হোম প্রচ্ছদ দুরন্ত শৈশব

দুরন্ত শৈশব


Warning: date() expects parameter 2 to be long, string given in /home/sharebiz/public_html/wp-content/themes/Newsmag/includes/wp_booster/td_module_single_base.php on line 290

 

অনাথ শিশুর মতো যার জীবনখানি নিস্তরঙ্গে নিথর হতে পারতো নিযুত জীবনের নিঠুর নিয়তিপাশে তিনি জুগিয়েছেন হৃৎস্পন্দনের খোরাক। দেশের জন্য লড়েছেন। শূন্য জমিনে গড়েছেন ব্যবসায় কাঠামো। জীবনের সব অর্জন লিখে দিয়েছেন মানুষের নামে। তিনিই দেশের সবচেয়ে সফল ট্রাস্টি প্রতিষ্ঠান ‘কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট’-এর জনক রণদা প্রসাদ সাহা। নারীশিক্ষা ও চিকিৎসায় নারী-পুরুষ কিংবা ধনী-গরিবের ভেদ ভেঙেছেন। তার জীবনেই রয়েছে সসীমকে ডিঙিয়ে অসীমে শক্তি সঞ্চারের কথামালা। এ জীবন ও কেতন যেন রোমাঞ্চিত হৃদয়েরই উদ্দীপ্ত প্রেরণা।  পর্ব-০৭

মিজানুর রহমান শেলী: রণদা প্রসাদ সাহার শৈশবের সাহাপাড়া আজকের মতো নয়। পার্থক্যটি অনেক ক্ষেত্রে সাদা-কালো। সমাজের সেসব হালচালে অনেক সময় গড়িয়েছে। আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে বহু বাতাস দিক পাল্টেছে। সমাজের অনেক আনাচে-কানাচে যেখানে আলো ছড়াতো না, সেখানে আলো ছড়িয়েছে। যেখানে ছিল আলো-ছায়া, সেখানেও হয়তো আলোএমনকি কখনও কখনও আঁধারের আধিক্য দানা বেঁধেছে। চেনামুখ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে অচেনা হয়েছে। তবে এর মাঝেও রণদা বেঁচে আছেন। আপন মহিমায় বেঁচে আছেন। বাবার পরিচয়ে নয়, নিজের পরিচয়ে। বংশের বলে নয়, কর্মের কুদরতে। ধর্মের ধ্বজে নয়, চিন্তার চরিতে। চিন্তা, কর্ম আর সৃজনশীলতা মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে আত্মিকভাবে। রণদা প্রসাদ সাহা আজকের এই জগৎকে ঋণী করে রেখেছেন। তিনি তাই আজ আপন পরিচয়ে পরিচিত।

রণদা ছিলেন মা-বাবার দ্বিতীয় সন্তান। বড় ভাই মদন সাহা, ছোট ভাই ফণী সাহা। রণদার মা-বাবা আর তিন ভাইয়ের সংসারে সবারই চোখের মণি হয়ে আসে ছোট বোন মরণ দাসী। এই চার ভাই-বোন আর মা-বাবার সংসারে রণদা ছিলেন চঞ্চল প্রকৃতির। কুঁড়েঘরে বেড়ে ওঠা রণদা: তার হৃদয় আকাশে কিন্তু কুঁড়ে-ছানি মাঁচা বাঁধতে পারেনি। বিশালতায় বিস্তৃত চিত্তের সবখানে ছিল আপন করে নেওয়ার সাহস। তাই তার হাসিমুখ, প্রাণের উচ্ছলতা অনুক্ষণে শৈশব থেকেই দুষ্টুমিকে অতিক্রম করেছে।

লৌহজংয়ে ঝাঁপাঝাঁপি: সাঁতরে এপার-ওপার, এবেলা-ওবেলা; এভাবেই কখন যেন একটি বেলা হারিয়ে আরেকটি সূর্য এসেছে তার হিসাব রাখা হয়নি। আপন মনেই কেটে গেছে। নদীর চঞ্চল তরঙ্গে বয়ে যেত পানসি, ডিঙি, কুষা বা পাল তোলা নৌকা। ছোট রণদার হৃদয়েও ভর করেছিল সে চঞ্চলতার ছন্দমাখা সুর। প্রমত্তা এ নদীর আছড়ে পড়া দাপটও তিনি সঞ্চয় করেছিলেন একলা জীবনের পাথেয় হিসেবে।

বন্ধুদের সঙ্গে গোল্লাছুট, কানামাছি খেলা অথবা গাছগাছালির শাখায়-শাখায় মগডালে পা দুলিয়ে সকাল-দুপুর-বিকাল কাটিয়ে দেওয়াই ছিল তার প্রিয়। পড়ালেখা মনে ধরেনি।

সে সময় এ অঞ্চলে অবশ্য তেমন কোনো বিদ্যালয় ছিল না। তাই পড়ালেখার জন্য বিভিন্ন পণ্ডিতমশাইয়ের দ্বারস্থ হতে হতো। এগুলোকেই তখন অনেকে পাঠশালা বা গুরুগৃহ বলে ডাকতেন। রণদার শৈশব বলতে উনিশ শতকের শেষ আর বিশ শতকের শুরুর কাল। তৎকালের মির্জাপুরের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় এফএ সাকসি ও অ্যাডামের বয়ানে। অধিকাংশ মক্তব ও মাদ্রাসা গ্রামের সঙ্গতিসম্পন্ন মুসলিমরা ওয়াকফ ও লাখেরাজের মাধ্যমে চালাতো। নোয়াখালী, চট্টগ্রাম ও সিলেট থেকে মৌলভিরা এসে এসব মক্তব বা মাদ্রাসায় আহার ও বাসস্থান সুযোগের বিনিময়ে পাঠদান করতেন। আর উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির হিন্দুদের বদান্যতা ও অর্থানুকূল্যে চালু ছিল টোল ও পাঠশালা। নির্দিষ্ট কোনো গৃহে বা কোনো ধনী লোকের বৈঠকখানায় এ শিক্ষার আসর বসতো। সাহাপাড়ার আশপাশে কোনো মক্তব ছিল না। কেননা এ অঞ্চলটি ছিল হিন্দু অধ্যুষিত। তবে মির্জাপুর বাসস্ট্যান্ড বা বাইমহাটি বাজারের পাশে একটি মক্তব ছিল। কুমিল্লা থেকে আসা একজন মৌলভি এই মক্তব চালাতেন। অন্যদিকে সাহাপাড়ায় পণ্ডিত হরিকান্তের পাঠশালা বা গুরুগৃহের নাম শোনা যায়। তাছাড়া তারও অনেক পরে সরিষাবাড়ীতে প্রতিষ্ঠা হয়েছিল রামকৃষ্ণ আশ্রম। আশ্রমটি মির্জাপুর পৌরসভার ৭নং ওয়ার্ড সরিষাবাড়ীতে একটি ডোবার ধারে দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমদিকে এই আশ্রমে একটি পাঠশালা ছিল। সেখানে নীতি শিক্ষা দেওয়া হতো। বর্তমানে সেই পাঠশালা পরিবর্তন হয়ে বাংলাদেশের আধুনিক পাঠ্যক্রমে প্রাথমিক বিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।

রণদার পড়ালেখা নিয়ে কিছুটা বিতর্ক বা দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছে। রীতা ভৌমিক উল্লেখ করেছেন, রণদা প্রসাদ সাহা মির্জাপুরের সরিষাবাড়ীর রামকৃষ্ণ আশ্রমে পড়ালেখা করেছেন। অথচ ক্ল্যাসিক গ্রাউন্ডেড তত্ত্বের মাঠ জরিপে তথ্যটি ভুল প্রমাণিত হয়েছে। কার্যত, রণদা প্রসাদ সাহার জš§ বাংলা ১৩০২ সালে। অথচ ওই আশ্রম প্রতিষ্ঠা পেয়েছে রণদার জšে§র ৩১ বছর পরÑ১৩৩৩ বঙ্গাব্দে। আশ্রমটি প্রতিষ্ঠা করেন স্থানীয় জমিদার সদয় কৃষ্ণ পোদ্দারের পুত্র সতীশ কৃষ্ণ পোদ্দার। এই সতীশ কৃষ্ণ পোদ্দার রণদা প্রসাদ সাহার বড় ছেলের বয়স্ক।

তিনি আসলে স্থানীয় পণ্ডিতমশাইয়ের কাছে পড়ালেখা শিখেছিলেন কিছুকাল। এই পণ্ডিতমশাই হলেন পণ্ডিত হরিকান্ত। বাবুবাজারের দক্ষিণে রাস্তার ডান হাতে অজানা কোনো এক স্থানে পণ্ডিত হরিকান্তের বাড়ি ছিল। তিনি নিজের বাড়িতেই এ শিক্ষার আসর চালাতেন। শিশুদের হাতেখড়ি থেকে শুরু করে প্রাথমিক পড়ালেখা শেখাতেন। বাংলা, সংস্কৃত আর হিন্দু পৌরাণিক শিক্ষা এখানে দেওয়া হতো। বাবা দেবেন্দ্র তার আদরের সন্তান রণাকে ওই পাঠশালায় পাঠিয়েছিলেন।

কিন্তু পাঠে রণার মন বসে না। সারাদিন খেলাধুলা, নদীতে গোসল আর গাছগাছালির সংস্পর্শই তাকে বেশি টানতো। তবে রণদা পড়ালেখার জন্য পাড়ার অন্য ১০টি ছেলের চেয়ে একটু বেশি উৎসাহ বা তাগাদা পেতেন। কেননা তার প্রপিতামহী ভারতেশ্বরী দেবী লেখাপড়া জানতেন। তাছাড়া তার বাবা ও দাদাও পড়ালেখার সঙ্গে ছিলেন। পোদ্দারি, দলিল লেখা আর প্রচলিত আইন আদালত সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা তাদের ছিল। তাই রণদা পড়ালেখা শিখবে সেটাই ছিল স্বাভাবিক।

বিশ শতকের শুরুর কালে বাংলায় খানিক পড়ালেখা জানা পরিবারগুলো ছিল মোটামুটি সচেতন। এমনকি তারা তাদের নীতিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে প্রগতির চিন্তা করতেন। ধর্মও হতো তাদের আরেকটি শক্ত নৈতিক শিক্ষার পরিপ্রেক্ষিত। রণদা ছোটবেলায় একইভাবে পরিবারের সবার কাছ থেকে সেই পরিবেশটা পেয়েছিলেন।

ভারতেশ্বরী দেবীর সঙ্গে তার ছিল দারুণ ভাব। তিনি রণদাকে রণা বলে ডাকতেন। তার কোলেই রণদার বেশিরভাগ রাত কাটতো। রণদা পণ্ডিতমশাইয়ের কাছে না গেলে তিনি আদর করে এমনকি মৃদু শাসন করেও তাকে পড়তে যাওয়ার তাগাদা দিতেন। বলতেন, ‘এই রণা, পড়তে যা’। এই পণ্ডিত হরিকান্তের পাঠশালার সঙ্গে রণদার আনুমানিক তিন বছরের সম্পর্ক ছিল। গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠদের মতামতের ভিত্তিতে ধারণা করা যায় তিনি সেখানে তৃতীয় শ্রেণি সমমানের শিক্ষা লাভ করেছিলেন।

তাছাড়া ভারতেশ্বরী দেবীও তাকে কেচ্ছা কাহিনীর ছলে অনেক কিছু শেখাতেন। রাতে প্রপিতামহীর কোলে শুয়ে রামায়ণ-মহাভারতের কাহিনী শুনতেন। তবু রণদার দুষ্টুমির কাছে পাঠশালা আর ভারতেশ্বরী দেবীর নীতি আর ধর্মীয় শিক্ষা-দীক্ষা যেন পরাজিতই হতো বেলা-অবেলায়।

ঘরের গরিবানা হালচাল শিশু রণদার মনকে কখনও ছাপড়াতে পারতো না। ক্ষুধার যন্ত্রণাকে কখনও নিজের করে তিনি ভাবতেন না। তাই বুঝি পাড়া-মহল্লার কারও গাছের ফল কিংবা কারও পাত্রের ভাতকে তিনি অন্যের করে দেখেননি। বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে দুষ্টুমির ছলেই এর-ওর গাছের আম, জাম, কাঁঠাল, পেয়ারা, বরই যেমন সহসা চুরি করে খেয়েছেন, তেমনি অজান্তেই কারও হেঁসেলের রান্না খাবার থাকতে তিনি ক্ষুধার যন্ত্রণা মেনে নেননি। আর তক্ষণি তার অভিযোগ উঠেছে। গ্রামময় প্রচার হয়েছে। রণার চুরি করে ভাত খাওয়ার খোশ গল্প রটে গিয়েছে।

ওই সমাজে একজন আরেকজনের চেয়ে যেন বেশি গরিব ছিলেন। সাহাপাড়ায় সাহারা আগে থেকেই ব্যবসায়ী। কৃষিকাজ তারা কখনও করেনি। কিছু লোকের পোদ্দারি ছিল। আর কিছু লোক চাকরি করতেন। এই অঞ্চলে সদয় কৃষ্ণ পোদ্দার ছিলেন সবচেয়ে প্রতাপশালী। তার পোদ্দারি ছিল বড়। রণদার বাবা দেবেন্দ্র পোদ্দারও ছিলেন পোদ্দার। তবে গাঁ-গ্রামের লোকে তাকে পেটি পোদ্দার বলে ডাকতেন। কেননা তার পোদ্দারি ছিল নিতান্ত ছোট। তা দিয়ে তার সংসারই ঠিক চলতো না। এসব পেটি পোদ্দারের ওপর চলতো আবার জমিদারদের নিপীড়ন। কেননা, খাজনা ঠিকমতো তুলতে না পারলে জমিদাররা পোদ্দারদের মাল ক্রোক  করতেন। চাষি খাজনা দিক আর না দিক ইজারার এক নির্দিষ্ট অংশ পরিশোধ করতে পোদ্দাররা বাধ্য থাকতেন। একই সঙ্গে রণদার প্রতিবেশী হৃষিকেশ পোদ্দারদের গোষ্ঠীর লোকসংখ্যা ছিল সাহাপাড়ার মোট লোকসংখ্যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। তবে তারা চাকরি করতেন। ব্যবসাও তাদের ছিল। তারা কখনও পোদ্দারি করেননি।

এই অঞ্চলে তখন পাট, ধান, চাল আর কাপড়ের ব্যবসায়ই ভালো চলতো। এসব ব্যবসায় সাহাপাড়া বা এ অঞ্চলের মানুষের দারিদ্র্যের নিদাঘ কশাঘাত নিবারণ করতে পারতো না। তাই কারও পক্ষেই নিজের রান্না আহারের ভাত অন্য কেউ খেয়ে গেলে সইতে পারার মতো ক্ষমতা ছিল না। সবার কাছেই রণা ছিল অভিযুক্ত শিশু। কিন্তু কখনও ছোট্ট রণার সে অভিযোগে তিল পরিমাণ ভ্রৃক্ষেপ ছিল না। তার দুরন্ত ঝোঁক- প্রবণতার কাছে সমাজের নিয়মনীতি ঠাঁই পেত না। তাই রণা ছিল প্রতিবেশীদের কাছে একটি বালাই-একটি আপদ।

 

লেখক: গবেষক, শেয়ার বিজ

mshelleyjuÑgmail.com