দশ বছর পর নতুন কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ


সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: দীর্ঘ ১০ বছর পর চট্টগ্রাম বন্দর নতুন কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণকাজ শুরু করতে যাচ্ছে। নগরীর পতেঙ্গা এলাকায় এয়ারপোর্ট রোডসংলগ্ন কর্ণফুলী নদীর তীরে এক হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) নির্মিত হচ্ছে। গতকাল নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান আনুষ্ঠানিকভাবে ‘পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল’ নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। শিগগিরই সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার ডিভিশন মূল নির্মাণকাজ শুরু করবে।

পতেঙ্গা টার্মিনাল নির্মাণের প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দরের মূল জেটি থেকে ভাটির দিকে চট্টগ্রাম ড্রাই ডক এবং বোট ক্লাবের মধ্যবর্তী ২৬ একর জায়গায় কর্ণফুলী নদীর তীরে এই টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে। এ পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালে ৬০০ মিটার দীর্ঘ জেটি নির্মিত হবে। ২৬ একর পশ্চাৎসংযোগ সুবিধাসহ এই জেটিতে একসঙ্গে তিনটি জাহাজ ভিড়তে পারবে। এছাড়া ২২০ মিটার দীর্ঘ একটি ডলফিন অর্থাৎ তেলবাহী জাহাজের জেটি নির্মিত হবে। প্রকল্পটি সম্পন্ন করার মেয়াদ ধরা হয়েছে ডিসেম্বর ২০১৯ সাল। এতে কাস্টমস বন্ডেড এলাকা, পোর্ট অফিস বিল্ডিং, রেলওয়ে ট্র্যাক, প্রশস্ত সড়কসহ পরিপূর্ণ টার্মিনালের সব সুবিধা থাকবে। প্রকল্প এলাকায় বর্তমানে সড়কসহ নানা অবকাঠামো রয়েছে। আর এই টার্মিনাল নির্মাণ, যন্ত্রপাতি কেনাসহ মোট ব্যয় হবে এক হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে সেনাবাহিনী প্রায় এক হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে পূর্ত কাজ করবে। যন্ত্রপাতি সংগ্রহে ব্যয় হবে ৬৫৮ কোটি টাকা। বাকি টাকা ব্যয় হবে আনুষঙ্গিক কাজে।

বন্দরসংশ্লিষ্টরা বলেন, প্রস্তাবিত টার্মিনালে বন্দরের মূল জেটির চেয়ে কম সময়ে জাহাজ ভেড়ানো সম্ভব হবে। আবার সাগর থেকে সরাসরি পতেঙ্গা টার্মিনালে জাহাজ ভেড়ানোয় কর্ণফুলী নদীর অন্তত একটি বাঁকও অতিক্রম করতে হবে না। বন্দরের মতোই সাড়ে নয় মিটার ড্রাফটের (জাহাজের পানির নিচের অংশের দৈর্ঘ্য) জাহাজ ভেড়ানো যাবে এই টার্মিনালে। টার্মিনালে একসঙ্গে তিনটি জাহাজ থেকে কনটেইনার ওঠানো-নামানোর সুবিধা থাকবে। এতে বছরে পাঁচ লাখের বেশি কনটেইনার ওঠানো-নামানো যাবে। এ ছাড়া তেলবাহী জাহাজ ভেড়ানোর সুবিধাও থাকবে টার্মিনালে। এ টার্মিনাল নির্মাণ করবে সেনাবাহিনী। বন্দরের পুরকৌশল বিভাগের সক্ষমতা না থাকায় দ্রুত কাজ শেষ করতে সেনাবাহিনীকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

বন্দর ব্যবহারকারীরা বলেন, বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করে বছরে ২১ লাখ ৬২ হাজার ৫০০ একক কনটেইনার পরিবহনের স্বাভাবিক ক্ষমতা রয়েছে বন্দরের। স্বাভাবিক এই ক্ষমতা ছাড়িয়ে গেছে গত দুই বছর আগেই। কনটেইনার পরিবহন যত বাড়ছে, ততই বন্দরের সেবা পেতে ভোগান্তি পেতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। ফলে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) যত দ্রুত নির্মাণ করা হবে তত ব্যবসায়ীদের জন্য মঙ্গল। এতে দেশের অর্থনীতি আরও সম্প্রসারিত হবে। এছাড়া বে-টার্মিনাল, লালদিয়া টার্মিনালসহ যন্ত্রপাতি সংগ্রহের উদ্যোগগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন শুরু করা খুবই দরকার। কারণ আমদানি-রফতানি বাড়ার প্রেক্ষিতে দেশের অন্যতম প্রধান বন্দরের সক্ষমতা বাড়েনি। দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃক নতুন টার্মিনাল ও জেটি নির্মাণের জন্য আমদানিকারক ও বন্দর ব্যবহারকারীরা দাবি জানিয়ে আসছেন। কারণ প্রতিনিয়ত কনটেইনার ও জাহাজজটে আমদানি ও রফতানির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়ে আসছে। দীর্ঘসময় ধরে জাহাজে করে আনা পণ্য খালাস হতে না পারায় বহির্নোঙরে অপেক্ষা করতে হয়। এতে প্রতিদিনের জন্য ১০-১৫ হাজার ডলার অতিরিক্ত ভাড়া দিতে হচ্ছে। অন্যদিকে নির্দিষ্ট সময়ে রফতানি পণ্যের কাঁচামাল কারখানায় পৌঁছাতে না পারায় অনেক রফতানি পণ্যের অর্ডার বাতিল হচ্ছে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে নৌমন্ত্রী শাজাহান খান বলেন, দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দর। এ বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা সময়ের দাবি। এ লক্ষ্যে দ্রুত সময়ের মধ্য বেশ কিছু যন্ত্রপাতি সংযোজন করা হয়। আর নির্দিষ্ট সময়ে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালের (পিসিটি) কাজ শেষ হবে। প্রধানমন্ত্রীর গতিশীল নেতৃত্বে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। এক্ষেত্রে কোনো অপশক্তি বাধা হতে পারে না।

চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম খালেদ ইকবাল বলেন, প্রায় ১০ বছর পর প্রথমবার নতুন একটি টার্মিনাল নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে টার্মিনাল নির্মাণকাজ শেষ হবে। দ্রুত কাজ শেষ করতে সেনাবাহিনীকে টার্মিনাল নির্মাণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ঠিকাদার নিয়োগ থেকে শুরু করে পূর্ত কাজের সবই তারা করবে। কাজশেষে সেনাবাহিনী বন্দরকে টার্মিনাল বুঝিয়ে দেবে। এই টার্মিনাল নির্মাণকাজ শেষ হলে বন্দরে কনটেইনার ওঠানো-নামানোর সুবিধা বাড়বে।

ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নৌ-মন্ত্রণালয়ে স্থানীয় কমিটির সদস্য, স্থানীয় সংসদ ও ব্যবসায়ী নেতা এমএ লতিফ এমপি, বন্দর চেয়ারম্যান এম খালেদ ইকবাল, সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার ডিভিশন প্রধান মেজর জেনারেল সিদ্দিকুর রহমান সরকার, চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি মাহবুবুল আলম ও বন্দরের ঊর্ধŸতন কর্মকর্তাসহ বন্দর ব্যবহারকারীরা।

উল্লেখ্য, সমুদ্রপথে কনটেইনার পরিবহনের ৯৮ শতাংশ চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে হয়। পোশাকশিল্পসহ বিভিন্ন শিল্পকারখানার আমদানি করা কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও রফতানি পণ্য কনটেইনারে আনা-নেওয়া হয়। সদ্য প্রকাশিত লয়েডস লিস্ট অনুসারে, ২০১৬ সালে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ২৩ লাখ ৪৬ হাজার ৯০৯ একক কনটেইনার পরিবহন করা হয়েছে, যা আগের বছরের (২০১৫) চেয়ে ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। প্রকাশিত নতুন তালিকায় তা ৭১-এ উন্নীত হয়েছে।