দুবছরের পুরোনো তথ্য দিয়েই চলছে ডিএসইর ওয়েবসাইট

নাজমুল ইসলাম ফারুক: পুরোনো তথ্য দিয়েই চলছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ওয়েবসাইট। সময়মতো তথ্য হালনাগাদ করছে না সংস্থাটি। এছাড়া তথ্য হালনাগাদ করার ক্ষেত্রেও রয়েছে অসতর্কতা। ফলে বিনিয়োগকারীরা একদিকে যেমন তথ্য বিভ্রান্তিতে পড়ছেন, অন্যদিকে তাদের আর্থিক ক্ষতিরও আশঙ্কা রয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনও বিষয়টি তেমন গুরুত্ব দিচ্ছে না, যে কারণে তারাও বসে আছেন হাত-পা গুটিয়ে।

বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, ডিএসইর বাংলা ওয়েবসাইটটিও নিয়মিত হালনাগাদ করা হয় না। এতে অনেক তথ্য ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের অজানাই থেকে যাচ্ছে। ফলে অনেক কিছু না জেনেই বিনিয়োগ করছেন তারা। আর এ কারণে তারা ক্ষতির সম্মুখীনও হচ্ছেন। এদিকে তথ্য হালনাগাদ না করা হলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছে না।

পুরোনো তথ্য ও ভুলের বিষয়ে জানতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ব্যবস্থাপনা পরিচালক কেএম মাজেদুর রহমানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এ সম্পর্কে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সাইফুর রহমান শেয়ার বিজকে বলেন, ‘কোথায় কী তথ্য হালনাগাদ হচ্ছে না, তা নির্দিষ্ট করে আমাদের জানালে বিষয়টি খতিয়ে দেখব। এছাড়া আমাকে ম্যাসেজ পাঠালে বুঝতে পারব কোথায় ভুল করেছে সংস্থাটি।’

বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারের বিনিয়োগকারীদের স্বচ্ছতার সঙ্গে, জেনে-বুঝে বিনিয়োগ করার জন্য ডিএসইর ওয়েবসাইটে তালিকাভুক্ত সব কোম্পানির তথ্য প্রকাশ করা হয়। এসব তথ্য বাজারে বিনিয়োগের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কোনো তথ্য ভুল থাকলে বা আগের তথ্য থাকলে তার ওপর নির্ভর করে বিনিয়োগ করলে বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা থাকে। অতীতে ভুল তথ্যের কারণে অনেক বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাই এ বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর হওয়া উচিত বলে মনে করেন তারা।

তারা আরও বলছেন, মৌল ভিত্তির কোম্পানি বাছাইয়ের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন, সম্পদের পরিমাণ ও যথাযথ ব্যবহার, লভ্যাংশ, প্রকৃত মুনাফার হার, নিয়মিত বার্ষিক সাধারণ সভা এবং কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয়, শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ, ধনাত্মক প্রবৃদ্ধি, সঠিক সময়ে সব মূল্য সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ করা হয়। এসব তথ্য ডিএসইতে পাঠায় কোম্পানির কর্তৃপক্ষ। আর সব আইনকানুন ও বিধি মেনে কোম্পানি তথ্যগুলোর হালনাগাদ করার দায়িত্ব ডিএসইর।

ডিএসইতে তালিকাভুক্তির বিধিমালা অনুযায়ী, কোম্পানির ‘অফিসিয়াল’ ওয়েবসাইটে বার্ষিক ও প্রান্তিক আর্থিক বিবরণী, মূল্য সংবেদনশীল তথ্য, পরিচালনা পর্ষদ ও শীর্ষ-ব্যবস্থাপনা কমিটি, ব্যবসাসহ সার্বিক কর্মকাণ্ড, পরিচালকদের শেয়ারধারণের পরিমাণ, পরিচালকের প্রতিবেদন, করপোরেট গভর্ন্যান্স ও যোগাযোগের ঠিকানাসহ বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করাও বাধ্যতামূলক। সেসব তথ্যও হালনাগাদ হচ্ছে কি না সে বিষয়ে ডিএসইর তদারকি নেই। ফলে কিছু কোম্পানির নিজস্ব ওয়েসাইটে তথ্য নেই। ডিএসই নিজেই ওয়েবসাইট ও কোম্পানির ওয়েবসাইটে তথ্য নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে।

তথ্যমতে, জ্বালানি খাতের বেশির ভাগ কোম্পানি ২০১৭ সালের জুনে সমাপ্ত বছরের লভ্যাংশ দিয়েছে। অথচ এসব কোম্পানির তথ্য হালনাগাদ হয়নি। কোম্পানিগুলোতে গতকালও ২০১৬ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত হিসাববছরের লভ্যাংশ ও প্রকৃত মুনাফার তথ্য দেওয়া রয়েছে। সবচেয়ে বড় ধরনের ভুল তথ্য দিয়েছে তিতাস গ্যাসের কোম্পানি প্রোফাইলে। কোম্পানিটি ২০১৭ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত হিসাববছরে ২২ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে। অথচ কোম্পানির প্রোফাইলে লভ্যাংশের তথ্য রয়েছে দুই দশমিক দুই শতাংশ। এই লভ্যাংশের প্রকৃত মুনাফার তথ্য দিয়েছে চার দশমিক ৩৫ শতাংশ। অপরদিকে সামিট পাওয়ার ২০১৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ১৮ মাসে ৩০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে। অথচ আলোচিত সময়ে সামিট পাওয়ারের কোম্পানির প্রোফাইলে সাত দশমিক ৩৫ শতাংশ লভ্যাংশ দিয়েছে বলে তথ্য দিয়েছে ডিএসই। এই গ্রুপের সামিট অ্যালায়েন্স পোর্টের লভ্যাংশের তথ্যে রয়েছে একই ভুলের চিত্র। কোম্পানিটি ১৫ শতাংশ লভ্যাংশ দিলেও ডিএসইতে তথ্য হালনাগাদ করা হয়েছে তিন দশমিক ৬৫ শতাংশ। বস্ত্রখাতের কোম্পানিগুলোর জুনে হিসাববছর শেষ হয়েছে। অথচ কোম্পানিগুলোর অধিকাংশের ২০১৬ সালের তথ্যই রয়েছে। শুধু তাই নয়, কিছু কোম্পানির ২০১৫ সালের তথ্যও দেখা গেছে, যা দুই বছর ধরে হালনাগাদ নেই।

বিশ্লেষকরা বলছেন, স্টক এক্সচেঞ্জের উচিত সব ধরনের ডিসক্লোজার নিশ্চিত করা, তাহলে মার্কেট ম্যানিপুলেশন হবে না। স্টক এক্সচেঞ্জ শুধু শেয়ার কেনাবেচার প্লাটফরম হওয়া উচিত নয়। বিনিয়োগকারীদের সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য সরবরাহ নিশ্চিত করাও স্টক এক্সচেঞ্জের দায়িত্ব বলে মনে করেন তারা।

উল্লেখ্য, ২০১০ সালে পুঁজিবাজারে ধস-পরবর্তী সময়ে বাজার সংস্কারে একগুচ্ছ পদক্ষেপ নেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি। এছাড়া বাজারে তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগের জন্য কিছু পরামর্শ দেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা। এর মধ্যে অন্যতমÑমৌল ভিত্তির কোম্পানি বাছাই করা। আর তা করতে হালনাগাদ তথ্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। যদি এসব তথ্য হালনাগাদ না হয় তাহলে বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পরিণত হয়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।