মত-বিশ্লেষণ

দুই শতাংশ ও ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণ কার স্বার্থে!

মোহাম্মাদ মহিউদ্দিন: তালিকাভুক্ত কোম্পানির স্বতন্ত্র পরিচালক ব্যতীত উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের সম্মিলিতভাবে ৩০ শতাংশ এবং পরিচালকদের দুই শতাংশ শেয়ার ধারণ করার ব্যাপারে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ স্টক এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এখন থেকে যেসব কোম্পানির উদ্যোক্তা পরিচালক ৩০ শতাংশের নিচে শেয়ার ধারণ করছেন তারা ক. কোনো শেয়ার বিক্রি বা হস্থান্তর করতে পারবেন না; খ. রাইট শেয়ার অফার বা রিপিট আইপিও বা বোনাস শেয়ার ইস্যু করতে পারবেন না; গ. অন্য কোনো কোম্পানির সঙ্গে একত্রীকরণ করতে পারবেন না; ঘ. ওইসব কোম্পানির কোনো পরিচালক অন্য কোনো কোম্পানির পরিচালক মনোনীত হতে পারবেন না; পাঁচ. দুই শতাংশ শেয়ার ধারণ না করার কারণে তার পরিচালকের পদ শূন্য হয়ে যাবে এবং ওই পদে দুই শতাংশ শেয়ারধারী অন্য কোনো শেয়ারহোল্ডার থাকলে ৩০ দিনের মধ্যে তাকে দিয়ে ওই শূন্যতা (াধপধহপু) পূরণ করতে হবে।
আরও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, ওইসব কোম্পানির জন্য উভয় স্টক এক্সচেঞ্জে আলাদা ট্রেডিং বোর্ড গঠন করতে হবে।
গত ২১ মে বিএসইসির জারি করা সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনেক বিনিয়োগকারীর মনে আশা জাগিয়েছে। উল্লেখ করা যায়, এককভাবে দুই শতাংশ এবং সম্মিলিতভাবে ৩০ শতাংশ ওই আদেশ এসইসি ২০১১ সালের ২২ নভেম্বর দিয়েছিলেন। বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, ২০১১ সালের তুলনায় পরিচালকদের শেয়ারহোল্ডিং পরিস্থিতি নাজুক।
আসুন বিষয়টি বিশ্লেষণ করি। ডিএসইর ওয়েবসাইট থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়
এক. ১০টি কোম্পানির ডাইরেক্টর ও স্পন্সরদের হোল্ডিং ১০ শতাংশের নিচে।
দুই. ১২টি কোম্পানির ডাইরেক্টর ও স্পন্সরদের হোল্ডিং ১০ শতাংশের ওপরে, ২০ শতাংশের নিচে।
তিন. ১১টি কোম্পানির ডাইরেক্টর ও স্পনসরদের হোল্ডিং ২০ শতাংশের ওপরে, ২৫ শতাংশের নিচে।
চার. ১৬টি কোম্পানির পরিচালক ও স্পনসরদের শেয়ার ধারণ ২৫ শতাংশের বেশি, ৩০ শতাংশের কম।
সংশ্লিষ্টরা কি ভেবে দেখেছেন, পরিচালকদের বাই ব্যাক করে ৩০ শতাংশ পূরণ করতে হলে কত কোটি টাকার প্রয়োজন? এক হিসাবমতে, ফেস ভ্যালু অনুসারে ১১ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা। ২২ মে ২০১৯ মার্কেট প্রাইস অনুসারে ২৫ হাজার ৫৮৩ কোটি টাকা প্রয়োজন। ১০ শতাংশের নিচে যাদের হোল্ডিং তাদের প্রয়োজন ফেস ভ্যালুতে ছয় হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা। ২২ মে’র মার্কেট ভ্যালুতে সাত হাজার ৭৩৯ কোটি টাকা। ২০ শতাংশের নিচে যাদের তাদের প্রয়োজন ফেস ভ্যালুতে এক হাজার ৯০৪ কোটি টাকা, মার্কেট ভ্যালুতে ৯ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা।
২৫ শতাংশের নিচে যাদের তাদের প্রয়োজন ফেস ভ্যালুতে দুই হাজার ৭১ কোটি টাকা, মার্কেট ভ্যালুতে তিন হাজার ৯৫৭ কোটি টাকা।
৩০ শতাংশের নিচে যাদের তাদের প্রয়োজন ফেস ভ্যালুতে ৪৯১ কোটি টাকা, মার্কেট ভ্যালুতে এক হাজার ৫৭৭ কোটি টাকা।
প্রশ্ন আসে এই বিপুল অঙ্কের অর্থ কি পরিচালকরা সংগ্রহ করতে পারবেন বা করবেন? এবার আসা যাক, এই কোম্পানিগুলোর আর্থিক অবস্থা কেমন?
এদের মধ্যে জেড-ক্যাটেগরিতে আছে ১০টি, স্মল ক্যাপে আছে ১৫টি এবং পরপর তিন বছর ডিভিডেন্ড দেয়নি এ রকম আছে তিনটি। এর মধ্যে বস্ত্র খাতে ১০টি, প্রকৌশল খাতে ১০টি, ফুড অ্যান্ড অ্যালাইড সেক্টরে সাতটি, ফার্মা সেক্টরে পাঁচটি, ফুয়েল অ্যান্ড পাওয়ার সেক্টরে সাতটি ও ব্যাংকিং সেক্টরে তিনটি (আইএফআইসি, রূপালী ও উত্তরা)।
বস্ত্র খাতের ১০টি কোম্পানির লিস্টিং ১৯৯৬ ও ২০১০ সালের বাজারধস সময়কালে। বিগত পাঁচ বছরে এদের ডিভিডেন্ড দেওয়ার নমুনা প্রভৃতি বিবেচনা করলে আশাব্যঞ্জক কিছু পাওয়া যায় কি না দেখা যাক, কারণ আশাব্যঞ্জক কিছুর সঙ্গে বাই-ব্যাকের আগ্রহ ও অনাগ্রহ জড়িত। এ ১০টি কোম্পানির মধ্যে ১৯৮৫ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত এরা লিস্টেড হয়। পাঁচটি কোম্পানি ১৯৯৬ সালের বাজারধস প্রত্যক্ষ করে। আর আটটি কোম্পানি ২০১০ সালের বাজারধস প্রত্যক্ষ করে। ২০১০ সালের পড়ে লিস্টেড হয় দুটি কোম্পানি জেনারেশন নেক্সট ও সি অ্যান্ড এ টেক্সটাইল। ২০১৪ সাল থেকে এই ১০ কোম্পানির মধ্যে একটি কোম্পানিও ক্যাশ ডিভিডেন্ড দেয়নি। স্টক দিয়েছে সাতটি। কোম্পানি সর্বনিন্ম দুই শতাংশ, সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ। ২০১৫ সালে পাঁচ শতাংশ ক্যাশ দিয়েছে তিনটি কোম্পানি। তিনটি কোম্পানি নো-ডিভিডেন্ড ও স্টক ডিভিডেন্ড দিয়েছে ৪টা ১০-১৭ শতাংশ রেঞ্জে। ২০১৬ সালে পাঁচ শতাংশ ক্যাশ দিয়েছে একটি, নো- ডিভিডেন্ড দিয়েছে চারটি কোম্পানি, স্টক ডিভিডেন্ড দিয়েছে ছয়টি কোম্পানি (৫-২০ শতাংশ)। মিথুন নিট ২০১৭-১৮ সালে কোনো ডিভিডেন্ড দেয়নি এবং ওয়েবসাইট ও কোয়াটারলি রিপোর্ট নেয়। ডিরেক্টর হোল্ডিং হলো ১৭ দশমিক দুই শতাংশ। ফ্যামিলি টেক্স ২০১৫ সালে কোনো ডিভিডেন্ড দেননি। ২০১৬, ২০১৭ ও ২০১৮Ñএ তিন বছরে পাঁচ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ড দেয়। ডিরেক্টর হোল্ডিং হলো চার দশমিক শূন্য দুই শতাংশ।
টেক্সটাইলের ১০টির মধ্যে একটি তালিকাভুক্ত হয় ১৯৮৯ সালে। এর পরিশোধিত মূলধন হলো সাত কোটি ৫৫ লাখ, ডিরেক্টর শেয়ারহোল্ডিং ২১.০৪ শতাংশ। এই কোম্পানিটি বিগত পাঁচ বছরে এক টাকাও ডিভিডেন্ড দেয়নি। ৭৯ শতাংশ বিনিয়োগকারীদের ভাগ্যে বিড়ম্বনা ছাড়া কিছুই জোটেনি।
সর্বোচ্চ পরিশধিত মূলধন হলো জেনারেশন নেক্সটের। এর পরিমাণ চার হাজার ৯৪৯ মিলিয়ন টাকা, ডিরেক্টরদের হাতে আছে ১৩ দশমিক ৮২ শতাংশ। পাঁচ বছরের মধ্যে ২০১৫ সালে কোনো ডিভিডেন্ড দেয়নি। বাকি বছরগুলোতে ১০ শতাংশ স্টক/বোনাস দিয়ে পরিশোধিত মূলধনকে এই জায়গায় এনেছে। তাদের সেলস ২০১৮ সালে ছিল চার হাজার ২৩ মিলিয়ন টাকা, পরিশোধিত মুলধনের সঙ্গে এটি অসামঞ্জস্যপূর্ণ। বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে এত পরিমাণ মূলধন দিয়ে কোম্পানি কী করছে?
ইঞ্জিনিয়ারিং ৩০ শতাংশের নিচে আছে ১০টি কোম্পানি। শুধু চারটি কোম্পানিকে ক্যাশ ডিভিডেন্ড দিতে দেখা গেছে ২০১৬ ও ২০১৭ সালে। ২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত নিয়মিত ১২-১৬ শতাংশ হারে ক্যাশ ডিভিডেন্ড দিয়েছে দুটি কোম্পানি। সেগুলা হলো আফতাব অটো ও রেনউইক যজ্ঞেশ্বর। এটি একটি ভালো দিক। আফতাব অটোর ডিরেক্টর হোল্ডিং হচ্ছে ২৮ দশমিক ৪২ শতাংশ। এক্ষেত্রে বাকি এক দশমিক ৫৮ শতাংশ বাই-ব্যাক করাটা অসম্ভব নয়।
আইটি খাতে ৩০ শতাংশ ডিরেক্টর হোল্ডিংয়ের নিচে আছে চারটি কোম্পানি এবং বিগত পাঁচ বছরে এ চারটি কোম্পানিই ভালো ক্যাশ ডিভিডেন্ড দেয়নি। ২০১৬ ও ২০১৭ সালে ওঝঘখঞউ নো-ডিভিডেন্ড ছিল। স্টক দিয়েছে অগ্নি সিস্টেমস লি. সবচেয়ে বেশি, ২০১৪ ও ২০১৫ সালে ১০ শতাংশ করে এবং ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালে পাঁচ শতাংশ স্টক দিয়েছে। এই কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন ৭২৫ দশমিক ৫৬ মিলিয়ন। ইনটেক পাঁচ বছরে কোনো ক্যাশ ডিভিডেন্ড দেয়নি। তাদের পরিশোধিত মূলধন ৩১৩ মিলিয়ন, কিন্তু সম্মিলিত ডিরেক্টর হোল্ডিং মাত্র চার শতাংশ। মার্কেট প্রাইসে বাই ব্যাক করতে লাগবে ২৯৩ কোটি টাকা। ভাবনার বিষয় নয় কি?
ফার্মাসিটিউক্যালস সেক্টরে পাঁচটি কোম্পানি আছে ৩০ শতাংশের নিচে। তাদের বাই-ব্যাক করতে মার্কেট প্রাইসে মোট ছয় হাজার ৭২০ কোটি টাকা লাগবে। এর মধ্যে শুধু একটি কোম্পানির (বেক্সিমকোফার্মা) লাগবে পাঁচ হাজার ২০০ কোটি টাকা!
অনুরূপভাবে, অন্য খাতের কোম্পানিগুলো বিশ্লেষণ করলে আমরা ঠিক একই ধরনের উপসংহারে উপনীত হব। এখন পাঠকই বিচার করবেন এ অবস্থাই এসব কোম্পানির পরিচালকরা বাই-ব্যাকে কতটুকু আগ্রহী হবেন। আশাবাদী হতে দোষ নেই, কিন্তু হতাশ হওয়া ছাড়া উপায় দেখছি না।
বাজার বিশেষজ্ঞদের মধ্যে কেউ কেউ মনে করেন, এর এই কঠোর অবস্থান এসব কোম্পানির পরিচালক পরিবর্তনের মাধ্যমে সরে যাওয়ার একটি আইনি ভিত্তি তৈরি করে দেবে। নতুন পরিচালকরা কোম্পানি চালাতে গেলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সফল না হওয়ার আশঙ্কা বেশি। এর অন্যতম কারণ কোম্পানিগুলোর আর্থিক অবস্থা দুর্বল। এরা অনেকেই মৃত্যুপথযাত্রী। পুঁজিবাজারের জন্য সুফল আনার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
ওই কোম্পানির ক্ষেত্রে নিন্মোক্ত অবস্থা বিবেচনা করা যেতে পারে
এক. প্রত্যেক কোম্পানির পরিচালকদের কাছ থেকে কোম্পানির আর্থিক অবস্থা উন্নয়নে আগামী পাঁচ বছরের জন্য বছরওয়ারি তাদের কী পরিকল্পনা আছে, সেটি চেয়ে নেওয়া। দুই. নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করা।
তিন. স্বেচ্ছায় পুঁজিবাজারের তালিকা থেকে বের হতে চায় এ ধরনের কোম্পানির জন্য বাই-ব্যাক আইনি ব্যবস্থা করে দেওয়া।
চার. কোন কোম্পানির কত টাকা ধারদেনা আছে, সে তথ্য সংগ্রহ করা এবং এর ভিত্তিতে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
পাঁচ. এদের জন্য স্টক এক্সচেঞ্জে নতুন ট্রেডিং বোর্ড গঠন না করা। কারণ এতে কোনো সুফল আসবে না, ওটিসি মার্কেটের মতো নামসর্বস্ব হয়ে পড়ে থাকবে।

ব্যবস্থাপনা পরিচালক
আইল্যান্ড সিকিউরিটিজ লিমিটেড
চেয়ারম্যান, সিআরএসএল

ট্যাগ »

সর্বশেষ..