দেশের বিদ্যুৎ চাহিদার এক-চতুর্থাংশ মেটাবে মহেশখালী পাওয়ার হাব

ইসমাইল আলী: বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ মহেশখালী, যার পুরো দ্বীপটাই সাগরবেষ্টিত। পর্যটন জেলা কক্সবাজারের উপজেলা এটি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এ দ্বীপই হবে আগামী দিনে বাংলাদেশের পাওয়ার হাব। ২০৪১ সালে দেশের বিদ্যুৎ চাহিদার এক-চতুর্থাংশ মেটাবে মহেশখালীর এ পাওয়ার হাব। এজন্য সেখানে গড়ে তোলা হবে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের আটটি ব্লক। সঙ্গে আরেকটি ব্লকে থাকবে তিনটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসভিত্তিক (এলএনজি) বিদ্যুৎকেন্দ্র।

মহেশখালী পাওয়ার হাব মাস্টারপ্ল্যানে এ ধরনের পরিকল্পনাই তুলে ধরা হয়েছে। সম্প্রতি এটি চূড়ান্ত করে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডে (পিডিবি) জমা দিয়েছে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান জার্মানিভিত্তিক স্টেগ জিএমবিএইচ। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) উদ্যোগে সমীক্ষাটি পরিচালনা করা হয়।

এতে দেখা যায়, এলাকাটির কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে পাওয়া যাবে ১০ হাজার ৫৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। আর এলএনজিভিত্তিক ব্লক থেকে আসবে আরও তিন হাজার মেগাওয়াট। সব মিলিয়ে মহেশখালী থেকে আসবে সাড়ে ১৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। আর ২০৪১ সালে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা হবে প্রায় ৫১ হাজার মেগাওয়াট। অর্থাৎ মোট চাহিদার প্রায় ২৬ দশমিক ৫৯ শতাংশ মেটাবে মহেশখালী পাওয়ার হাব।

বিদ্যুৎ উৎপাদন ছাড়াও মহেশখালীতে নির্মাণ করা হবে কয়লা খালাস টার্মিনাল ও এলএনজি টার্মিনাল। এছাড়া থাকবে গভীর সমুদ্রবন্দর। পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা হবে। এছাড়া পরিকল্পিত নগরায়নও হবে উপজেলাটিতে। এজন্য সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। সব মিলিয়ে মহেশখালী উন্নয়নে বিনিয়োগ লাগবে দুই লাখ কোটি টাকার বেশি। এর বড় অংশই যাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনে।

মাস্টারপ্ল্যানে বলা হয়, মহেশখালীর পরিকল্পিত উন্নয়নে পাঁচ হাজার ৬৬৮ একর জমি প্রয়োজন হবে। উপজেলার হোয়ানক ও কালারমার ছড়া ইউনিয়নে এ জমি অধিগ্রহণ করা হবে। এজন্য গত বছর জুনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অনুমোদন নেওয়া হয়েছে। পরের মাসে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে এজন্য ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করা হয়। এছাড়া বিদ্যমান সড়কগুলো প্রশস্ত করতে হবে। আর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোয় যাতায়াতে চার থেকে ছয় লেনের সড়ক নির্মাণ করতে হবে।

অধিগ্রহণকৃত জমির মধ্যে আটটি কয়লাভিত্তিক ব্লক গড়ে তুলতে লাগবে এক হাজার ৬০০ একর। এছাড়া কয়লা পরিবহনে কনভেয়ার বেল্ট নির্মাণে আরও ৪৫ একর ও কয়লা মজুতাগার গড়ে তুলতে ১৮২ একর জমি লাগবে। আর বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লার বর্জ্য রাখতে জমি লাগবে ৬০৪, ছাই পরিবহনে পাইপলাইন নির্মাণে ১০৮ ও ছাই মজুত এলাকা গড়ে তুলতে লাগবে আরও ৮০০ একর।

এর বাইরে এলএনজি ব্লক গড়ে তুলতে জমি লাগবে ১৫৫ একর। বন্দর এলাকার জন্য লাগবে আরও ২৫৩ একর জমি। আর সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণে প্রয়োজন হবে ৩০৩ একর এবং সমুদ্রের ভাঙনরোধে প্রতিরক্ষা এলাকায় লাগবে ২০০ একর জমি। এছাড়া বিদ্যুৎ পরিবহনে সাব-স্টেশন গড়ে তোলায় ২৩৮ একর, সুপেয় পানির ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ২১০, নগরায়নে ৬০০ ও বনায়নে ৩৭০ একর জমি প্রয়োজন হবে।

কয়লাভিত্তিক ব্লকগুলোয় ৬৬০ মেগাওয়াটের দুটি করে মোট ১৬টি আলট্রা সুপারক্রিটিক্যাল কয়লাভত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকবে। এজন্য কয়লা খালাসে তিনটি জেটি নির্মাণ করা হবে। প্রতিটি জেটির দৈর্ঘ্য হবে ৩০০ মিটার ও প্রস্থ ৬০ মিটার। আটটি ব্লকে ১৫ দিনের কয়লা মজুত রাখতে হবে। এতে ১৩ লাখ টন কয়লা মজুত থাকবে। আর এলএনজি ব্লকে ৭৫০ মেগাওয়াটের কম্বাইন্ড সাইকেল চারটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। এ জন্য বছরে ২৪ লাখ ৩৪ হাজার টন গ্যাস লাগবে। এ জন্য এলএনজি টার্মিনালে বছরে ২৫টি জাহাজ ভিড়বে।

প্রতিবেদনের তথ্যমতে, জমি অধিগ্রহণে ব্যয় হবে এক হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এটি এরই মধ্যে শুরু করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬০০ কোটি টাকা সরবরাহ করছে পিডিবি। আরও ৮০০ কোটি টাকা সরকারের পক্ষ থেকে সরবরাহ করা প্রয়োজন। আর জমি উন্নয়নে ব্যয় হবে সাত হাজার ৫২০ কোটি টাকা।

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ ব্লকের প্রতিটির জন্য ব্যয় হবে ১৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এতে ৮টি ব্লকে ব্যয় হবে ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা। আর এনএনজিভিত্তিক প্রতিটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ব্যয় হবে আট হাজার কোটি টাকা। এ হিসেবে চারটি কেন্দ্রে ব্যয় হবে ৩২ হাজার কোটি টাকা। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উচ্ছিষ্ট ব্যবস্থাপনা অবকাঠামো গড়ে তুলবে ব্যয় হবে নয় হাজার ২৮০ কোটি টাকা।

এর বাইরে বন্দর, পোতাশ্রয় (হারবার) ও এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণে ব্যয় হবে পাঁচ হাজার ২০০ কোটি টাকা। সাত কিলোমিটার কয়লাবাহী বেল্ট নির্মাণে ২৪০ কোটি ও নগরায়নে দুই হাজার ১২০ কোটি টাকা ব্যয় হবে। সব মিলিয়ে মহেশখালী মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নে ব্যয় হবে দুই লাখ পাঁচ হাজার ৭৬০ কোটি টাকা।

জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ শেয়ার বিজকে জানান, সরকার সুপরিকল্পনার মাধ্যমে মহেশখালী দ্বীপকে এনার্জি হাব হিসেবে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখানে কমপক্ষে ১০ হাজার মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। এজন্য সাগরপথে বিদেশ থেকে কয়লা আমদানি করতে অত্যাধুনিক জেটি তৈরি করা হবে। এখানে কয়েকটি এলএনজি টার্মিনাল হবে। এখানকার প্রস্তাবিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য জলপথে কয়লা সরবরাহ সহজ হবে। এছাড়া পর্যাপ্ত খাসজমি রয়েছে এ দ্বীপে, জনবসতিও কম। সবকিছু বিবেচনায় মহেশখালী এনার্জি হাবের জন্য উপযুক্ত স্থান।

মহেশখালী উন্নয়নে কিছু সীমাবদ্ধতাও তুলে ধরা হয়েছে মাস্টারপ্ল্যানে। এতে বলা হয়, চাইলেও পুরো উপজেলাটিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করা সম্ভব নয়। কারণ এর খুব কাছেই রয়েছে কক্সবাজার বিমানবন্দর। এতে চাইলে প্রতিটি ব্লকের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর চিমনিগুলো একটি নির্দিষ্ট এলাকার বাইরে নির্মাণ করা যাবে না। নো-ফ্লাইং জোন হওয়ায় এ উপজেলার ৮৪ শতাংশ এলাকাই বিদ্যুৎকেন্দ্রের চিমনি নির্মাণে অনুপযুক্ত। মাত্র ১৬ শতাংশ এলাকায় সবগুলো বিদ্যুৎকেন্দ্রের চিমনি নির্মাণ করতে হবে।

এদিকে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য বছরে ৮০ হাজার জাহাজ ভিড়বে বন্দরে। কয়লাবাহী এসব জাহাজের জন্য সাত কিলোমিটার চ্যানেল নিয়মিত ড্রেজিং করতে হবে। এ চ্যানেলটির গভীরতা দুই-তিন মিটার। অথচ কয়লাবাহী জাহাজের জন্য ১২-১৩ মিটার গভীরতা দরকার। এজন্য প্রায় চার কোটি ঘনফুট মাটি কেটে (ড্রেজিং) ফেলতে হবে।

মাস্টারপ্ল্যানটি বাস্তবায়নে অর্থায়নের বেশকিছু নির্দেশনাও রয়েছে। এর মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে বিল্ড ওন অপারেট পদ্ধতি (বিওও) সুপারিশ করা হয়েছে। আর কিছু ক্ষেত্রে সরকারের নিজস্ব তহবিল বা বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের সুপারিশ রয়েছে। আর কেন্দ্রগুলোর জন্য কয়লা অস্ট্রেলিয়া ও ইন্দোনেশিয়া এবং এলএনজি কাতার বা অন্য কোনো দেশ থেকে আমদানি করা হবে।