দেশীয় ঋণে খেলাপি হলেও বিদেশি ঋণে নিয়মিত

তৈরি পোশাক খাত

শেখ আবু তালেব: গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের বেসরকারি খাতে আসা বিদেশি ঋণের পরিমাণ ১৪৯ কোটি ৪৩ লাখ মার্কিন ডলার, স্থানীয় মুদ্রায় যা সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি। এসব ঋণের ৬০ শতাংশ তৈরি পোশাক খাতে। সুনাম ধরে রাখতে বিদেশ থেকে নেওয়া ঋণ ও সুদ নিয়মিত শোধ করে আসছেন পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা। অথচ এ খাতের উদ্যোক্তারা দেশীয় ব্যাংক থেকে যে ঋণ নিয়েছেন, তার ১১ দশমিক ৭ শতাংশ খেলাপি। আর এ খেলাপি দেশের মোট খেলাপি ঋণের সাড়ে ১৪ শতাংশ। যদিও খেলাপির দায় নিতে রাজি নন পোশাক মালিকরা। তাদের দাবি, দুষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশে কমপ্লায়েন্স না মেনে দেওয়া ঋণগুলোই খেলাপি হচ্ছে।
ব্যক্তি খাতে বিদেশি ঋণের উপাত্ত নিয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম), বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ও বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর শেষে স্থানীয় ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে তৈরি পোশাক খাতের ব্যবসায়ীদের নেওয়া ঋণের পরিমাণ ছিল ৯৩ হাজার ৩০ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ১১ দশমিক সাত শতাংশ ও খাতভিত্তিক হিসাবে তৃতীয়।
বর্তমানে ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৯ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা। এর মধ্যে তৈরি পোশাক খাতে রয়েছে ১০ হাজার ৭৯০ কোটি টাকা, যা মোট খেলাপির ১৪ দশমিক ৫০ শতাংশ। ঋণ খেলাপির খাতভিত্তিক হিসাবে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে তৈরি পোশাক খাত। অথচ ব্যাংক খাতে গড় খেলাপি হওয়ার ঋণের ১০ দশমিক ৪১ শতাংশে।
এ বিষয়ে তৈরি পোশাক কারখানা মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান শেয়ার বিজকে বলেন, ‘বিদেশিরা শতভাগ কমপ্লায়েন্স মেনেই ঋণ দেয়। যারা সব কমপ্লায়েন্স মানে, তারাই ঋণ পায়। আর স্থানীয় ঋণের ক্ষেত্রে একশ্রেণির ব্যাংক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশ করে শতভাগ কমপ্লায়েন্ট নয়, এমন কারখানা ঋণ পায়। ওইসব ব্যবসায়ী ঋণ নেয় ফেরত না দেওয়ার জন্যই। ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণ ও আদায় ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণেই পোশাক খাতে খেলাপি ঋণ বাড়ছে।
বর্তমান খেলাপি হওয়া ৮৯ হাজার ৩৪০ কোটি টাকার বাইরে আদায় অযোগ্য হওয়ায় অবলোপন করা হয়েছে ৫৫ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া ঋণ পুনর্গঠন ও পুনঃতফসিল করা হয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকা। সব যোগ করলে প্রকৃত খেলাপি ঋণ দুই লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। তখন তৈরি পোশাক খাতে খেলাপি হওয়ার ঋণের পরিমাণ ও হার দুটিই বাড়বে বলে জানিয়েছেন ব্যাংকাররা।
জানা গেছে, বাংলাদেশে মূলত বিদেশি ঋণ নেওয়ার অনুমোদন দেওয়া হয় ২০০৬ সালে। ওই বছর বেসরকারি খাতে বিদেশি ঋণের পরিমাণ ছিল ১১ কোটি ৬০ লাখ ডলার, যা মোট বিদেশি ঋণের মাত্র ছয় দশমিক ১২ শতাংশ। ২০১৭ সাল শেষে তা দাঁড়িয়েছে ১৪৯ কোটি ৪৩ লাখ ডলার। বর্তমানে বিদেশি ঋণের ৬০ দশমিক ২০ শতাংশই হচ্ছে তৈরি পোশাক খাতের। এর পরই রয়েছে বিদ্যুৎ খাতের ১১ দশমিক ৪০ শতাংশ।
সাধারণত বিদেশি ঋণ নেওয়া হয় লন্ডনের লাইবর রেটে। স্থায়ী ও তিন, ছয় ও ১২ মাসের সুদের বিপরীতে শূন্য দশমিক ৩৬ শতাংশ থেকে সাড়ে তিন শতাংশ পর্যন্ত সুদে এই ঋণ নেওয়া হয়। ২০১৭ সাল বিদেশি ঋণের গড় সুদ ছিল তিন দশমিক ৬০ শতাংশ। এর সঙ্গে যোগ হয় দেশীয় অল্প সুদ ও কর। ফলে বিদেশি ঋণের সুদহার সব সময়ই বাংলাদেশি ব্যাংকের চেয়ে কম হয়।
কিন্তু অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা বলছেন, বাংলাদেশে বিদেশি ঋণের পরিমাণ অর্থনীতিতে ঝুঁকি ও চাপ বাড়ালেও এখন পর্যন্ত কোনো ঋণ খেলাপি হয়নি। যথাসময়ে এসব ঋণ পরিশোধ করছে ব্যবসায়ীরা। অনেকেই বিদেশি ঋণ নিয়ে ব্যাংকে জমা রেখে সুদবাবদ আয় করছে।
তৈরি পোশাক খাতে বিদেশি ঋণের খেলাপি না হওয়া প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিদেশি ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে সবরকম তথ্য ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখা হয়, যাতে কেউ খেলাপি হতে না পারে। এজন্য বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ ব্যাংকও নজর রাখে। কিন্তু দেশীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার সময়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও কমপ্লায়েন্স যথাযথভাবে দেখা হয় না। একশ্রেণির ব্যবসায়ী ও ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশেই বিতরণ করা ঋণ খেলাপি হয়।
এ বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, ‘বিদেশি ঋণ পরিশোধ না করলে কোম্পানিটি কালো তালিকাভুক্ত হয়। এতে পোশাক রফতানিতে বাধা সৃষ্টি হবে। বাংলাদেশের সুনাম নষ্ট হতে পারে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকও সতর্ক দৃষ্টি রাখে বিদেশি ঋণ পরিশোধে। এসব বিবেচনায় বিদেশি ঋণখেলাপি হয় না। যথাসময়ে সুদ ও মূল ঋণ পরিশোধ করেন ব্যবসায়ীরা। যদিও দেশীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে তারা মনে করেন, তা আর ফেরত দেওয়া লাগবে না।’
ব্যবসায়ীদের প্রবণতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘দেশিয় খেলাপি হওয়ার আগে পুনর্গঠন ও পুনঃতফসিল সুবিধা নেন ব্যবসায়ীরা। তারপরও খেলাপি হয়। এক পর্যায়ে এসব ঋণ রাইট অফ (অবলোপন) হলে আর চিন্তাই করেন না পরিশোধের। রাজনৈতিক বিবেচনায় দেওয়া এসব ঋণ আদায়ে আইনি ব্যবস্থাও দুর্বল। শাস্তি প্রদান ও খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না থাকায় ব্যবসায়ীরা দেশীয় ঋণ পরিশোধে আগ্রহ দেখান না।’