প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

দেশের আর্থিক খাতের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালী করার পরামর্শ

শেখ আবু তালেব: বাংলাদেশের আর্থিক খাতের সংস্কার ইস্যুতে পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। ব্যাংকসহ আর্থিক খাতের বিভিন্ন ইস্যুতে আইএমএফের প্রতিনিধিদলটি গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে দুটি বৈঠক করে। বৈঠকে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আইএমএফ। একইসঙ্গে উচ্চ আদালতে রিট করে বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ হিসাবের খাতায় না রাখার বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন তারা। এ থেকে প্রতিকারের জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত ভিত্তি শক্তিশালী করার পরামর্শ দেওয়া হয় আইএমএফের পক্ষ থেকে।
বৈঠক সূত্রে জানা যায়, প্রতিনিধিদলের সদস্যরা দুভাগে বিভক্ত হয়ে গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। প্রথম বৈঠক দুই ডেপুটি গভর্নর এসএম মনিরুজ্জামান ও আহমেদ জামালের সঙ্গে এবং দ্বিতীয় বৈঠক করেন বিভিন্ন বিভাগীয় প্রধান ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে। উভয় বৈঠকেই আইএমএফের পক্ষে নেতৃত্ব দেন সংস্থাটির এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রধান ডাইসাকু কিহারা।
বর্তমানে বিশ্বের ১৮৯টি দেশ আইএমএফের সদস্য। সদস্য দেশগুলোর বিশ্বব্যাপী আর্থিক খাত ও মুদ্রা ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করে সংস্থাটি। সংস্থাটির অর্থায়নে বেশ কয়েকটি সংস্কার ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে বাংলাদেশে।
বৈঠকে সূত্রে জানা যায়, এটি আইএমএফের একটি নিয়মমাফিক সফর। সংস্থাটির সঙ্গে চুক্তির শর্ত হিসেবে তারা প্রতি ছয় মাস পরপর ব্যাংক খাতের বিভিন্ন সূচকের অগ্রগতি ও অবনতি বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে জানতে চায়। এর ধারাবাহিকতায় চলতি সফরে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন বিভাগের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছে প্রতিনিধিদলটি। খেলাপি ঋণ এমন অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ার কারণ কী, তা জানতে চেয়েছেন তারা। পাশাপাশি এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় কী এবং খেলাপি ঋণ এ অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ার পেছনে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত কোনো দুর্বলতা আছে কি না এসব জানতে চেয়েছে প্রতিনিধিদল। এছাড়া উচ্চ আদালতে রিট করার ফলে যে বিপুল অঙ্কের ঋণ খেলাপি হিসেবে দেখানো যাচ্ছে না সে বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া যায়, তা জানতে চান তারা।
এসব বিষয়ে আইএমএফের প্রতিনিধিদের কাছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে সর্বশেষ পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়, নানা কারণে খেলাপি ঋণ আদায়ে শ্লথ গতি হয়েছে। এর বাইরে ডিসেম্বর শেষে যেসব ঋণ নবায়ন করা হয়েছিল, তা পরবর্তী তিন মাসে আদায় না হওয়ায় তা খেলাপি হয়ে গেছে। এর মধ্যে যারা ইচ্ছেকৃত ঋণখেলাপি, তাদের শনাক্ত করা হচ্ছে। আর যারা ব্যবসায় প্রকৃতপক্ষে লোকসান গুনে ব্যাংকের টাকা পরিশোধ করতে পারছেন না, তাদের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এজন্য দুই শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ১০ বছরের জন্য নবায়ন করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, যা উচ্চ আদালতে রিট করায় তা বাস্তবায়ন পর্যায়ে এসে স্থগিত করে রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অপর এক কর্মকর্তা এ বিষয়ে জানিয়েছেন, খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাখ্যায় আইএমএফ প্রতিনিধিরা সন্তুষ্ট হতে পারেননি। বরং খেলাপি ঋণ অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এ থেকে উত্তরণের জন্য কিছু পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বাংলাদেশ ব্যাংকসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালী করা।
কোনো ঋণখেলাপি রাজনৈতিক বিবেচনায় যেন ছাড় না পান, সেজন্য এসব প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী কাঠামোতে দাঁড় করাতে বলা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো নিজ থেকেই যাতে ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে, সে বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে।
খেলাপি ঋণের পরিসংখ্যান জানতে চায় প্রতিনিধিদলগুলো। সেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়, গত ডিসেম্বর শেষে দেশে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ৯৩ হাজার কোটি টাকা। গত মার্চ শেষে তা দাঁড়িয়েছে এক লাখ ১০ হাজার কোটি টাকায়।
প্রসঙ্গত, ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের বাইরে খেলাপি হওয়া ঋণের মধ্যে অবলোপন (রাইট অফ) করা হয়েছে প্রায় ৪৮ হাজার কোটি টাকা। সব মিলে মার্চ থেকে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৫৮ হাজার কোটি টাকায়।

ট্যাগ »

সর্বশেষ..