক প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘খুলনা প্রিন্টিং তালিকাভুক্তির আগে থেকেই বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছে। হাক্কানী পাল্পের অবস্থাও ভালো নয়। প্রতিষ্ঠান দুটি নিয়ে কারসাজির ঘটনা ঘটছে। প্রায়ই এমন খবর পাওয়া যায়।’