দুর্যোগ প্রতিরোধে চাই দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই ব্যবস্থা

ঈদের আমেজ আর বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে উম্মাদনার মাঝে সিলেট, মৌলভীবাজার ও ফেনীতে বন্যার খবরটি হয়তো জনমনে তেমন সাড়া জাগাতে পারেনি। তাই বলে থেমে নেই এসব অঞ্চলে মানুষের ভোগান্তি। সপ্তাহকাল ধরে পাহাড়ি ঢলে বন্যাকবলিত হয়েছে সিলেটের বিভিন্ন উপজেলা। উজানের পানি ও অতিবর্ষণের পাশাপাশি মনু আর ধলাই নদের বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয়েছে মৌলভীবাজারের বিভিন্ন অংশ। এতেও পানিবন্দি হয়ে পড়েছে এসব অঞ্চলের কয়েক লাখ মানুষ। বন্যার সঙ্গে প্রকট হয়ে উঠেছে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির অভাব। অনেক রাস্তাঘাট ভেঙে পড়েছে। প্লাবিত বিভিন্ন উপজেলার সঙ্গে জেলা শহরের যোগাযোগব্যবস্থাও হয়ে পড়েছে বিচ্ছিন্ন। তবু বলা যায়, এবার আমাদের ভাগ্য কিছুটা প্রসন্ন। গত বছরের মতো বোরো ফসল তোলার আগেই বন্যা হয়নি এবার। ফসল ঘরে তোলা গেছে। তবে অনেক জায়গায় তলিয়ে গেছে বীজতলা ও আমনের আবাদ। পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট এ বন্যাকে বলা হয় ?‘ফ্ল্যাশ ফ্লাড’। আকস্মিকভাবে আঘাত হানে বলে এর বিরুদ্ধে প্রস্তুতি নেওয়ার বেশি সুযোগ পাওয়া যায় না। তারপরও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলো একযোগে কাজ করলে ক্ষয়ক্ষতি কিছুটা কমানো সম্ভব।
ইতোমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে ‘যথেষ্ট ত্রাণসামগ্রী’ মজুত রয়েছে বলে। কিন্তু এটাকেই দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষমতা হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না। ত্রাণসামগ্রীর যথাযথ বিতরণ ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। বন্যা নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন উপায় আর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিয়েও ভাবতে হবে। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিস্তৃত এলাকা প্রতিবছরই বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে যাচ্ছে। খুঁজে বের করতে হবে এর সম্ভাব্য সব কারণ। এর মধ্যে মনুষ্যসৃষ্ট সমস্যাগুলো দূর করতে দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। গত বছর হাওরে বাঁধ ভেঙে বন্যার শিকার হয়েছিল বিস্তীর্ণ এলাকার ফসল ও মৎস্যসম্পদ। বন্যাকবলিত হয়েছিল কয়েক লাখ মানুষ। নি¤œমানের বাঁধ নির্মাণ ও এর রক্ষণাবেক্ষণে গাফিলতির কারণে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলাও করেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন। জনস্বার্থে এ ধরনের অনিয়ম কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মতো অন্যান্য দুর্যোগপ্রবণ এলাকার বাঁধ, সøুুইসগেট ও দুর্যোগ প্রতিরোধের অন্যান্য উপাদান কার্যকর আছে কি না, সে ব্যাপারে নজরদারি বাড়াতে হবে। পানি ধারণক্ষমতা বাড়িয়ে বন্যার প্রকোপ কমাতে নদী খননের প্রয়োজন থাকলে সে ব্যবস্থাও নিতে হবে। উপযুক্ত বরাদ্দ শুধু নয়, এর সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করা চাই এক্ষেত্রে।
বন্যা-পরবর্তী সংকট মোকাবিলায়ও দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা প্রয়োজন হবে এ অঞ্চলের মানুষের। ফসল, বাড়িঘর ও গবাদিপশুর ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে তাদের কিছুটা সময় লেগে যাবেই। এ ধরনের আঘাতে অনেকটাই পিছিয়ে পড়ে তাদের জীবনযাত্রা। দেশের অর্থনীতিতে এ অঞ্চলের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে বৈকি। সে কারণেও প্রাকৃতিক দুর্যোগে মোকাবিলায় এ অঞ্চলের মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সরকারের আরও মনোযোগ প্রয়োজন। কেবল ত্রাণসামগ্রী প্রস্তুত রাখা ও তার বিতরণ নয়Ñদুর্যোগ প্রতিরোধে সরকার দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই ব্যবস্থা নেবে, এটাই কাম্য।