পর্ব-৫ : আত্মনির্মাণ ও প্রত্যাবর্তন

শামসুন নাহার: অল্পদিনেই ধীরুর কর্মজ্ঞান ও বুদ্ধিদীপ্ত যোগাযোগ দক্ষতা চোখে পড়েছিল কর্মকর্তাদের। প্রমোশন হলো তার। মাত্র ২১ বছর বয়সে শেল ও বার্মা লুব্রিক্যান্টসের পণ্য বাণিজ্যের দায়িত্ব দেওয়া হলো তাকে। এ কাজে তাকে যেতে হতো ফ্রেঞ্চ সোমালিল্যান্ড, বেরবেরা, হারগেইসা, অ্যাসেম, ইরিত্রিয়া, সোমালিয়া ও ইথিওপিয়া। এসব অঞ্চলের কোথাও কোথাও জাহাজ পৌঁছতে পারত না। তখন দুই মাস্তুলের ছোট জাহাজে করে পণ্য নামাতে হতো। এ. বেসিতে কাজে সুবাদে বিভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে মেশার সুযোগ হয় ধীরুর। সে বুঝতে পারে, এ অভিজ্ঞতা অমূল্য। নানা রকম মানুষের সঙ্গে ব্যবসায়িক আলাপচারিতা তাকে আরও পরিপক্ব করে তোলে।

জনা-পঁচিশেক গুজরাটি শ্রমিক-কর্মীর সঙ্গে মেসবাসায় থাকতেন ধীরুভাইÑ প্রায় সবাই সমবয়সী। ঠাট্টা-তামাশায় এই এক দল তরুণকে অস্থির করে রাখতেন ধীরু। নিজের শক্তসামর্থ্য শরীর নিয়ে খুব গর্ব ছিল তার। গোসলের সময় আর সবার মতো কোমরে তোয়ালে জড়িয়ে রাখতেন না তিনি। নিজে তো পুরোপুরি উদোম হয়ে শাওয়ার নিতেনই, টান মেরে অন্যদের তোয়ালে কেড়ে নিতেন। গোসলের সময় এটা ছিল তার প্রতিদিনের দুষ্টুমি। মেসের ছেলেরাও তটস্থ হয়ে থাকত, এই তো পাজিটা এসে গেছে। কে জানে আবার কোন যন্ত্রণা শুরু করে। অবশ্য আন্তরিক আচরণের কারণে প্রাণোচ্ছল ধীরুভাইকে তারা খুব ভালোও বাসতেন।

এডেনে থাকার মজাই আলাদা। কোনো ট্যাক্স নেই, বিদ্যুৎ বিল নেই। খরচ-খরচাও খুব কম। চাইলে আয়ের প্রায় অর্ধেকই জমিয়ে ফেলা যায়। ধীরু টাকা জমাতে থাকলেন। সঙ্গে বুঝতে পারলেন ইংরেজি ভাষাটা ভালো করে শিখে নিতে হবে। ইংরেজি পড়তে পারলেও বলতে গেলে বেশ ঝামেলাতেই পড়তে হয় তাকে। সে সময়ে পত্রিকা পড়ার অভ্যাস ছিল কমবেশি সবারই। জš§ভূমি, নবজীবনের সঙ্গে টাইমস অব ইন্ডিয়া পড়া শুরু করলেন ধীরুভাই। সঙ্গে বিস্তর ইংরেজি সাহিত্যের বই। পড়ার সময় সঙ্গে ডিকশনারি থাকত। নতুন শব্দ পেলেই নোটবুকে তুলে রাখতেন তিনি। এভাবে ভাষাটি চমৎকার আয়ত্ত হলো, সঙ্গে সমৃদ্ধ হলো শব্দভাণ্ডার। কেবল ভাষা শেখা নয়, সাহিত্য পাঠের ফলে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হলো ধীরুর। তিনি অনুধাবন করলেন, মানুষকে চালিত করতে হলে মানবপ্রকৃতি বুঝতে হবে। মানুষ যে বস্তুটি সবচেয়ে বেশি চায়, তা হলো ভালোবাসা। তাকে ধমকে যে কাজ করানো যায় না, প্রশংসা করে তার চেয়ে অনেক বেশি করানো যায়। বই পড়ে ধীরুভাই বুঝতে পারলেন, সম্মান ও স্নেহ-মমতার জন্য মানুষ কত কী করতে পারে, কীভাবে ভালো নেতা হওয়া যায়, কীভাবে বদ্ধমূল বিশ্বাস বা অন্তর্গত ধারণা মানুষকে চালিত করে, মানুষে মানুষে বিদ্বেষ তৈরি করে এবং এ ধারণা থেকে বের হওয়ার উপায়ই বা কী।

পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর লেখা ‘গ্লিম্পস অব ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রি’ ও ‘ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া’ ধীরুভাইয়ের চিন্তার জগতে নতুন দুয়ার খুলে দেয়। তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন, মানুষ চাইলে সব করতে পারে। মানুষ গুহার অন্ধকারে মাকড়সা বা তেলাপোকার জীবন নিয়ে আসেনি। সে অমূল্য মানবজনম পেয়েছে। গুহা থেকে বের হয়ে হাজারো প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে আজকের সভ্য মানুষে পরিণত হয়েছে। একজন ভারতীয় হিসেবে সে গর্ব অনুভব করে। ভারতের অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে গিয়ে এ ভূখণ্ডের অমিত সম্ভাবনার কথাই কেবল মনে আসে তার। আবহাওয়া, জলবায়ু ও ভূপ্রকৃতির দিক থেকে পৃথিবী অন্যতম সমৃদ্ধ দেশ ভারত। বিভিন্ন প্রকার প্রাকৃতিক সম্পদে পূর্ণ ও প্রায় সব ধরনের ফসল ফলানোর উপযোগী ভারতের মাটি ও জলবায়ু। সঙ্গে রয়েছে বিপুল এক পরিশ্রমী জনগোষ্ঠী। এ জনশক্তিকে যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারলে কী না সম্ভব! নেহরুর লেখা পড়তে পড়তে ধীরু কখনও উত্তেজিত হয়ে ওঠেন, কখনও আবার ভাষার গাঁথুনি দেখে মুগ্ধ হন। ভাষার কী অনন্য ব্যবহার! কিছু শব্দ মোলায়েম আবার কিছু অলঙ্কৃত। জটিল তত্ত্বগুলোরও কী সহজ উপস্থাপনা। সব মিলিয়ে কী চমৎকার ঝরঝরে সাহিত্যমণ্ডিত অভিব্যক্তি। চিন্তার কী অসাধারণ প্রকাশ! যতই পড়ে ততই অভিভূত হন ধীরুভাই। একটা ব্যাপার তিনি নিশ্চিত বুঝতে পারেন। ভাষা মানুষের জীবনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। শুধু ভাষাকে সঠিকভাবে ব্যবহার করেই অনেক মানুষকে প্রভাবিত করা যায়, মানুষের হৃদয় জয় করা যায়। তাকে ভাষা ব্যবহারে সতর্ক হতে হবে। অনুসরণ করতে হবে সফল মানুষদের।

১৯৫৪ সাল। মায়ের চিঠি পেয়ে বাড়ি যান ধীরুভাই। শেষ বাড়ি গিয়েছিলেন তিন বছর আগে, বাবার মৃত্যু সংবাদ পেয়ে। এবার সুখবর। তার জন্য কনে দেখা হয়েছে। মা জমেনাবেন অনেক খুঁজে পছন্দ করেছেন। জামনগরের পোস্টমাস্টারের মেয়ে কোকিলা প্যাটেল। বাবার পয়সাকড়ি খুব না থাকলেও মোধ ঘরের মেয়ে। ঠিক মিলবে ধীরুর সঙ্গে। কিন্তু নিজে না দেখে বিয়ে করবেন না ধীরুভাই। অবশেষে নিজে দেখে পছন্দ করে তবে বিয়ের পিঁড়িতে বসলেন। অল্প ক’দিনের ছুটি যেন চোখের পলকে ফুরিয়ে গেল। বউ নিয়ে এডেনে ফিরে এলেন ধীরুভাই। এক বেডরুমের ছোট্ট একটি বাসায় শুরু হলো তার সংসার।

সময়ের সঙ্গে এ. বেসিতে বেশ উন্নতি হচ্ছিল ধীরুর। সামান্য পেট্রল স্টেশনের শ্রমিক থেকে ধাপে ধাপে পদোন্নতি পেয়েছেন তিনি। এখন বিভিন্ন দেশে কোম্পানির পণ্য শিপমেন্টের কাজে যুক্ত হয়েছেন। পরিশ্রম ও যোগ্যতা দিয়ে মাত্র পাঁচ বছরেই এত দূর পৌঁছানো সোজা কথা নয়। কিন্তু এ অর্জনে তৃপ্ত হতে পারেন না ধীরু। এ. বেসিতে থাকলে ভবিষ্যতে আরও উন্নতি করা সম্ভব। কোনো কাজে তার আলসেমি নেই। কোনো কাজকে খাটো করেও দেখেন না তিনি। পিয়নের জন্য বসে না থেকে নিজেই ঝড়ের গতিতে করে ফেলেন দরকারি টুকিটাকি কাজ। কিন্তু সারাজীবন প্রতিষ্ঠানের কর্মী হিসেবে ধীরু নিজেকে ভাবতে পারেন না। অনেক বড় স্বপ্ন তার। নিজের ওপর বিশ্বাসও তার প্রবল। তিনি বিশ্বাস করেন, এমনকি এ. বেসির মতো বড় কোম্পানি পরিচালনার যোগ্যতা অর্জন করা তার পক্ষেও সম্ভব। তাই এ কোম্পানির একজন সামান্য কর্মী হিসেবে খুশি থাকা তার জন্য সম্ভব নয়। নিজের ব্যবসা শুরু করতে হবে। শুধু পয়সার অভাবে তার স্বপ্ন অধরা থেকে যাবেÑএটা মেনে নিতে রাজি নন তিনি। শুরু হলো ভিন্ন পথে চলা। কমোডিটি মার্কেট সম্পর্কে তার ভালো ধারণা ছিল। স্থানীয় বাজারে ঘুরে ঘুরে আরবীয়, ভারতীয় ও ইহুদি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে জানাশোনাও ছিল বেশ। পণ্যবাজারে পজিশন নিলেন। শুরু হলো এক্সপেরিমেন্ট। দাম ওঠানামার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পাইকারি বাজারে চাল ও চিনি কেনাবেচা করতে লাগলেন। তিনি একে ব্যবসা না বলে বলতেন ‘মার্কেট স্টাডি’।

ব্যবসায়ে লাভ মন্দ হয়নি। কিন্তু বড় রকমের ঝামেলায় পড়তে হয়েছিল। চিনিভর্তি একটি কার্গো ঝড়ের কবলে পড়ে। আমদানি করা চিনি সাগরের পানিতে সম্পূর্ণ নষ্ট হয়। অন্যদিকে ইন্স্যুরেন্সের টাকা পেতেও লেগে যাবে কয়েক মাস। তবে পাইকাররা সে কথা শুনবে কেন। বিপদেই পড়লেন ধীরুভাই। শেষমেশ বন্ধুপ্রতিম সহকর্মীদের কাছ থেকে ধার নিয়ে পাইকারদের দেনা শোধ করতে হয়েছে। এ নিয়ে অবশ্য আক্ষেপ নেই তার। ঝামেলা পোহাতে হলেও তার ‘মার্কেট স্টাডি’ থেকে অনেক অভিজ্ঞতাই সঞ্চয় করেছেন। কিন্তু এ. বেসির কর্মীদের স্বাধীন ব্যবসায়ের অনুমতি ছিল না। যথারীতি নোটিস এলো তার বিরুদ্ধে।

বন্ধুর অভাব কোনোকালেই ছিল না ধীরুর। এদের মধ্যে কেউ কেউ অনেক বেশিই অনুরক্ত ছিলেন তার। এমনই একজন যমুনাদাস শেখরচাঁদ দেপালা। বৈবাহিক সূত্রে এ আত্মীয়টি প্রাকৃতি দুর্যোগে সাগরে চিনি নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর সংকট সামাল দিতে একাই পাঁচ হাজার শিলিং ধার দেন। ধীরু ও দেপালার সম্পর্কটি একেবারে অন্যরকম। দুপুরের খাবার তারা একসঙ্গে খেতেন। এমনকি বিয়ের পরেও। মাঝেমধ্যে ধীরুভাই খুব বেশি মদ্যপান করে ফেলতেন। থামার নাম নিতেন না। কেউ থামাতে এলে স্রেফ গালমন্দ করে তেড়ে আসতেন। কোকিলাবেন তখন উপায়ান্তর না পেয়ে ফোন করতেন দেপালাকে। দেপালা এসে বুঝিয়ে বললেই ধীরুভাই চুপচাপ মদের গ্লাসটি রেখে দিতেন। বন্ধুত্বকে এভাবেই সম্মান করতেন ধীরু।

যা হোক, চাকরির পাশাপাশি ব্যবসা করার কারণে ধীরুভাইকে কোম্পানি থেকে বরখাস্ত করার গুঞ্জন উঠল। তখন দেপালা সব দায় নিজের কাঁধে নিলেন। তিনি ম্যানেজমেন্টকে বললেন, ব্যবসাটা মূলত আমার ছিল। ধীরু কেবল পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করেছে। দেপালাকে বরখাস্ত করা হলো। চিরতরে কৃতজ্ঞতায় বাধা পড়লেন ধীরু। দেপালা তার এ বন্ধুটিকে বুঝতেন। তিনি জানতেন, ধীরু দিন-রাত স্বপ্ন দেখে বড় কিছু করার। তার স্বপ্ন সফল করতে এ সময়ে চাকরিটা খুব দরকার ধীরুর। তাছাড়া এডেনে ধীরুর প্রায় ছয় বছর হয়েছে। আর মাত্র এক বছর পূর্ণ হলেই স্থায়ী বসবাসের অধিকার পাবেন তিনি। সব হিসাবে করে বন্ধুর জন্য নিজের চাকরিটা উৎসর্গের পথই বেছে নিলেন যমুনাদাস দেপালা।

ধীরুভাই এডেনের বাজারে চাল-চিনিসহ অন্যান্য পণ্য আমদানির ব্যবসা করেছিলেন আরও কয়েক বছর। ১৯৫৭ সালে ঠিক করলেন, সময় এসেছে দেশে ফেরার। সে বছরই কোকিলাবেনের কোলজুড়ে এসেছে তাদের প্রথম সন্তান মুকেশ আম্বানি। ঠিক পরের বছর অর্থাৎ ১৯৫৮ সালে স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে চোরবাদে ফিরলেন ধীরুভাই।