দুর্নীতিমুক্ত হোক আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয় যেন সমাজের সবখানে। এমন কোনো প্রতিষ্ঠান নেই, যেখানে অনিয়ম-দুর্নীতি নেই। বড় দুর্নীতি আছে মানুষ গড়ার কারখানা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও। শিক্ষার্থীদের কাছে অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠতে পারেননি অধিকাংশ শিক্ষক। পাঠদানে উদাসীনতা, উপস্থিত না থেকেও হাজিরা খাতায় সই প্রভৃতির পাশাপাশি আর্থিক অনিয়মে জড়িয়ে পড়ছেন তারা। পাবলিক পরীক্ষা, বিশেষত এসএসসি পরীক্ষার ফরম ফিলআপের সময় প্রতিবছরই বলা যায় এটি আলোচনায় আসে। পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে নির্ধারিত ফি’র চেয়ে বেশি অর্থ আদায় করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ডিসেম্বর পর্যন্ত তার সমুদয় পরিশোধ করেই নির্বাচনি পরীক্ষায় অংশ নেয় শিক্ষার্থীরা। আসন্ন ২০১৯ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য ঢাকা শিক্ষাবোর্ড কর্তৃক শিক্ষার্থীপ্রতি ফরম পূরণ ফি বিজ্ঞান বিভাগে ১ হাজার ৮০০, ব্যবসায় শিক্ষা ও মানবিকে ১ হাজার ৬৮০ টাকা। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো নিচ্ছে ১০ হাজার টাকার বেশি। অতিরিক্ত ফি আদায় না করার বিষয়ে হাইকোর্টের সুয়োমোটোও রয়েছে এবার। এ-সংক্রান্ত নোটিশ শিক্ষাবোর্ডের ওয়েবসাইটে সন্নিবেশিত। সেটিও মেনে চলছে না শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো।
সন্তানের ক্ষতি হবে ভেবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এ ধরনের বাণিজ্য নিয়ে সাধারণত অভিযোগ করেন না অভিভাবকরা। অভিযোগ করলে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ব্যবস্থা নেবে, তাও কিন্তু নয়। সংস্থাটি দেখবে, অভিযোগটি দুদকের এখতিয়ারভুক্ত কি না। ফলে এত দিন দুদককে এসব বিষয়ে কেউ জানাতও না। অবশ্য স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে অনুসন্ধান করতে পারে দুদক এবং মামলাও করতে পারে। দুদকের সে এখতিয়ার আছে। দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ ও দুর্নীতি দমন কমিশন বিধিমালা, ২০০৭-এর ১৭ ধারার গ, জ ও ট অনুচ্ছেদ অনুসারে ব্যবস্থা নিতে পারে দুদক। এগুলোয় বলা হয়েছে, দুর্নীতি সম্পর্কিত কোন অভিযোগ স্ব-উদ্যোগে বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা তাহার পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি কর্তৃক দাখিলকৃত আবেদনের ভিত্তিতে অনুসন্ধান; কমিশনের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে এমন সকল বিষয়ের উপর সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, কর্মশালা ইত্যাদি অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা; দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় বিবেচিত অন্য যে কোনো কার্য সম্পাদন করা।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দুদক কিছু করেনি, তাও নয়। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা ও সততাবোধে উজ্জীবিত করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দুদকের উদ্যোগে গড়ে তোলা হয়েছে সততা সংঘ, সততা স্টোর প্রভৃতি। কিন্তু শিক্ষকরাই যদি সততার চর্চা না করেন, তাহলে শিক্ষার্থীরা অনুপ্রাণিত হবে কীভাবে? উপদেশের চেয়ে দৃষ্টান্তই যে শ্রেয়তর!
সম্প্রতি ২০১৯-এর এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কতিপয় দুর্নীতিপরায়ণ শিক্ষক নির্ধারিত ফি’র অতিরিক্ত আদায় করছেন মর্মে দুদকের হটলাইন ও ই-মেইলে প্রতিদিন অনেক অভিযোগ এসেছে। কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিম সরেজমিনে অনুসন্ধান করে এর সত্যতাও পায়। এর প্রতিকারে ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে চিঠি দিয়েছে দুদক। গতকাল শেয়ার বিজে এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে পাঠানো চিঠিতে এসএসসি পরীক্ষা-সংক্রান্ত দুর্নীতি প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়, অধিদফতর, দফতর ও মাঠ প্রশাসনের মাধ্যমে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করা হয়।
আমাদের প্রতিবেদককে দুদকের মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) বলেছেন, এ-জাতীয় অপরাধ যাতে সংঘটিত না হয়, সে বিষয়ে কমিশন নজরদারি করছে এবং জনগণকে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে। অভিযোগ পেলে এসব অপরাধ প্রতিরোধে নিয়মিত অভিযান চালানো হবে।
রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর সমন্বিত কার্যক্রম ও সাধারণ মানুষের সচেতনতায় অতিরিক্ত ফি নেওয়াসহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চলমান বিভিন্ন অনিয়ম দূর হবে বলেই প্রত্যাশা। তবে এটি হওয়াই বেশি প্রত্যাশিত যে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, উদ্যোক্তারা স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে এমন গর্হিত কাজ থেকে বিরত থাকবেন। এতে সমাজে তাদের ভাবমূর্তিও ভালো হবে এবং সমাজে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সুপ্রভাব ভালোভাবে পড়বে।