প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

দুই অঙ্কে ফিরছে এক অঙ্ক সুদে ঋণ দেওয়া ব্যাংক

আমানতে টান

শেখ আবু তালেব: ব্যাংকের উচ্চ সুদের কারণে ব্যবসা করতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা। খেলাপি ঋণ বৃদ্ধিও এজন্য দায়ী। এসব দাবি তুলে কিছু সুবিধার বিনিময়ে ব্যাংক ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে (এক অঙ্কে) নামিয়ে আনতে প্রধানমন্ত্রীকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ব্যাংকের উদ্যোক্তা পরিচালকরা। এজন্য চারটি সুবিধা নিয়েছিলেন তারা। এরপর বাংলাদেশ ব্যাংক ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অলিখিত চাপে সরকারি-বেসরকারি ১৫ ব্যাংক ঋণের সুদহার এক অঙ্কে অর্থাৎ ৯ শতাংশে নামিয়ে এনেছিল। এখন ব্যাংকগুলো ফের দুই অঙ্কের সুদে ঋণ দেওয়া শুরু করেছে বলে ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, এক অঙ্ক সুদহার বাস্তবায়নে ১৫ ব্যাংক এগিয়ে এসেছিল। কিন্তু এখন ব্যাংক খাতে আমানত সংকট তীব্র আকার ধারণ করছে। কয়েকটি ব্যাংকের দৈনন্দিন কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে ধার করে। এজন্য আমানত সংগ্রহ বাড়াতে ব্যাংকারদের বিভিন্ন ধরনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দিয়েছে ব্যাংকগুলো। আমানত সংগ্রহে কোনো ব্যাংক ১২ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দেওয়ার কথা দিয়েছে। ফলে সুদহার বৃদ্ধি হচ্ছে প্রায় সবগুলো ব্যাংকের। এতে এক অঙ্কে ব্যাংকের সুদহার বাস্তবায়ন হওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছেন না ব্যাংকাররা।
জানা গেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের সোনালী, জনতা, অগ্রণী, বেসিক, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ করেছিল।
অপরদিকে বেসরকারি খাতের মধ্যে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড, ন্যাশনাল ব্যাংক, এনআরবি গ্লোবাল, পূবালী ও সিটি ব্যাংক এনএ ৯ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ শুরু করেছিল। বিতরণ করা ঋণের পাশাপাশি ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ শিল্পে চলতি মূলধন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদে ঋণ দিয়েছিল ব্যবসায়ীদের এসব ব্যাংক।
এর আগে ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছিল ব্যাংক উদ্যোক্তা পরিচালকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি)। এক বৈঠক করে এ সিদ্ধান্ত সব ব্যাংককে জানিয়ে দেয় তারা। ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংককে পাশ কাটিয়ে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু পরবর্তীকালে এ নিয়ে সমালোচনার শিকার হলে তারা প্রধানমন্ত্রীর কাছে যায়। প্রধানমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করে সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনবে। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে চারটি সুবিধা নেওয়া হয়।
এসবের মধ্যে ছিল ব্যাংকগুলোর করপোরেট ট্যাক্স ৪০ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ৩৭ শতাংশ করা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বাধ্যতামূলক নগদ জমার হার (সিআরআর) সাড়ে ছয় শতাংশ থেকে এক শতাংশ কমিয়ে সাড়ে পাঁচ শতাংশ করা, সরকারি আমানত ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকে জমা রাখা এবং আপদকালীন সংকট মেটাতে স্বল্পসময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ধার নেওয়ার হার (রেপো রেট) পৌনে সাত শতাংশ থেকে কমিয়ে ছয় শতাংশে নামিয়ে আনা।
কিন্তু এখন সরকারি ব্যাংকগুলো এক অঙ্কে সুদ দেওয়া অব্যাহত রাখলেও বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলো তা করছে না। গত মার্চ পর্যন্ত এক অঙ্ক সুদে ঋণ দিয়েছিল ব্যাংকগুলো। এরপর থেকে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশে আর ঋণ দিচ্ছে না বেসরকারি বেশিরভাগ ব্যাংকই।
বাংলাদেশ ব্যাংকে দেওয়া ব্যাংকগুলোর এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এপ্রিলে সব ধরনের ঋণের বিপরীতে সুদহার বাড়িয়েছে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলো। তবে সরকারি খাতের মধ্যে ব্যতিক্রম রয়েছে এখনও রূপালী ব্যাংক। বিভিন্ন খাতে ৯ শতাংশ ঋণ দেওয়ার কথা বললেও তা সর্বনিন্ম হার। ব্যাংকটি সর্বোচ্চ সুদ নিচ্ছে ১১ শতাংশ হারে। এমনকি ক্ষুদ্রশিল্পের বেলায়ও এই হারে সুদ নিচ্ছে ব্যাংকটি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল শেষে সরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর সব ধরনের ঋণে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদ দেওয়ার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংককে। কিন্তু বেসরকারি খাতের ইসলামী ব্যাংক মাঝারি ও বৃহৎ শিল্প খাতের ঋণের সুদহার ৯ থেকে বৃদ্ধি করে ১৩ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত নিচ্ছে। একই সুদহার ক্ষদ্রশিল্পের বেলায়ও। চলতি মূলধন দেওয়ার ক্ষেত্রে সুদ নিচ্ছে সর্বোচ্চ ১৬ শতাংশ হারে। এখানেও সুদের সর্বনিন্ম হার ধরা হয়েছে ১৩ শতাংশ।
ব্যাংকটি ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সুদ নিচ্ছে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঋণ দিতে। এক্ষেত্রে সাড়ে ১৩ থেকে সর্বোচ্চ সাড়ে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত সুদ নিচ্ছে। এ বিষয়ে ইসলামী ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু রেজা মো. ইয়াহিয়া শেয়ার বিজকে বলেন, ‘এ বিষয়ে কোনো তথ্য এখন আমার কাছে নেই। খোঁজ নিয়ে জানাতে পারব।’
এছাড়া ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক সব ধরনের ঋণের সুদহার বৃদ্ধি করেছে। ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ শিল্পে ঋণের সর্বনিন্ম সুদ নিচ্ছে ১৫ শতাংশ। ব্যাংকটি সর্বোচ্চ সুদ নিচ্ছে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত। শিল্পের পাশাপাশি চলতি মূলধনের ক্ষেত্রেও একই হারে সুদ নিচ্ছে।
বেসরকারি খাতের ন্যাশনাল ব্যাংকও এক অঙ্কে ঋণ দেওয়া থেকে সরে এসেছে। ব্যাংকটি বৃহৎ ও মাঝারি খাতের শিল্পে ঋণ দিচ্ছে সর্বনিন্ম ১১ থেকে সর্বোচ্চ ১৪ শতাংশে। ক্ষুদ্র শিল্পে সর্বনিন্ম ১৩ থেকে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত সুদ নিচ্ছে। ব্যাংকটি শুধু কৃষি খাতে ৯ শতাংশ সুদে ঋণ দিচ্ছে। বাকি সব খাতেই ডাবল ডিজিটে ঋণ দিচ্ছে।
প্রবাসীদের উদ্যোগে গঠিত এনআরবি গ্লোবাল মাঝারি ও বৃহৎ শিল্পে ঋণ দিচ্ছে ১৫ শতাংশ সুদে। একই হারে ঋণ দিচ্ছে ক্ষুদ্রশিল্পের পাশাপাশি চলতি মূলধনের বেলায়ও। পূবালী ব্যাংক সর্বনিন্ম ৯ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়ার কথা বললেও ঋণ দিচ্ছে সর্বোচ্চ ১৩ শতাংশ হারে।
ইসলামী ধারার আরেক ব্যাংক আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক শিল্প ঋণে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়া অব্যাহত রাখলেও গৃহ ও ভোগ্যপণ্য ঋণে সুদ নিচ্ছে ১৩ থেকে ১৬ শতাংশ হারে।
যদিও বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক ও বহুজাতিক সিটি ব্যাংক এনএ সুদহার ৯ শতাংশের মধ্যেই রেখেছে। ঘোষণা দিয়েও ব্যাংকের সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনতে না পারার বিষয়ে বিএবি’র চেয়ারম্যান সৈয়দ নজরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কোনো ধরনের মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংককে পাশ কাটিয়ে জোর করে আমানত ও ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার বিএবি’র ঘোষণা বিষয়ে দেশের অর্থনীতিবিদরা বিরোধিতা করেছিলেন। তারা বলেছিলেন, সুদহার বাজার ব্যবস্থার ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত। এটিই মুক্তবাজার অর্থনীতির চর্চা। অর্থনীতিতে অযাচিত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ঠিক নয়। এতে আর্থিক খাতে নৈরাজ্য বৃদ্ধি পায়।

 

সর্বশেষ..