দেউলিয়া আইন, ১৯৯৭ কি প্রত্যাশা পূরণ করতে পেরেছিল?

প্রফেসর কে. শামসুদ্দিন মাহমুদ: প্রাচীন রোমান সমাজে, দেউলিয়া ব্যক্তি বা ঋণ পরিশোধে অক্ষম ব্যক্তিকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা হতো এবং সার্বভৌম অনুমোদনের ভিত্তিতে তাদের দেহ টুকরো টুকরো করা হতো এবং সাগরে ফেলে দেওয়া হতো, তাদের স্ত্রী ও সন্তানদের ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি করা হতো। ঋণদাতারা তাদের দেওয়া ঋণ নিরূপণ করতে ঋণগ্রহীতার সম্পত্তি লুটপাট এবং গুঁড়িয়ে দিত। সময়ের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে, আঠারো শতকের দিকে তৎকালীন সামাজিক প্রেক্ষাপটের এমন বর্বর মনোভাবের পরিবর্তন আসে। এটা বিবেচনা করা হয় যে দেউলিয়া বা ঋণ পরিশোধে অক্ষমতাকে কোনো অপরাধ হিসাবে বিবেচনা করা উচিত নয় এবং এরকম অবস্থা যে কোনো ব্যক্তির জীবনেই ঘটতে পারে, এবং এটি একটি সম্ভাব্য ও সামাজিক পারিপার্শ্বিকতার অংশ বিশেষ। উনিশ শতকের প্রথম দিকে, বিশ্বজুড়ে আমরা বিভিন্ন আইনি ব্যাবস্থায়, এ সমস্যাকে মানবিক উপায়ে সমাধানের লক্ষ্যে ‘মানবিক’ নীতির অপর ভিত্তি করে ‘দেউলিয়া বা ঋণ পরিশোধে অক্ষম’ সম্পর্কিত আইনগুলো প্রণয়ন হতে দেখেছি।
বাংলাদেশ ব্রিটিশ-ভারতের অংশ একটি অংশ হিসাবে, কমন ল’এর নীতিগুলোকে আমাদের আইনি ব্যবস্থায় অংশীভূত করা হয় এবং বাংলাদেশ সেসূত্রে প্রেসিডেন্সি টাউনস দেউলিয়া আইন, ১৯০৯ এবং প্রাদেশিক দেউলিয়া আইন, ১৯২০ কে অনুসরণ করেছিল এবং এই দুটি আইন ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত কার্যকর ছিল, যখন বাংলাদেশে দেউলিয়া আইন, ১৯৯৭ প্রণয়ন করা হলো তখন আগের আইন দুটি বাতিল হয়ে গেল। বাংলাদেশে দেউলিয়া আইন, ১৯৯৭ প্রস্তাবনায় আইন প্রনয়নের নির্দিষ্ট কারণগুলো উল্লেখ না করে বলা হল এই আইন বাংলাদেশের দেউলিয়া সম্পর্কিত বিষয়াবলি পরিচালনার সঙ্গে সম্পর্কিত। এটা আইনি প্রতিস্থান বা কোম্পানিগুলোকে এর পরিধির মধ্যে নিয়ে আসে এবং দেউলিয়া সম্পর্কিত মামলা পরিচালনা করবার জন্য ‘দেউলিয়া আদালত’ নামে নতুন আদালত স্থাপন করে পাশাপাশি সামগ্রিকভাবে ঋণদাতাদের ঋণ পুনরুদ্ধারকে সহজতর করে। এ ধরনের নতুন আইন প্রণয়নের অন্যতম কারণ হলো নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময়ে,ব্যবসায়িক অঙ্গনে ‘ঋণখেলাপি সংস্কৃতি’ পরিলক্ষিত হয়, গ্রহণকৃত ঋণ ফেরত না দেওয়া এবং জনসাধারণের অর্থ আত্মসাতের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়, যেটি পুঁজিবাজারে একটি বিপরীতমুখী প্রভাব ফেলে।
এই আইন প্রণয়নের প্রাথমিক ধারণা কেবল আইনি সংস্থাগুলোকে আইনি বেষ্টনীর অন্তর্ভুক্ত করে কোম্পানি আইন, ১৯৯৪ এর অধীনস্থ কোনো কোম্পানির উইন্ডিং আপ কার্যক্রম থেকে সৃষ্ট দাবি পুনরুদ্ধার করা জন্য ঋণদাতারকে সুযোগ প্রদানই ছিল না, সঙ্গে সঙ্গে খেলাপি হয়ে যাওয়া ঋণ দ্রুত পুনরুদ্ধারের জন্য একটি কার্যকর ‘পুনরুদ্ধার আইন’ ও জারি করা ছিল এবং ঋণখেলাপি সংস্কৃতি থেকে পরিত্রাণ পাওয়াও এর লক্ষ্য ছিল। যদিও অদ্ভুত যে, ব্রিটিশ-ভারত এর আইন (আগে উল্লেখিত) ভারত ও পাকিস্তানে ২০১৬ সাল পর্যন্ত কার্যকর ছিল। কিন্তু দেউলিয়া আইন, ১৯৯৭ প্রণয়নের পর থেকে একটি ব্যপার পরিলক্ষিত হয়, একটি পুনরুদ্ধার আইন হিসেবে অসাধু ব্যবসায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ আদায় আগের মতো সাফল্য অর্জন করতে পারেনি এবং কিছু ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে, নতুন প্রতিষ্ঠিত দেউলিয়া আদালতের প্রদানকৃত ৮৫ শতাংশেরও বেশি আদেশ বা সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের পুনর্বিবেচনা এখতিয়ারের অধীনে চ্যালেঞ্জ এবং স্থগিত করা হয়েছিল, যার ফলে দ্রুত ঋণ আদায় হতাশাব্যঞ্জক হয়ে পড়েছিল। তাই, সরকারকে নতুন একটি পুনরুদ্ধার আইন প্রণয়নের ওপর নির্ভর করতে হয়েছিল, যা উপরিউক্ত সমস্যা, ব্যাংকিং এবং অ-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সমস্যা ও সমাধানকে সহজতর করার লক্ষ্যে ‘মানি লোন কোর্টস অ্যাক্ট, ২০০৩. আইন প্রণয়ন করতে হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে, গবেষণায় দেখা গেছে যে, ৯০ শতাংশেরও বেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো দেউলিয়া আইন, ১৯৯৭ এর আশ্রয় নেওয়ার পরিবর্তে অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর অধীনে মামলা করতে বেশি পছন্দ করে। অতএব ব্যাপারটি রয়েই যায়, দেউলিয়া আইন, ১৯৯৭ এর আদৌ দরকার ছিল (পূর্ববর্তী আইনগুলোকে বিলীন করবার) নাকি এটি কেবল সরকারের রাজস্ব বিভাগের দায় সারবার জন্য রাষ্ট্রযন্ত্রের একটি নিরর্থক প্রচেষ্টা ছিল মাত্র, যেখানে ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যান্য অংশ পুরো আইনগুলোর সঙ্গে বেশ আরামেই ছিল।
এটি সুস্পষ্ট যে, সময়ের পরিক্রমায় সমাজের প্রয়োজনীয়তায় আইনের বিধানগগুলোর পরিবর্তন কিংবা নতুন আইন প্রণয়ন জরুরি কিন্তু সেই প্রয়োজনীয়তাকে খতিয়ে দেখার জন্য অবশ্যই এটি একটি যতœশীল বিবেচনা এবং গবেষণামূলক পর্যালোচনার প্রয়োজন, ক্ষেত্রবিশেষে যেমন, আসন্ন চ্যালেঞ্জ পূরণের তথ্যের ভিত্তিতে এবং নতুন আইন আসলেই সেই কাক্সিক্ষত উদ্দেশ্যগুলো পূরণ করতে সমর্থ হবে কি না। যেমনটি ভারতে হয়েছে, তারা দেউলিয়া অবস্থা ও দেউলিয়া কার্যবিধি, ২০১৬ প্রণয়নের মাধ্যমে পুরোনো আইনগুলোকে বাতিল করে নতুন আইনে একটি সঠিক পুনর্বিন্যাসের মধ্য দিয়ে করপোরেট সংস্থা, অংশীদারি প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিকে একই ছাতার নিচে এমনভাবে নিয়ে এসেছে, যাতে ওই সব প্রতিষ্ঠান সম্পদের সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করা যায়, এতে উদ্যোক্তা ধারণা, ঋণের প্রাপ্যতা এবং সব অংশীদারের স্বার্থের একটি পরিপূর্ণ সামঞ্জস্যও থাকে এবং সরকারের পাওনাকে সুবিবেচনায় রেখে পাওনাদারের অগ্রাধিকারে বিষয়টি বিবেচনা করা যায়। এবং এ কার্যপ্রণালি খতিয়ে দেখার জন্য তাদের ভারতীয় দেউলিয়া অবস্থা বোর্ড নামে সংস্থাও রয়েছে।
দেউলিয়া আইন, ১৯৯৭, আইনের একটি উৎসাহ হীন ও অপ্রত্যাশিত প্রণয়ন, উপরিউক্ত বিষয়াবলির একটিও এতে বর্ণিত ছিল না। প্রত্যাশিত ‘পুনরুদ্ধার আইন’ হিসাবে এটি যথেষ্ট ছিল না তাই এটি ব্যর্থ হয়েছে (যেটি বাংলাদেশ সরকারকে মানি লোন কোর্টস অ্যাক্ট, ২০০৩ আইন প্রণয়নের মাধ্যমে তুলে ধরতে হয়েছে)। শেষে, আইনসভা এবং দেউলিয়া আইন, ১৯৯৭ এর প্রণেতা উভয়ই একটি দেউলিয়া বা ঋণ পরিশোধে অক্ষম আইন এবং একটি পুনরুদ্ধার আইনের পেছনের দার্শনিক দৃষ্টিকোণ উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছিল, যা অপরিহার্যভাবে ভিন্ন, যেমন, একটি দেউলিয়া বা ঋণ পরিশোধে অক্ষম আইন সবসময়ই মানবিকতার নীতির উপর ভিত্তি করে (যা আগে আলোচিত হয়েছে) ঋণগ্রহীতাকে জীবনে ‘নতুন ভাবে শুরু’ করার সুযোগ করে দেয় (যা সব পুনরুদ্ধার আইনই ঋণের এ ব্যাপারটি উপেক্ষা করে)। তাই প্রশ্ন থেকে যায়, দেউলিয়া আইন ১৯৯৭, আইনসভার সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পেরেছিল কি না।

ডিন, স্কুল অব ল
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

ইংরেজি থেকে অনুবাদ: শেখ নোমান পারভেজ
শিক্ষার্থী, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়