দারিদ্র্য কমলে সামাজিক নিরাপত্তাবলয় বাড়ছে কেন?

ড. আর. দেবনাথ: স্মরণকালের সবচেয়ে বেশি খরচের হিসাব দিয়ে অর্থমন্ত্রী ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জন্য তার বাজেট সংসদে উত্থাপন করেছেন। মিডিয়া একে স্মরণকালের বৃহত্তম বাজেট বলে আখ্যা দিয়েছে। খরচের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি বৃহত্তম বাজেট। আরেকটি দৃষ্টিকোণ আছে, যার নাম আয়ের দৃষ্টিকোণ। দেখা যাচ্ছে, আগামী অর্থবছরে সরকারের মোট খরচ বা ব্যয় হবে চার লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা। বিপরীতে সরকারের মোট আয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে তিন লাখ ৩৯ হাজার ২৮০ কোটি টাকা। তাহলে ঘাটতি দাঁড়ায় এক লাখ ২৫ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা। ঘাটতির পরিমাণ জিডিপির চার দশমিক ৯ শতাংশ, যা ২০১৬-১৭ অর্থবছরের ছিল মাত্র সাড়ে তিন শতাংশ। এই ঘাটতির টাকা কোথা থেকে আসবে? দুই উৎস থেকে বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ। বৈদেশিক সূত্র থেকে কিছুটা কম, দেশীয় উৎস থেকে বেশ কিছুটা বেশি। বৈদেশিক উৎসের ৫৪ হাজার ৬৭ কোটি টাকা এবং দেশীয় উৎসের ৭১ হাজার ২২৬ কোটি টাকা এই দুইয়ে মিলে ঘাটতি পূরণ করবে। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, আমাদের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার হচ্ছে এক লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকা। অন্যান্য পরিসংখ্যানের সঙ্গে এডিপির আকার মেলালে একটা সত্যতা পাওয়া যায়। আর তা হলো আমাদের উন্নয়নের টাকা নেই, পর্যাপ্ত টাকা নেই। বছরের পর বছর রাজস্ব বৃদ্ধি পেলেও সমান, এমনকি বেশি তালে খরচ বৃদ্ধি পেলেও উন্নয়নের বেশিরভাগ টাকা আসে ধার-কর্জ থেকে। এটাই নিষ্ঠুর বাস্তবতা। বছরের পর বছর ধরে চলমান বাস্তবতা। টাকা আছে, উন্নয়নের টাকা নেই। রাজস্ব বাজেটের উদ্বৃত্ত থেকে উন্নয়নের টাকা আসে খুবই কম। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এক হিসাবে আসবে মাত্র ৪৮ হাজার ৭০৭ কোটি টাকা। বাকি এক লাখ ২৫ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা আসবে ঋণ থেকে বিদেশি ঋণ, ব্যাংক ঋণ ও সঞ্চয়পত্র বিক্রির টাকা থেকে। আক্ষেপ করে বলতে হয় স্বাধীনতার ৪৬-৪৭ বছর পরও ধার-কর্জ করে উন্নয়নের টাকা জোগাতে হয়। এটা আমাদের বাজেটের বড় দুর্বলতা। অথচ করযোগ্য সব ব্যক্তি যদি কর দিত, কেউ যদি ভ্যাট ও আমদানি শুল্ক ফাঁকি না দিত, কেউ যদি বন্ডেড ওয়্যারহাউজের বিনা শুল্কের পণ্য খোলাবাজারে বিক্রি না করত; তাহলে এমনিতেই বাজেটের আকার দ্বিগুণ-তিনগুণ করা সম্ভব হতো। আয় বৃদ্ধির ফলেই তা করা যেত। অথচ স্পষ্টতই তা হচ্ছে না। সরকার প্রশাসন চালাতে গিয়ে কিছুটা উন্নয়ন করতে গিয়ে প্রায় সব বোঝা দীর্ঘদিন ধরে চাপাচ্ছে সাধারণ মানুষের ওপর। বোঝা চাপাচ্ছে মধ্যবিত্তের ওপর। ধনীরা, ধনাঢ্য ব্যক্তিরা, শত শত কোটি টাকার মালিকরা, শত শত গ্রুপ অব কোম্পানিজের মালিকরা উন্নয়নের বোঝা টানছেন না। তারা শুধু সরকারের কাছ থেকে সুবিধা নিচ্ছেন। আর সুবিধা নিচ্ছেন জনপ্রশাসনের লোকেরা, আমলা ও কামলারা। কীভাবে? বাজেটের কাঠামোগত আলোচনা করলেই তা বোঝা যাবে। কাঠামোগত আলোচনা মানে কী? সরকার যে রাজস্ব আয় সংগ্রহ করবে, তা কারা দেবে? বিপরীতে সংগৃহীত রাজস্ব কার পেছনে খরচ করা হবে? দেখা যাক, ২০১৮-১৯ অর্থবছরের অবস্থা কী? দেখা যাচ্ছে, মোট রাজস্ব আয় চার লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকার মধ্যে আগামী অর্থবছরে ৬৩ দশমিক সাত শতাংশই আসবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে। মোট কত টাকা? দুই লাখ ৯৬ হাজার ২০১ কোটি টাকা। বাকি টাকা জোগাবে অন্যান্য প্রতিষ্ঠান। এনবিআরের পরিসংখ্যান থেকে দৃশ্যমান যে, তারা ক্রমেই ঝুঁকছে ভ্যাটের দিকে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তাদের মোট আয়ের ৩৭ দশমিক তিন শতাংশই আসবে ভ্যাট থেকে। অথচ ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তা ছিল ৩৫ দশমিক আট শতাংশ। সম্পূরক শুল্কের হিসাবও কিছুটা বাড়বে। তবে কমবে আয়করের হিস্যা। এই যে কাঠামো, এর থেকে বোঝা যায় এনবিআরের ঝোঁক পরোক্ষ করের দিকে। ভ্যাট হচ্ছে পরোক্ষ, এটা ভোগ কর বা কনজামশন কর। যে যত ভোগ করবে-কিনবে, সে তত বেশি ভ্যাট দেবে। কিন্তু মুশকিল এক জায়গায়Ñভ্যাট সবার ক্ষেত্রে এক। গরিব যা দেবে, দেশের শ্রেষ্ঠতম ধনীও দেবে একই হারে। এটা বৈষম্যের করব্যবস্থা। এতে টাকা উঠে বেশি গরিবের কাছ থেকে, মধ্যবিত্তের কাছ থেকে। অর্থাৎ বাজেটে অবদান রাখে সবচেয়ে বেশি গরিব ও মধ্যবিত্তরা। বিপরীতে ধনীরা দেয় যৎসামান্য। দেখা যাচ্ছে, সরকার আয়করকে নিরুৎসাহিত করছে। যা-ও করছে, তা-ও করছে উৎসে আয়কর কর্তনের মধ্য দিয়ে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্বে আয়করের হিস্যা মাত্র ৩৪ শতাংশ। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ছিল ৩৫ দশমিক চার শতাংশ। এ ক্ষেত্রেও বোঝা বহন করছে গরিব ও মধ্যবিত্ত। ধনীরা আয়কর দেয় না, দিলেও খুবই কম। অর্থাৎ বাজেটের সিংহভাগ বোঝা বহন করছে দেশের সাধারণ মানুষ। এটা ন্যায়বিচারের পরিপন্থি। তা-ই নয় কি?
আসা যাক ব্যয়ের ক্ষেত্রে। এখানে বৈষম্য আরও বেশি। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে হিস্যাদার ১৫টি খাত। এর মধ্যে প্রধান প্রধান খাত হচ্ছে: শিক্ষা ও প্রযুক্তি, জন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা, সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ, জনপ্রশাসন, প্রতিরক্ষা, কৃষি, স্বাস্থ্য, জ্বালানি, স্থানীয় সরকার ও পল্লি উন্নয়ন, পরিবহন ও যোগাযোগ, সুদ প্রভৃতি ১১টি খাত। দেখা যাচ্ছে, সব টাকা খরচ হচ্ছে জনপ্রশাসন খাতে। বাজেটের মোট বরাদ্দের ১৮ শতাংশই পাবে প্রশাসনের লোকেরা। অথচ চলতি বছরে তা মাত্র ১৩ দশমিক ছয় শতাংশ। এটা কি নির্বাচনি বছরে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ‘ইনাম’ দেওয়া হচ্ছে? নতুন দেশে এমন কী ঘটল যে, সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য এত টাকা বরাদ্দ বাড়াতে হবে। দেখা যাচ্ছে, তারা এখন বেসরকারি খাতের কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের মতো সুযোগ-সুবিধা পাবেন। তা হলে প্রশ্ন একটা। ২০১৭ সালে বেসরকারি খাতের ব্যাংকসহ ব্যাংক খাতে ৯ হাজার লোকের চাকরি গেছে। শুনেছি দক্ষতার প্রশ্নে। এই ব্যবস্থা কি জনপ্রশাসনে আছে? জবাবদিহিতার ব্যবস্থা কি সেখানে আছে? দক্ষতা বিচারের ব্যবস্থা কি সেখানে আছে? প্রশাসনের নিয়ম ছিল একটাÑযেখানে ‘ক্ষমতা’, সেখানে সুযোগ-সুবিধা কম। যেখানে ক্ষমতা নেই, সেখানে সুযোগ-সুবিধা বেশি। সেই ব্যালান্সটা নষ্ট করা হচ্ছে কেন? আর তা করতে গিয়ে তার বোঝা মানুষের ওপর চাপানো হচ্ছে কেন? খুবই দুঃখের বিষয় একটা। কৃষিতে মোট বাজেটের হিস্যা ২০১৮-১৯ অর্থবছরে কমানো হয়েছে। পূর্ববর্তী বছরের ছয় দশমিক এক শতাংশের স্থলে করা হয়েছে মাত্র পাঁচ দশমিক সাত শতাংশ। অথচ সরকার বলছে ভিন্ন কথা। বলা হচ্ছে কৃষিতে বরাদ্দ বেড়েছে। একই কথা সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণের ক্ষেত্রে। অনুন্নয়ন ও উন্নয়ন বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা হিস্যা হ্রাস পেয়ে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে হয়েছে পাঁচ দশমিক আট শতাংশ। পূর্ববর্তী বছরে তা ছিল ছয় শতাংশ। শিক্ষা ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে তা ১৬ দশমিক চার শতাংশের স্থলে হয়েছে ১৪ দশমিক ছয় শতাংশ। দৃষ্টিকটুভাবে সত্যি ঘটনা হচ্ছে আরেকটি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের মতো অতীব প্রয়োজনীয় বিভাগগুলোতে বরাদ্দ ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। গত পাঁচ-সাত-দশ বছরের তথ্য মিলিয়ে যে কেউ তা পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। এসব নিতান্তই পরিসংখ্যানের বিষয়। তাহলে দেখা যাচ্ছে, রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে সরকার নির্ভরশীল গরিব ও মধ্যবিত্তের ওপর। বিপরীতে খরচের ক্ষেত্রে সরকার বেশি মনোযোগী প্রশাসনের দিকে। কিছুদিন আগেই তাদের বেতন-ভাতা দ্বিগুণ করা হয়েছে।
এখন গাড়ি-বাড়ির সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, তা বাড়ানো হচ্ছে। কিন্তু ‘প্রোডাকটিভিটি’র কোনো যাচাই-বাছাই নেই, দক্ষতার কোনো বিচার-আচার নেই। সমাজে অন্যদের প্রতি অবিচার করা হচ্ছে কি না, তার প্রতিও নজর নেই। দেশে যে ক্রমেই অসহায় লোকের সংখ্যা বাড়ছে, তা তো সরকারি তথ্যেই বোঝা যাচ্ছে। এই মুহূর্তে দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ পরিবার সামাজিক নিরাপত্তার অধীনে। তাদের জন্য ২০১৮-১৯ অর্থবছরে খরচ হবে ৬৪ হাজার ৬৫৬ কোটি টাকা। অথচ তথ্যে দেখা যাচ্ছে, ২০০৫ সালে মাত্র ১৩ শতাংশ পরিবার ছিল সামাজিক নিরাপত্তার কর্মসূচির অধীনে। এর অর্থ কী? অসহায়, নিঃস্ব, গরিব ও দুর্বল শ্রেণির লোকের সংখ্যা বাড়ছে। বর্তমান ‘উন্নয়ন নীতিমালা’ ও কৌশল অব্যাহত থাকলে এই শ্রেণির লোকের সংখ্যা আরও বাড়বে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ সমাজ ধনী-গরিবে বিভক্ত হচ্ছে সারা দুনিয়ায়। সব সুযোগ-সুবিধা বিশ্বজুড়ে এক শতাংশ লোকের হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। এর থেকে মুক্তি আছে বলে মনে হয় না। এটাই ‘উন্নয়ন’ বলে চালু হচ্ছে। বলা হচ্ছে ‘দারিদ্র্য হার’ কমছে। তা-ই যদি হয়, তাহলে সামাজিক নিরাপত্তাবলয় বৃদ্ধি পাচ্ছে কেন? আর তা-ই যদি হয়, তাহলে প্রশাসনের পেছনে এত টাকা খরচ করা কি বুদ্ধিমানের কাজ? কম্পিউটারের যুগে প্রশাসনের আকার বাড়বে কেন? এ তো বড় প্রশ্ন। এই ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাজেটে এই প্রশ্ন একটি বড় প্রশ্ন।
স্থানাভাবে কর প্রস্তাবের সব আলোচনায় যাওয়া যাবে না। দুই-একটা কথা বলেই শেষ করব। এটা পরিষ্কার ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটের ‘হিরো’ হচ্ছেন ব্যাংক মালিকরা। স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের করহার হ্রাস করা হয়েছেÑছিল ৪০ শতাংশ, হবে ৩৭ দশমিক ৫০ শতাংশ। একই করহার প্রযোজ্য হবে নতুন বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে, যেগুলো স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত নয় এখনও। অর্থমন্ত্রী বেসরকারি ব্যাংকমালিকদের প্রতি যতটুকু সদয় হয়েছেন, তার ছটাকও যদি সাধারণ করদাতাদের প্রতি হতেন তাহলে তাদের কর কিছুটা কমাতেন। না, তিনি তা করেননি, বছরে পাঁচ-ছয় শতাংশ হারে মূল্যস্ফীতি ঘটার পরও। শেয়ারবাজারের জন্যও তিনি কিছু করলেন না। লভ্যাংশ আয়ে ২০ শতাংশ হারে কর দিতে হতো। ২০১৮-১৯ অর্থবছরেও তা-ই থাকবে। সম্পদ করের ক্ষেত্রেও (সারচার্জ) কোনো পরিবর্তন নেই। তবু একটা পরিবর্তন দেখছি। কোনো করদাতার নিজ নামে দুটো গাড়ি থাকলে, অথবা সিটি করপোরেশনে কারও আট হাজার বর্গফুটের বাড়ি-গৃহসম্পত্তি থাকলে তাকেও সারচার্জ দিতে হবে প্রচলিত ১০ শতাংশ হারে। এতে নতুন সম্পদ করদাতা পাওয়া কঠিনই হবে।

অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক