দীর্ঘসূত্রতায় আটকে আছে ১০ হাজার কোটি টাকা

চট্টগ্রামে সাড়ে চার বছরে তিন হাজার মামলা

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামে গত সাড়ে চার বছরে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা ঋণ খেলাপের দায়ে বিভিন্ন শিল্পগ্রুপ ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো দুই হাজার ৯৮০টি মামলা করেছে। এসব মামলায় ১০ কোটি টাকার বেশি অর্থের সংযোগ রয়েছে। কিন্তু মামলা নিষ্পত্তি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া হওয়ায় অর্থ আদায়ও বিলম্বিত হচ্ছে। এতে সংকটে পড়েছে ব্যাংকগুলো।
অর্থ আদায়ে যেসব ব্যাংক মামলা করেছে সেগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে বেসরকারি খাতের Ñন্যাশনাল ব্যাংক, এবি ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া ও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক। এছাড়া রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, রূপালী, অগ্রণী ও জনতা ব্যাংক লিমিটেড। এর বাইরে অন্য ব্যাংক এবং ব্যাংক বহির্ভুত আর্থিক প্রতিষ্ঠানও পাওয়া আদায়ে মামলা করেছে।
অর্থঋণ আদালত সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১০ মে পর্যন্ত খেলাপি ঋণের দায়ে ১১৫টি মামলা করে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো। এছাড়া ২০১৭ সালে ঋণ খেলাপের দায়ে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো মোট ৬৬৯টি মামলা করে, যা আগের বছরে ছিল ৭৪৪টি। ২০১৫ সালে মামলা করা হয়েছিল ৯৫৮টি। ২০১৪ সালে ৪৫৪টি। আর এসব মামলায় আটকে আছে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার অধিক।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রথম প্রজšে§র বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক ন্যাশনাল ব্যাংকের খেলাপি তালিকায় আছে দেশের বহুল আলোচিত তেল ব্যবসায়ী জহির আহম্মেদ রতন ও তার অন্যান্য ভাইয়ের মালিকানাধীন নূরজাহান গ্রুপ। এ গ্রুপের কাছে ব্যাংকটির ২০১৫ সালে বার্ষিক প্রতিবেদন অনুসারে অনাদায়ী দেনার পরিমাণ ছিল ৬০১ কোটি টাকার অধিক। এ তালিকায় আরও আছে চট্টগ্রামের আলোচিত তেল ব্যবসায়ী শামসুল আলমের পারিবারিক মালিকানাধীন এমইবি গ্রুপ। ব্যাংকটির আগ্রাবাদ শাখায় এমইবি গ্রুপের ২১৬ কোটি ২২ লাখ টাকা খেলাপি ঋণ। এ ঋণ খেলাপের তালিকায় আরও আছে চট্টগ্রামের শিল্পগ্রুপ মোস্তফা গ্রুপের ১৪৮ কোটি ২৭ লাখ টাকা, চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী আবদুল হাইয়ের মালিকানাধীন লিজেন্ড হোল্ডিংসের ১৬২ কোটি টাকা, ছগির অ্যান্ড ব্রাদার্সের ১৩৯ কোটি টাকা এবং চিনি বশর নামে পরিচিতি চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী হাজী আবুল বশরের মালিকানাধীন আহাদ ট্রেডিং ও জালাল অ্যান্ড সন্সের ১৬৮ কোটি টাকা। আর সদ্য এ তালিকায় যুক্ত হয়েছে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী ও ফারমার্স ব্যাংকের পরিচালক আবু আলমের মালিকানাধীন এহসান গ্রুপের ৪৭৬ কোটি ৯১ লাখ টাকা। আর এসব পাওনাগুলো মিলে হয় প্রায় এক হাজার ৯১১ কোটি টাকার বেশি, যা ন্যাশনাল ব্যাংকের গত পাঁচ বছরের নিট মুনাফার চেয়েও বেশি। প্রতিষ্ঠানটির ২০১৬ সালে নিট মুনাফা ছিল ৫৫৬ কোটি ৭৮ লাখ টাকা।
ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেডের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট নিজাম উদ্দিন শেয়ার বিজকে বলেন, বিচার না হওয়া, সীমাহীন দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার খেলাপি ঋণের পেছনে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে। আর এ সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে আগামীতে এ খেলাপি ঋণ আরও বাড়বে। অপরদিকে দেশে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ আসছে না। ব্যবসা-বাণিজ্যে ফিরছে না গতি। এমন পরিস্থিতিতে একদিকে যেমন ব্যাংকের ঋণ বিতরণ বাড়ছে না, অন্যদিকে আগে বিতরণ হওয়া ঋণের টাকাও ফেরত পাচ্ছে না ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের খেলাপি ঋণসংক্রান্ত সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো মোট ঋণ বিতরণ করেছে সাত লাখ ৯৮ হাজার ১৯৫ কোটি ৭১ লাখ টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়ে পড়েছে ৭৪ হাজার ৩০৩ কোটি ১১ লাখ টাকা। এর এক বছর আগে ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে এ খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৬২ হাজার ১৭২ কোটি টাকা। আর ২০১৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এ খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ৫১ হাজার ৩৭১ কোটি টাকা। এছাড়া অবলোপনকৃত ৫৫ হাজার ৩১১ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ মামলায় আটকে আছে। এ ঋণ হিসাবে নিলে খেলাপি ঋণের অঙ্ক দাঁড়াবে এক লাখ ২৯ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা। অবলোপনকৃত ঋণ মন্দ ঋণ হওয়ায় নীতিমালা অনুযায়ী এসব ঋণ ব্যাংকের খেলাপি ঋণের আর্থিক প্রতিবেদন থেকে আলাদা করে রাখা হয়। এছাড়া তথ্য গোপন করে বিপুল অঙ্কের খেলাপযোগ্য ঋণকে খেলাপি না দেখানোর অভিযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মো. রাজী হাসান বলেন, খেলাপি ঋণ ক্রমে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের জন্য সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঋণখেলাপি মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থাকে সুসংহত করতে হবে। এ ব্যবস্থাকে ত্বরান্বিত ও কার্যকর করতে বাংলাদেশ ব্যাংক সব ধরনের সহায়তা প্রদানে প্রস্তুত। এরই মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি উপদেশপত্রের মাধ্যমে দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের প্রতি বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তিতে বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল আরবিট্রেশন সেন্টারের (বিয়াক) সহায়তা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
ব্যাংক ও অর্থঋণ আদালতের সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে আরও দেখা যায়, ভোজ্যতেল আমদানিকারক, আবাসন নির্মাতা, পোশাক উৎপাদন ও জাহাজভাঙা শিল্পপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ধরনের পাইকারি পণ্য বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসায়িক প্রয়োজনের বিভিন্ন সময় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ঋণ নিয়ে সময়মতো পরিশোধ করতে না পেরে খেলাপি হয়ে পড়ে। এর মধ্যে ব্যাংক খাতের বহুল আলোচিত ঋণখেলাপির তালিকায় আছে সিলভিয়া গ্রুপ, এমইবি গ্রুপ, নুরজাহান গ্রুপ, এসএ গ্রুপ, রাইজিং গ্রুপ, ক্রিস্টাল গ্রুপ, মাবিয়া গ্রুপ, মোস্তফা গ্রুপ, মেরিন গ্রুপ, এহসান গ্রুপ, বনলতা গ্রুপ, ইমাম গ্রুপসহ আরও কিছু গ্রুপ। এছাড়া একক ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের তালিকায় আছে সিদ্দিক ট্রেডার্স, শাহেদ শিপ ব্রেকিং লিমিটেড, শাহ আমানত আয়রন, এ মেরিন টেকনিক্যাল সার্ভিসেস, সুলতানা শিপ ব্রেকিং লিমিটেড, জাহিদ এন্টারপ্রাইজ, টেকনো বিল্ডার্স, সী টেক্স, বেনজা স্টিল, এসকে শিপ বিল্ডার্স অ্যান্ড স্টিল লিমিটেড, মার্ক শিপ ব্রেকিং, এম রহমান স্টিল মিল, মাস্টার্ড ট্রেডিং, লাকি শিপ বিল্ডার্স, এ জামান অ্যান্ড ব্রাদার্স, রুবিয়া ভেজিটেবল অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, চিটাগং ইস্পাত লিমিটেড, ইয়াসির এন্টারপ্রাইজসহ আরও অনেকে। ফলে এসব গ্রুপের কাছে বিভিন্ন ব্যাংকের পাওনা আছে প্রায় দশ হাজার কোটি টাকারও বেশি। কিন্তু বিপুল পরিমাণে পাওনা আদায়ে চিন্তিত ব্যাংক ব্যবস্থাপকরা।
চট্টগ্রামের মোস্তফা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা শেয়ার বিজকে বলেন, খেলাপি ঋণ কাটিয়ে ওঠার জন্য ক্ষতিগ্রস্ত প্রকৃত ব্যবসায়ীদের দীর্ঘমেয়াদি সুদ আরোপ স্থগিত করে দীর্ঘমেয়াদি কিস্তিতে পরিশোধে সুযোগ দিতে হবে। পাশাপাশি নতুনভাবে ব্যবসা পরিচালনা করার জন্য সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করতে হবে। আর ব্যাংকগুলোর বিবেচনা করতে হবে, ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে গুণগত মান, সঠিক ব্যবসায়ী যাচাই, এক খাতে একাধিক ব্যবসায়ীকে ঋণ না দেওয়া, কৃষি ও উৎপাদনমুখী খাত দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ইত্যাদি। এছাড়া নতুন ব্যাংকের নিবন্ধন না দেওয়াসহ ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের ঋণ গ্রহণের ক্ষমতা সীমিত করা। তিনি আরও বলেন, আমার গ্রুপের ঋণের বিপরীতে এ পর্যন্ত হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করলেও মূল ঋণের টাকা কমেনি। ব্যাংকগুলো সুদের ওপর সুদ গুনে যাচ্ছে। অথচ সব ধরনের সক্ষমতা থাকার পরও আমরা ব্যবসা পরিচালনা করতে পারিছ না একমাত্র ব্যাংকিং সহযোগিতা না পাওয়ায়।