দু’পক্ষের শুদ্ধাচারই রমজানেবাজার শান্ত রাখতে জরুরি

রোববার ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘রমজানের রাজনৈতিক অর্থনীতি: বাজার ব্যবস্থা, ভোক্তা অধিকার ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মন্তব্য নিয়ে গতকালের শেয়ার বিজে প্রকাশিত একটি খবরের শিরোনাম‘ব্যবসায়ীরা পরিশুদ্ধ হলে পুলিশ চাঁদাবাজির সুযোগ পাবে না’। প্রতিবেদনটি অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে থাকবে। অন্যান্য সংবাদমাধ্যমেও এ সংক্রান্ত খবর গুরুত্বসহ প্রচারিত হয়েছে। ওই মতবিনিময়ে ঢাকা চেম্বারের সভাপতি ও কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতিসহ উপস্থিত ছিলেন আরও অনেকে। তারাও সেখানে মূল্যবান বক্তব্য রেখেছেন, সন্দেহ নেই। তবে সঙ্গত কারণেই বেশি সামনে এসেছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য। তিনি চাঞ্চল্য সৃষ্টির জন্য কথাটি বলেছেন বলে মনে হয় না। স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যের ইস্যু টেনে রমজান সামনে রেখেই তিনি উপস্থাপন করেছেন ওই বক্তব্য। এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণের সুযোগ নেই বললেই চলে। অস্বীকার করা যাবে না, আইন-শৃঙ্খলার চলে আসা অনুষঙ্গগুলো বাদ দিলে রমজানে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির জন্য অনেকটাই দায়ী একশ্রেণির ব্যবসায়ীর অতিমুনাফা প্রবণতা। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যকে অতিসরলীকরণেরও পক্ষপাতী নই আমরা। সত্যি বলতে রমজানে নিত্যপণ্যের বাজার অনেক বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল।

বলার অপেক্ষা রাখে না, রমজানে কিছু পণ্যের চাহিদা হঠাৎ করে কয়েকগুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায় যার সঙ্গে তাল মেলানো সাপ্লাই চেইনের পক্ষে কঠিন। সেজন্য ভোক্তার সংযম তথা চাহিদা হ্রাসের ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে সম্প্রতি। তাতে কাজ হচ্ছে কতটা, তা অবশ্য জানা নেই। বিষয়টির ওপর অব্যাহতভাবে গুরুত্বারোপ করলে হয়তো সুফল মিলবে। দ্বিতীয়ত, যে বিষয়টির ওপর রমজানের বাজার নির্ভরশীল, সেটি হচ্ছে আন্তর্জাতিক পণ্যবাজার। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের মূল্য যদি স্থিতিশীল থাকেও রমজানে আমদানিকৃত পণ্যের দামে প্রভাব ফেলতে শুরু করে ডলারের বিনিময় মূল্য। তৃতীয়ত, রমজানে পণ্যের দাম বাড়িয়ে তোলে আরও বেড়ে ওঠা যানজট ও বাড়তি পরিবহন ব্যয়। রমজানে বেশকিছু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং সেহেতু রাস্তাঘাটে যান চলাচলও বাড়ে। আবার রমজানের শুরু ও শেষের দিকে যানজট বাড়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন দুই কারণে। প্রথমার্ধ্বে এর তীব্রতা বৃদ্ধির কারণ মূলত নিত্যপণ্য পরিবহন আর শেষার্ধ্বে যানজট বাড়ে প্রধানত ঈদ আয়োজন ঘিরে। প্রতি বছরই এ সময় বিশেষ প্রস্তুতি থাকে সরকার তথা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। এর মধ্যে অভিযোগ রয়েছে যানজট নিয়ন্ত্রণের নামে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একশ্রেণির সদস্য কর্তৃক চাঁদাবাজি সংঘটনের। অবশ্য পুরো বাহিনী বা দায়িত্বে নিয়োজিত প্রত্যেক সদস্যই এ অপকর্মে জড়িত, তেমনটি বলা যাবে না। এর সঙ্গে অপর্যাপ্ত ও সমন্বয়হীন বাজার মনিটরিংও যুক্ত বলে মনে করেন কেউ কেউ। এমন কথাও বলা যাবে না, প্রত্যেক ব্যবসায়ী বা আমদানিকারকই রমজানের বাজারে পণ্যদ্রব্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির জন্য দায়ী। পণ্যে ভেজাল দিয়ে থাকেন, এমন ব্যবসায়ীর সংখ্যাও কম বলে আমরা মনে করি। আইনের হাত থেকে রেহাই পেতে নিয়মিতভাবে ক্ষমতাবানদের চাঁদা জুগিয়ে থাকেন, এমন ব্যবসায়ীর সংখ্যাও বেশি নয়। তাই গোটা ব্যবসায়ী সমাজকে নসিহত করা অসমীচীন মনে হতে পারে অনেকের কাছে। অবশ্য মন্তব্যটি যদি সাধারণ উপদেশ হয়, তাতে আপত্তির কিছু নেই। সে ক্ষেত্রেও প্রত্যাশা থাকবে, ব্যবসায়ীরা তো শুদ্ধাচারী হবেনই এর পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের যারা নজরদারি করবেন, তারাও যেন অনুশীলন করেন শুদ্ধাচার। এ উভয় গোত্রের শুদ্ধাচার ব্যতীত রমজানে নিত্যপণ্যের বাজার শান্ত রাখা কষ্টকর বৈকি।