প্রচ্ছদ শেষ পাতা

দেশে অর্থায়নে পুঁজিবাজারের অবদান মাত্র এক শতাংশ!

শেখ আবু তালেব: দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন স্থিতিশীল পর্যায়ে রয়েছে বলে সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে বলা হচ্ছে। দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কয়েক বছর ধরেই সাত শতাংশের ওপরে রয়েছে। কিন্তু অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সমন্বয় হচ্ছে না পুঁজিবাজারের। গত চার বছরে মুদ্রাবাজার ও পুঁজিবাজার থেকে পাঁচ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র এক দশমিক দুই শতাংশ জোগান দিয়েছে পুঁজিবাজার।
গত পাঁচ বছরে দেশের মুদ্রাবাজার (ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান) ও পুঁজিবাজার থেকে নেওয়া অর্থের পরিমাণ নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছেন আইডিএলসি ফাইন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আরিফ খান। প্রতিবেদনটি সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ডিবিএ’র সেমিনারে উপস্থাপন করা হয়েছে। সেমিনারটিতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল এই চার বছরের তথ্য নিয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৪ সালে মুদ্রা ও পুঁজিবাজার থেকে সংগ্রহ করা অর্থের মধ্যে পুঁজিবাজার থেকে নেওয়া হয়েছিল তিন দশমিক সাত শতাংশ। পরের বছরে তা আরও কমে যায়। ২০১৫ সালে সংগ্রহ করা হয়েছিল মাত্র শূন্য দশমিক সাত শতাংশ। ২০১৬ সালে শূন্য দশমিক ছয় শতাংশ ও ২০১৭ সালে তা দাঁড়ায় শূন্য দশমিক আট শতাংশ।
তথ্য বলছে, এই চার বছরে দেশের মুদ্রা ও পুঁজিবাজার থেকে পাঁচ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে বিভিন্ন কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠান। মূলত নতুন প্রতিষ্ঠান চালু, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সংস্কার ও চলতি মূলধন বৃদ্ধিতে এসব অর্থ নিয়েছে কোম্পানিগুলো। কিন্তু এ অর্থের মাত্র ছয় হাজার ৩০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে পুঁজিবাজার থেকে, যা মোট অর্থায়নের মাত্র এক দশমিক দুই শতাংশ।
এ বিষয়ে পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক আবু আহমেদ শেয়ার বিজকে বলেন, ‘মুদ্রাবাজার উৎস থেকেই সাধারণত অর্থায়ন বেশি হয়। কিন্তু সে তুলনায় পুঁজিবাজার থেকে অর্থসংগ্রহের পরিমাণ আনুপাতিক হারে বৃদ্ধি পায়নি। কারণ ব্যাংকগুলো দীর্ঘ মেয়াদে ঋণ দিচ্ছে। বিশ্বের কোথাও তা নেই। দীর্ঘ মেয়াদে ঋণ নেওয়ার উৎস হচ্ছে পুঁজিবাজার। এটি চালু না করলে পুঁজিবাজারের উন্নয়নে গতি আসবে না। বন্ড মার্কেট তৈরি ও উন্নয়ন করতে হলে ব্যাংকগুলোকে দীর্ঘ মেয়াদে ঋণ দেওয়া বন্ধ করতে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে।’
তথ্য বলছে, পুঁজিবাজার থেকে এ সময়ে অর্থ নেওয়া হয়েছে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) ও রাইট অফারের মাধ্যমে। যদিও এই বছরগুলোতে পুঁজিবাজার থেকে অর্থসংগ্রহের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু মুদ্রাবাজারের উৎসের সঙ্গে অনুপাতিক হারে বৃদ্ধি পায়নি, উল্টো কমেছে। ডিএসইর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৮ সালে দেশের পুঁজিবাজার থেকে মিউচুয়াল ফান্ড ও ১৪টি সিকিউরিটিজ আইপিওর মাধ্যমে ৬০১ কোটি টাকা মূলধন সংগ্রহ করে। এর পূর্ববর্তী বছর ২০১৭ সালে সংগ্রহ করেছিল মাত্র ২৪৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা।
এছাড়া আইপিওর বাইরে তালিকাভুক্ত কোম্পানি রাইট শেয়ার ইস্যু করে পুঁজিবাজার থেকে ২৬৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা সংগ্রহ করে। ২০১৭ সালে সংগ্রহ করেছিল এক হাজার ১১৪ কোটি টাকা।
২০১৭ সালে আইপিও ও রাইট শেয়ারের মাধ্যমে বিভিন্ন কোম্পানি পুঁজিবাজার থেকে সরাসরি মূলধন সংগ্রহ করেছিল এক হাজার ৩৬৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা, যা মুদ্রা ও পুঁজিবাজারের অনুপাতে শূন্য দশমিক আট শতাংশ। এছাড়া ২০১৭ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো বোনাস শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে দুই হাজার ৭৯১ কোটি ৬০ লাখ টাকার মূলধন বৃদ্ধি করে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, একটি কার্যকর বন্ড মার্কেট গঠন করতে পারলে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের উৎস হতে পারবে দেশের পুঁজিবাজার। উদ্যোক্তারা কম সুদে অর্থ নিতে পারবেন। ব্যাংক খাতেও খেলাপি ঋণের বোঝা কমে আসবে। এজন্য সরকারকেই নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এটি করতে পারলে দেশের পুঁজিবাজারের ইতিবাচক চিত্রে ফিরে আসতে বেশি অপেক্ষা করতে হবে না বলেই মনে করেন তারা।

সর্বশেষ..