প্রচ্ছদ শেষ পাতা

দুই নিয়ন্ত্রকের সমন্বয়হীনতায় বিপাকে ব্যাংক ও আর্থিক খাত

নমিনেশন অ্যান্ড রেমুনারেশন কমিটি আইনসিদ্ধ নয়

পলাশ শরিফ: তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে ২০১৮ সালে নমিনেশন অ্যান্ড রেমুনেরেশন কমিটি (এনআরসি) গঠনের নির্দেশনা দিয়েছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। সংস্থাটির করপোরেট গভর্ন্যান্স গাইডলাইনে এ-সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। এ নির্দেশনায় বিপাকে পড়েছে ব্যাংক ও আর্থিক খাতের কোম্পানিগুলো।
বিদ্যমান ব্যাংক কোম্পানি আইন মেনে ওই কমিটি গঠনের সুযোগ নেই। বরং এ-সংক্রান্ত কমিটি গঠনে ২০১৩ সালের অক্টোবরে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ব্যাংকিং খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক। এক নিয়ন্ত্রক সংস্থার ‘নিষেধাজ্ঞা’র মধ্যেই অন্য সংস্থার ‘বাধ্যবাধকতা’য় বিপাকে পড়েছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৫৩টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান।
‘ব্যাংকিং কোম্পানি আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক গাইডলাইন প্রণয়নের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএসইসির সমন্বয়হীনতার চিত্রই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে’ বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিষয়ের অধ্যাপক ও পুঁজিবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদ। তিনি শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমরা বারবারই নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের কথা বলছি। এজন্য কমিটি হচ্ছে, আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে সেগুলোর প্রভাব নেই। থাকলে বিদ্যমান আইন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে সিজিজিতে এনআরসির বাধ্যবাধকতা দেওয়া হতো না।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৮ সালে করপোরেট গভর্ন্যান্স গাইডলাইন (সিজিজি) সংশোধন করেছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ওই গাইডলাইন প্রণয়ন করা হয়েছিল। সংশোধনের পর তালিকাভুক্ত কোম্পানির পরিচালক ও শীর্ষ নির্বাহী মনোনয়ন এবং তাদের বেতন-ভাতা নির্ধারণের জন্য তিন সদস্যের কমিটি রাখার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। পরিচালনা পরিষদকে সিজিজির নির্দেশনা মেনে একজন স্বতন্ত্র পরিচালককে চেয়ারম্যান করে ওই কমিটি গঠন করতে হবে। ওই কমিটি প্রতি আর্থিক বছরে কমপক্ষে একবার মিটিং করবে। আর কমিটির সাচিবিক দায়িত্ব পালন করবেন সংশ্লিষ্ট কোম্পানির সচিব।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ শেয়ার বিজকে বলেন, ‘বিএসইসির গাইডলাইন ব্যাংক কোম্পানি আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলে কোম্পানিগুলোকে আইন মানতে হবে। আইন ভেঙে বিএসইসির গাইডলাইন মেনে চলার সুযোগ নেই। আর এক্ষেত্রে গাইডলাইন ভঙ্গের দায় কোম্পানির নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যাংক কোম্পানি আইন জেনে-বুঝে সিজিজি প্রণীত হলে এ জটিলতা হতো না। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিএসইসি চাইলে এ বিষয়ে নতুন নির্দেশনা দিতে পারে। কিংবা তাদের গাইডলাইন বাস্তবায়ন করতে চাইলে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের সুপারিশ করতে পারে।’
যদিও বাধ্যবাধকতা থাকলেও বিএসইসির ওই নির্দেশনা মানতে পারছে না পুঁজিবাজারের ৫৩টি ব্যাংক ও নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান। কারণ ব্যাংক কোম্পানি আইন মেনে ব্যাংক-আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারিত কমিটির বাইরে আর কোনো কমিটি গঠনের সুযোগ নেই। যে কারণে ২০১৩ সালের ২৭ অক্টোবর এনআরসি গঠন বিষয়ে নিষেধাজ্ঞাও দিয়েছে ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক। তাই আইন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনার কারণে বিএসইসির ওই নির্দেশনা মানতে পারছে না কোম্পানিগুলো। আর নমিনেশন অ্যান্ড রেমুনেরেশন কমিটি না গড়ায় বিএসইসির পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। যার বিপরীতে কোম্পানিগুলোকে ব্যাংক কোম্পানি আইন ও সিজিজির মধ্যকার সাংঘর্ষিক দিক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নিষেধাজ্ঞার তথ্য তুলে ধরে বিএসইসির কাছে ব্যাখ্যা দিতে হচ্ছে। উদ্ভূত আইনি ঝামেলা থেকে নিষ্কৃতি পেতে দুই সংস্থার সমন্বয় ও নির্দেশনা সংশোধন চাইছেন ব্যাংক-আর্থিক খাত সংশ্লিষ্টরা।
ব্যাংক ও আর্থিক খাতের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্রের তথ্যমতে, এনআরসি বিষয়ে সিজিজির নির্দেশনা লঙ্ঘনের কারণে বেশ কয়েকটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে চিঠি পাঠিয়েছে বিএসইসি। এর বিপরীতে ব্যাখ্যাও দিচ্ছে ব্যাংক-আর্থিক খাতের কোম্পানিগুলো। বিদ্যমান আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ওই নির্দেশনা সংশোধন না হলে প্রতি বছরই কোম্পানিগুলোকে প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সাইফুর রহমান শেয়ার বিজকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো জটিলতার তথ্য পাইনি। সিজিজি কোনো আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলে ও কোম্পানিগুলো আপত্তি জানালে সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করে পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। প্রয়োজনে সেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

 

সর্বশেষ..