যৌক্তিক থাকুক গ্যাসের দাম বৃদ্ধির হার

চলতি মাস থেকে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) যুক্ত হবে জাতীয় গ্রিডে। দেশীয় গ্যাসের চেয়ে এর আমদানি ব্যয় বেশি বলে লোকসান কমাতে দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে বিতরণকারী সংস্থাগুলো। এ লক্ষ্যে ১১ জুন থেকে গণশুনানিরও আয়োজন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। বস্তুত আবাসিক ও বাণিজ্যিক বাদে দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে বিদ্যুৎকেন্দ্র, ক্যাপটিভ পাওয়ার, চা বাগান, সার ও শিল্প-কারখানা, গাড়িতে ব্যবহৃত সিএনজিসহ সব খাতেই। খাতভেদে দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে ২০ থেকে ৪৭২ শতাংশ। গ্যাসের মতো জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পেলে পণ্য উৎপাদন খরচসহ জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে উঠবে। বাস্তবতা বিবেচনায় গ্যাস বিতরণকারী কোম্পানিগুলোর প্রস্তাব না মেনেও উপায় নেই। আমরা মনে করি, বিতরণকারী কোম্পানিগুলোর বাস্তবতা আমলে নিয়ে দাম বাড়ানো হলেও সেটি থাকা উচিত যৌক্তিক পর্যায়ে। এক্ষেত্রে গণশুনানিতে উপস্থাপিত অংশীজনদের মতকে গুরুত্বসহ বিবেচনায় নেওয়া হবে বলেই আশা।
গত বছরের মার্চ ও জুলাইয়ে বিভিন্ন খাতে গ্যাসের দাম দুই ধাপে বাড়ানো হয়। সে সময়ও এ ইস্যুতে প্রশ্ন উঠেছিল বিভিন্ন মহল থেকে। এবারও হচ্ছে একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি। জ্বালানিটির দাম কয়েকগুণ বৃদ্ধির প্রস্তাব যেহেতু করা হয়েছে, সেহেতু প্রশ্ন উত্থাপনকে নেতিবাচক দৃষ্টিতেও দেখা যাবে না। সংশ্লিষ্টদের মনে রাখা দরকার, এবার কোম্পানিগুলো দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। কোনো কোম্পানিই চাইবে না আমদানি করা গ্যাস লোকসানে বিক্রি করতে। লাভ দূরে থাক, ক্রয়মূল্যের সঙ্গে আমদানি ও বিতরণ ব্যয় উঠে না এলেও কোম্পানিগুলোর পক্ষে দীর্ঘমেয়াদে এ সেবা জোগানো সম্ভব হবে না। এজন্য অংশীজনদের উচিত হবে গণশুনানিতে উপস্থিত হয়ে দাম বৃদ্ধির হার যৌক্তিক পর্যায়ে রাখার পক্ষের যুক্তিগুলো যথাযথভাবে উপস্থাপন করা।
যেসব খাতে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে, সেগুলোয় অপচয়ের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এটি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ওইসব খাতের প্রতিষ্ঠানকেও পড়তে হতে পারে ভিন্নতর সংকটে। আমরা চাইব, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এলএনজির দক্ষ ব্যবহারে জোর দেবে ওইসব প্রতিষ্ঠান। শুধু কর্মীর অদক্ষতা নয়, মেশিনপত্র পুরোনো হলেও গ্যাসের চাহিদা বেড়ে ওঠে বিশেষ কিছু শিল্প কারখানায়। এসব ক্ষেত্রেও দক্ষতা বৃদ্ধির পদক্ষেপ প্রত্যাশিত। এটি নিশ্চিত করা গেলে জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে অন্তত বাড়তি লোকসান গুনতে হবে না। গ্যাস চুরির অভিযোগও রয়েছেÑবিশেষত শিল্প কারখানার সঞ্চালন লাইন থেকে। এমন কর্মকাণ্ড যাতে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সে ব্যাপারেও কর্তৃপক্ষের জোর তদারকি কাম্য। মনে রাখা দরকার, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ে আমদানি হবে এলএনজি। দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার পরও প্রতিষ্ঠানগুলো যদি অপচয় রোধ ও জ্বালানির দক্ষ ব্যবহারে সচেতন না হয়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে।
গাড়িতে ব্যবহৃত কমপ্রেসড ন্যাচারাল গ্যাসের (সিএনজি) দাম বাড়লে সংশ্লিষ্ট পরিবহন কোম্পানিগুলোও যাত্রী ভাড়া বাড়াতে চাইবে। তাতে এর অভিঘাত দৃশ্যমান হবে জনজীবনে। অতীতে দেখা গেছে, সিএনজির দাম বাড়লে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় গণপরিবহন খাতে। একে যুক্তি হিসেবে দেখিয়ে পরিবহন কোম্পানিগুলো যাতে ইচ্ছামতো ভাড়া বাড়াতে না পারে, সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সংস্থাকেও থাকতে হবে সচেতন। মনে রাখা ভালো, জ্বালানির দাম বাড়ানো হলে মূল্যস্ফীতি হয় বিভিন্ন খাতে। আয়ের সঙ্গে আকস্মিকভাবে বর্ধিত এ ব্যয় সমন্বয়ের সুযোগ অনেক মানুষেরই হাতে নেই। এ অবস্থায় পরিবার পরিচালনার ব্যয় নির্বাহ কঠিন হয় বিশেষত নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের পক্ষে। সরকার যদি এদিকে দৃষ্টি না রাখে, তাহলে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিতে সমাজের নানা পর্যায়ে বাড়বে অস্থিতিশীলতা। সরকার সেটিও হ্যান্ডল করুক দক্ষতার সঙ্গে।