মত-বিশ্লেষণ

দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকুক

কামরুন নাহার মুকুল: বাংলাদেশ একটি সুন্দর ও বিপুল সম্ভাবনার দেশ। এ দেশের সৌন্দর্য এবং সম্পদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে এক সময় আরব ও ইউরোপ থেকে বণিকরা বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে আসতেন। এর সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে এ দেশের মানুষের উন্নয়নের সংগ্রাম। এখানকার মানুষ আত্মবিশ্বাসী; যে কোনো অসম্ভবকে বাস্তবায়ন করতে আরও বেশি অঙ্গীকারবদ্ধ। আর্থসামাজিক উন্নয়নে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেশকিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। তার ১০টি বিশেষ উদ্যোগের মধ্যে একটি বিনিয়োগ বিকাশ। মধ্যম আয়ের দেশ থেকে স্বল্পোন্নত দেশে উন্নীত হতে এ উদ্যোগটি দেশের অর্থনীতিকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেছে। উদ্যোগটি উন্নয়নের মৌল সূত্র হিসেবে পরিগণিত। সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে আর্থসামাজিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে একটি নতুন মাইলফলক হবে।
বিনিয়োগ মূলত দুই প্রকার। একটি পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট যাকে সরকারি বিনিয়োগ বলা হয়। অন্যটি বেসরকারি প্রাইভেট ইনভেস্টমেন্ট, যা ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ। সরকারি আন্তরিকতা ও প্রজ্ঞায় ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সরকারি বিনিয়োগ সাত দশমিক ২৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় বেশি। বেসরকারি বা ব্যক্তিগত খাতে বিনিয়োগ ২৩ দশমিক এক শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এ দুটো ক্ষেত্রে উন্নয়নের গতি ইতিবাচক। গত অর্থবছরে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ ১০ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বিনিয়োগ বিকাশের উদ্যোগে ২০৪১ সালে বাংলাদেশকে একটি উন্নত দেশে রূপান্তরিত করা সম্ভব হবে। দেশে উন্নয়নের জন্য একেক দেশের এক একটি কৌশল থাকে। আমাদের দেশে উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে দেশজ উন্নয়ন কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে।
সার্বিকভাবে বিনিয়োগ কার্যক্রম বিকশিত করার লক্ষ্যে সরকার অনেক পদক্ষেপ নিয়েছে; অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। ১০টি অঞ্চল দিয়ে ২০১৬-১৭ সালে কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। আগামী ১৫ বছরে ১০০টি অঞ্চল স্থাপন কাজ বাস্তবায়ন করছে। বিনিয়োগকে বেগবান করতে অর্থনৈতিক অঞ্চল মূল ভূমিকা পালন করবে। জ্বালানি সহজলভ্য হওয়ার পাশাপাশি বিশেষ শুল্ক সুবিধা পাওয়ার কারণে বিনিয়োগে অনেকেই আগ্রহী। ফলে উৎপাদিত দ্রব্য দেশের বাইরে রফতানিসহ দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও বিক্রি করা যাবে। ২০১০ সালের আগস্টে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল আইন সংসদে পাস হয়। ২০২১ সালের মধ্যে ৫৪০ কোটি মার্কিন ডলারের বৈদেশিক বিনিয়োগ আনতে সক্ষম হবে। এছাড়া সরকার অনেক কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ শিল্পনীতি-২০১৬, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন-২০১৬, প্রকিউরমেন্ট গাইডলাইন ফর দ্য পিপি প্রজেক্টস-২০১৬। এছাড়া ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ তারিখে ওয়ান স্টপ সার্ভিস অ্যাক্ট নামে আরেকটি আইন পাস হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই আইনগত সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি বিনিয়োগ কার্যক্রমে উৎসাহিত হবেন।
আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশকে বলা হচ্ছে ২০৫০ সালে বাংলাদেশ ২৩তম বৃহৎ অর্থনৈতিক দেশ হিসেবে পরিচিতি লাভ করবে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশ একটি চমৎকার ডেস্টিনেশন হতে পারে। ২০১৬ থেকে ২০৫০ সালে যে কয়টি দেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সামনে থাকবে, তার মধ্যে বাংলাদেশ একটি। বিনিয়োগের পূর্বশর্ত অবকাঠামোমূলক উন্নয়ন। বিদ্যুৎ জ্বালানি ব্যবস্থার সংস্কারসহ তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার। এসব ক্ষেত্রে সাফল্য রয়েছে। বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন ২০ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে; বিনিয়োগও বেড়েছে।
বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। ৪৫ শতাংশ মানুষ কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত আর কৃষিতে আমাদের যে দক্ষতা রয়েছে তা অনস্বীকার্য। কৃষিতে বাজারজাতকরণের সুযোগ রয়েছে আবার উপকরণ প্রস্তুতিতে বিনিয়োগও রয়েছে। পাশাপাশি একটি দেশে যখন মাথাপিছু আয় বাড়ে, তখন শস্য ব্যতীত যে খাত-প্রোটিন তা সরবরাহের চাহিদা বেড়ে যায়। মৎস্য ও প্রাণিজসম্পদ খাতে বিনিয়োগের সুযোগ হয়। আমাদের জাতীয় আয় বেড়েছে। জাতীয় আয় বাড়লে আমিষ গ্রহণেরও পরিমাণ বেড়ে যায় এবং সরকারের পদক্ষেপগুলোর মাধ্যমে বিনিয়োগ আরও ত্বরান্বিত হয়। জাতিসংঘ বাংলাদেশকে ২০২৪ সালে উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি দেবে। জাতিসংঘের সর্বশেষ রিপোর্ট বাংলাদেশ এখন একটি ম্যানুফ্যাকচারিং এক্সপোর্টার কান্ট্রি।
প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উদ্যোগগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে শিখরস্পর্শী হবে আর পৃথিবীর অনেক দেশের জন্যই হতে পারে উন্নয়নের এক পথরেখা রোলমডেল। বলাই বাহুল্য, বর্তমান সরকার বাংলাদেশকে উন্নত দেশে পরিণত করার লক্ষ্যে যে রূপকল্প প্রণয়ন করেছে, সেখানে এই বিশেষ উদ্যোগগুলো প্রভাবকের ভূমিকা পালন করছে। নির্মীয়মাণ পদ্মা বহুমুখী সেতুর কাজ দ্রুত এগিয়ে চলেছে। মহাসড়কগুলো চার লেনে উন্নীত হয়েছে। পরিবহন ও অবকাঠামোগত যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন; ১০টি ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। যোগাযোগ খাতের উন্নয়ন বিনিয়োগের নতুন দ্বার উম্মোচন করেছে। দেশের অভ্যন্তরে এবং আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা সহজ হয়েছে। চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দর অত্যাধুনিক সমুদ্রবন্দর হিসেবে গড়ে উঠেছে।
বিনিয়োগ কার্যক্রম সহজীকরণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা বেজা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এবং সারাদেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে। অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরির জন্য ৩০টি এলাকা নির্বাচন করা হয়েছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) ইতোমধ্যে ১৭টি প্রতিষ্ঠানকে প্রি-কোয়ালিফিকেশন লাইসেন্স এবং পাঁচটি বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলকে চূড়ান্ত লাইসেন্স প্রদান করেছে। বেজার আগামী ১৫ বছরের মধ্যে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশীয় প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদন শিল্পের জন্য উপযুক্ত নীতি গ্রহণের পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন পরিবেশ নিশ্চিত করাও প্রয়োজন। এ খাতে আরও বেশি কারিগরি সহায়তা ও বিনিয়োগের প্রয়োজন আছে; পাশাপাশি অন্য উদ্যোক্তাদেরও এ খাতে বিনিয়োগে এগিয়ে আসা উচিত। প্রযুক্তি খাত বিশেষ করে মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রির বিকাশ এখন সময়ের চাহিদা। প্রযুক্তিবিদদের মতে, স্থানীয় পর্যায়ে মোবাইল ফোনের মাদারবোর্ড, ডিসপ্লে, হাউজিং অ্যান্ড কেসিং, ব্যাটারি, চার্জার এবং এয়ারফোনসহ সব ধরনের অ্যাক্সেসরিজ উৎপাদন শিল্পের জন্য সহায়ক; এ খাতে দেশীয় বিনিয়োগ বাড়লে বিদেশ নির্ভরতা হ্রাস পাবে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
রাষ্ট্রের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি শিল্প খাত; বর্তমান সরকারও শিল্পবান্ধব। শিল্পনীতি বিনিয়োগবান্ধব করা হয়েছে। শিল্পাঞ্চলকে কেন্দ্র করে হাসপাতাল, হোটেল, আবাসিক এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। অনেকের কর্মসংস্থান হচ্ছে। পরিকল্পিত অর্থনীতির সুফল পাচ্ছে বাংলাদেশ। এখন বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২১ সালের আগেই বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে হলে বেশি সংখ্যক অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই। দেশে অধিকতর উন্নয়নে পর্যায়ক্রমে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় সরকারের পরিকল্পনার কথা বারবার ব্যক্ত হয়েছে। এও সত্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্থানীয় সম্পদের পর্যাপ্ততার ভিত্তিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠায় ইতিবাচক ফল দেবে। কৃষিজাত পণ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প স্থাপনও নিঃসন্দেহে দূরদর্শী কাজ হবে। নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা মানেই নতুন বিনিয়োগ। তাই পুরোনো ধ্যান-ধারণা বাদ দিয়ে নতুন ধারণা নিয়ে কাজ করা প্রয়োজন। নতুন বিনিয়োগে ব্যাপক শিল্পায়ন হলে দেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও বিরাট সম্ভাবনার দরজা খুলে যাবে। তাতে দেশে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটবে। অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার জন্য সবকিছুর আগে প্রয়োজন জমি। কৃষিজমিতে কোনোভাবেই শিল্প ও আবাসন গড়তে দেওয়া যাবে না। অল্প জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিতকল্পে শিল্পায়নে বহুতলবিশিষ্ট শিল্পভবন ও কারখানা নির্মাণ করতে হবে।
ট্যুরিজম শিল্পে কর্মসংস্থানের যেমন সুযোগ রয়েছে, তেমনি এ খাতের আয় অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে; কর্মসংস্থানেরও সুযোগ হবে। আবার বছরে অতিরিক্ত দুই বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেরও সুযোগ সৃষ্টি হবে। এ দেশ এখন বিনিয়োগের একটি বিশেষ জায়গা। অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোয় চীন, ভারত, জাপানসহ উন্নত দেশ থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রস্তাব পাওয়া গেছে। বাংলাদেশে পাঁচটি অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য ভারত মোট ২৭৮ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের এমন ব্যাপক আগ্রহ দেশের অর্থনীতিতে অমিত সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেবে বলে আশা করা যায়। এখন কেবল দেশপ্রেমকে ধারণ করে দায়িত্বশীলতা ও দক্ষতার সঙ্গে কর্তব্য পালনের অঙ্গীকার প্রত্যাশিত।

পিআইডি নিবন্ধ

ট্যাগ »

সর্বশেষ..